ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

জীবন সীমান্তে

জোবায়ের রাজু

২৯ জুলাই ২০১৭,শনিবার, ১৭:২৩


প্রিন্ট
জীবন সীমান্তে

জীবন সীমান্তে

চলতি পথে আজ যে এত জ্যাম পড়বে এনায়েত আলী আর শৈলীর ধারণা ছিল না। বাপ-বেটি আর ড্রাইভার সেই আধা ঘণ্টা আগে থেকে জ্যামে বসে আছে। স্টুডিওতে যাওয়াটা আজ খুব জরুরি। সঙ্গীতপরিচালক বারবার কল দিচ্ছেন শৈলীকে। তার একক অ্যালবামের শেষ গানটির আজ রেকর্ড।
এত তীব্র জ্যামের কারণে মেয়ের মনে কি অবস্থা, এনায়েত আলী বুঝতে পেরেছেন। মেয়েকে ধৈর্য ধরতে বললেন তিনি। অবশ্য মনে মনে খানিকটা বিরক্ত এনায়েত আলীও। এই শহরের জ্যাম থেকে কবে যে মানুষ নিস্তার পাবে। ড্রাইভারকে গান ছাড়তে বললেন তিনি। অন্য কারো গান নয়, মেয়ে শৈলীর গান। ড্রাইভার গান প্লে করতেই শৈলীর রেকর্ড করা রবীন্দ্রসঙ্গীত বেজে উঠল- ‘আমার মল্লিকা বনে...।’

মেয়ের গান হলে এনায়েত আলী গভীর মন দিয়ে তা শোনেন। মেয়ের মিষ্টি গলাটা ভীষণ ভালো লাগে তার। বেশ সুরে গায়ও শৈলী। গানের সাথে তার ছোটবেলার সম্পর্ক। শৈলীর যখন চার বছর বয়স, একদিন বৃষ্টির দিনে সে জানালার গ্রিল ধরে গুনগুন সুরে কি একটা গান যেন গাইল। এনায়েত আলী পেছন থেকে মন দিয়ে মেয়ের গানে কান দিয়ে দেখলেন শৈলীর এ বয়সে গলায় এক আশ্চর্য সুর। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে গান শেখাবেন।
তারপর শৈলীর জন্য ওস্তাদ নিয়োগ করলেন। তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়াম সব কিনলেন। শৈলীরও গানের দিকে প্রবল ঝোঁক ছিল বলে সেও গানে মনোযোগী হলো। অল্প দিনে সুর তাল আর লয় শিখে গেল। ওস্তাদ শঙ্কর রায়ের একান্ত প্রচেষ্টায় শৈলীর অপূর্ব একটা গলা তৈরি হলো।

মেট্রিক পরীক্ষার পর একটি টিভি চ্যানেলে গানের প্রতিযোগিতায় সেরা হলো শৈলী। দেশের মানুষ তাকে চিনে নিলো। রেডিও টেলিভিশনে প্রতিনিয়ত গান করার সুযোগ পেল সে। মনমাতানো গলাটি অল্প দিনে সবার ভালো লেগে যায়। সবার এমন আগ্রহ দেখে একজন সফল সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার নতুন স্বপ্ন দেখতে থাকে শৈলী। মেয়ের এমন সফলতায় চোখে বার বার পানি চলে আসে এনায়েত আলীর। মেয়েকে গান শিখিয়ে তিনি সফল হয়েছেন। গানের জন্য মেয়ে যখন দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ায় তখন গর্বে বুক ভরে যায় এনায়েত আলীর। দিন দিন তিনি হয়ে উঠেন মেয়ের গানের এক অন্ধভক্ত।

