নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহ রূপ
নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহ রূপ

নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহ রূপ

আবু সালেহ আকন

দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে। নারী ও শিশু ধর্ষণের বর্তমান চিত্র আতঙ্কিত করে তুলেছে সাধারণ মানুষকে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও তরুণী, কিশোরী বা শিশুকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে।

বিচার চাইতে গিয়ে ধর্ষিতা ও তাদের পরিবারকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিগৃহীত হওয়ার খবরও রয়েছে। উল্টো আরো নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। আবার ক্ষমতা বা প্রভাবশালীদের অপকর্মের কথা বলতে অনেক নির্যাতিত পরিবার সাহস পাচ্ছে না। 


মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৭১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২৪ জন। যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছে ১২৮ জন। এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছে আরো ৩০ জন।
প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।

পরকীয়ার অভিযোগে ধর্ষিতা ও তার মাকে ধরে এনে মাথা ন্যাড়া করে দেয়ার ঘটনা গত দুই দিনের বেশ আলোচিত বিষয়। ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়ায়। তুফান নামের এক শ্রমিক লীগ নেতা গত ১৭ জুলাই স্ত্রী-সন্তান বাসায় না থাকার সুযোগে প্রতিবেশী এক মেয়েকে দিনভর আটকে কয়েক দফায় তাকে ধর্ষণ করে। মেয়েটি রক্তক্ষরণ নিয়ে বাসায় যায় এবং তার মা ঘটনাটি জানতে পারেন। কিন্তু তুফান সরকার মুখ না খুলতে শাসিয়ে দেয়ায় তারা বিচারপ্রার্থী হয়নি। এ দিকে ধর্ষণের কথা জানতে পেরে তুফানের স্ত্রী আশা খাতুন, তার বড় বোন পৌরসভার সংরক্ষিত আসনের নারী কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকি এবং মা রুমী বেগম মেয়েটির বাড়িতে যান। তারা ধর্ষণের বিচার করে দেয়ার কথা বলে মেয়েটি ও তার মাকে রুমকির চকসূত্রাপুরের অফিসে নিয়ে আসে। তারা মা-মেয়ের বিরুদ্ধে যৌন ব্যবসার মিথ্যা অপবাদ দেয়।

 

এরপর তুফান সরকারের লোকজন দু’জনকে লাঠিপেটা করে নাপিত ডেকে প্রথমে মা-মেয়ের মাথার চুল কেটে দেয়া হয়। একপর্যায়ে তুফান সরকারের স্ত্রীর নির্দেশে দু’জনকে ন্যাড়া করে দেয়া হয়। এরপর ২০ মিনিটের মধ্যে বগুড়া শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য শাসিয়ে দু’জনকে রিকশায় তুলে দেয়া হয়। ওই অবস্থায় তারা বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। সদর থানা পুলিশ খবর পেয়ে হাসপাতালে মা-মেয়ের বক্তব্য শুনে তাৎক্ষণিক অভিযানে নামে। ওই রাতে তুফান সরকারকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার তিন সহযোগীকেও ধরা হয়।


ময়মনসিংহের নান্দাইলে এক স্কুলছাত্রীকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করেছে একই এলাকার ইব্রাহীম নামে এক যুবক। গত বৃহস্পতিবার রাতে ১০ম শ্রেণীর ওই ছাত্রীকে বাসা থেকে তুলে পার্শ্ববর্তী পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

 


রাজধানীর বনানীতে গত ৫ জুলাই জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে তরুণীকে বাসায় ডেকে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে বাহাউদ্দীন ইভান নামের এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। 


গত ৭ জুলাই সাভারের সোবহানবাগে ডিবি পুলিশ অফিসের ৫০ গজ সামনে একটি কলেজের অফিস কক্ষে এক তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। 


৯ জুলাই নোয়াখালীতে বসতঘরে ঢুকে এক তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। তরুণীর আর্তচিৎকারে প্রতিবেশীরা এসে ধর্ষক মাহফুজকে গণপিটুনি দেয়। 


পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১৬০ টি, ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ১৭১টি, মার্চ মাসে এক হাজার ৪৭৭টি, এপ্রিলে এক হাজার ৩৮৬টি, মে মাসে এক হাজার ৭১৯টি এবং জুন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৪২১টি।


অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ৬ মাসে ৩৭১ জন ধর্ষিতার মধ্যে মেয়ে শিশু রয়েছে ২৬৩ জন, ১০৫ জন নারী এবং বাকি তিনজনের বয়স জানা যায়নি। ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৩৬ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দু’জন নারী ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন। ২৬৩ শিশুর মধ্যে আটজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৫৩ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দু’জন শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে। এই সময়ে আরো ৪৮ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 


মানবাধিকার কর্মী আবুল বাসার বলেন, অভিভাবকেরা তাদের কন্যাসন্তান নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকেন। মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা দাঁড়িয়েছে বিশেষ ব্যক্তির জন্য। সরকার চেষ্টা করছে নারী নির্যাতন নিয়ন্ত্রণের জন্য। হয়তো পারছে না। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যারা নির্যাতিত হচ্ছে তারা আইনি সহায়তাও পাচ্ছে না। দীর্ঘ দিন ধরে মামলা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা চালানো সম্ভব হয় না।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.