পথের জ্যাম কিছুটা হাল্কা হয়েছে। গাড়ি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করেছে। এরই মাঝে মাঝবয়সের এক মহিলা শৈলীর গাড়ির জানালার পাশে এসে দুটো টাকা ভিক্ষার জন্য হাত বাড়াতেই এনায়েত আলী তাকে দ্রুত সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেন। ছেঁড়া আর ময়লাচ্ছন্ন শাড়ি পরা ভিখারিটি শৈলীর দিকে হা করে অপলক তাকিয়ে রইল। এনায়েত আলী ড্রাইভারকে দ্রুত গাড়ি ড্রাইভের হুকুম দিলেন।
বাবার এমন আচরণে কিছুটা অবাক শৈলী। বাবার দান করার হাত অনেক লম্বা। শৈলী সব সময় দেখত কেউ কোনো সাহায্য চাইলে বাবা তাদের দু’হাত ভরে দিতেন। কিন্তু এই মহিলা? হঠাৎ শৈলীর মনে পড়ল বাবা গত মাসেও ইন্দিরা রোডে এই মহিলাকে ভিক্ষা না দিয়ে ধমকের সাথে স্থান ত্যাগ করার কড়া আদেশ জারি করেছিলেন। সে দিনও এই মহিলা করুণ চোখে শৈলীর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল।

শৈলী বাবাকে বলল- ‘তুমি ওকে ভিক্ষা দিলে না কেন?’ বাইরের দিকে তাকিয়ে এনায়েত আলী নিরস গলায় বললেন-‘সবাইকে ভিক্ষা দেয়াটা আমার পছন্দ না।’ কেন জানি শৈলীর মনে হলো এ কথাটা বাবার মনের কথা নয়। তার বাবা সব অসহায়কে সমান চোখে দেখেন সবসময়।
শৈলীর ফোনটা আবার বেজে উঠল। সঙ্গীতপরিচালকের কল। রিসিভ করে শৈলী কথায় মনোযোগী হলো। এনায়েত আলী পেছনের স্মৃতিতে ফিরে গেলেন। যে মহিলা আজ গাড়ির বাইরে থেকে তার কাছে ভিক্ষা চাইল, সে মহিলার নাম ফরিদা বেগম।

এই ফরিদাই এনায়েত আলীর স্ত্রী। কোনো এক অগ্রহায়ণে ফরিদাকে বিয়ে করেছেন তিনি। সুখের সংসারের দুই বছর পর শৈলীর জন্ম। এক সময় এনায়েত আলী জানতে পারলেন ফরিদা পরকীয়ায় জড়িত। কামাল নামে কারো সাথে তার গোপন সম্পর্ক। ফলে দাম্পত্য জীবনে সুখ জিনিসটা ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে এনায়েত আলীর জীবন থেকে। এক কাকডাকা ভোরে ফরিদা নিখোঁজ। স্বামী-কন্যা রেখে সে রাতের আঁধারে কামালের কাছে চলে যায়। নিজেকে অভাগা ভেবে মেয়েকে নিয়ে বাকি জীবন কাটানোর পথ বেছে নেন এনায়েত আলী।

সংসার জীবনের দ্বিতীয় পর্বে এসে সুপুরুষ কামালের কাছে সুখ পায়নি ফরিদা। কারণ কামাল ছিল নারী ভোগকারী। ছল করে অনেক মেয়ের সর্বনাশ করার রেকর্ড তার নেহায়েৎ কম নয়। এমন বদ লোকের সাথে আর থাকা সম্ভব নয় বলে ফরিদা ফিরে আসে এনায়েত আলীর কাছে। কিন্তু কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এনায়েত আলী। ফরিদাকে তার পক্ষে আর গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেয়। নিরুপায় ফরিদা ফিরে যায়। পথকে খুঁজে নেয় জীবনের ঠিকানা হিসেবে। বেঁচে থাকার জন্য বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তি। জীবন সীমান্তের এই বেলায় এসে সব হারায় ফরিদা।

গানের স্টুডিওর সামনে এসে গাড়ি থামল। বাবাকে আনমনে থাকতে দেখে শৈলী বলল, এত কী ভাবছো সেই কবে থেকে? আমরা চলে এসেছি।’ ধ্যান ভাঙল এনায়েত আলীর। চারপাশে তাকিয়ে বলল, ‘কখন এসেছি। ও আচ্ছা নেমে পড় মা।’ শৈলী গাড়ি থেকে নেমে বাবাকে নিয়ে স্টুডিওর দিকে রওনা দিলো।

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