ঢাকা, সোমবার,২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক

মশিউর রহমান তৌহিদ

২৮ জুলাই ২০১৭,শুক্রবার, ২০:২১


প্রিন্ট

বাংলাদেশে বর্তমানে মূল খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জন করার সম্ভাবনা সত্ত্বেও মহলবিশেষের স্বার্থে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি করা হচ্ছে, যাতে এ দেশ সব সময় আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। যে পরিমাণ জমিতে আগে ধান-গমসহ মূল খাদ্য উৎপাদন করা হতো সে পরিমাণ জমির অনেকাংশে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে ‘অর্থকরী’ ফসল উৎপাদনের জন্য। ক’দিন আগে একজন সরকারি কৃষি কর্মকর্তাকে কোনো একটি টেলিভিশন চ্যানেলে বলতে শুনলাম, শিগগিরই এ দেশে স্ট্রবেরি ফল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জন করা হবে। কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো বুমেরাং হবে বলে মনে হয়। কারণ জনসংখ্যা অনুপাতে আমাদের পর্যাপ্ত কৃষিজমি না থাকায় ধান-গমসহ মূল খাদ্যশস্য উৎপাদন বাদ দিয়ে কিংবা কমিয়ে অন্য ফসল উৎপাদন জাতিকে বিরাট সমস্যায় ফেলতে পারে। এ অবস্থা থেকে বাঁচার বিশেষ উপায় হচ্ছে, দেশের জমিতে ধান-গমসহ মূল খাদ্যশস্য উৎপাদন পুরোমাত্রায় চালু রেখে দেশের বাইরে বিদেশে কোথাও জমি লিজ নিয়ে ফল ও অন্যান্য দরকারি ফসল উৎপাদন করার ব্যবস্থা নেয়া। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারকে বিবেচনায় নেয়া উচিত খুব গুরুত্বসহকারে।
মিয়ানমার আয়তনে আমাদের দেশের চেয়ে যেমন চার গুণেরও বেশি বড়, তেমনি এর লোকসংখ্যা পাঁচ কোটি, অর্থাৎ আমাদের দেশের মোট লোকসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। যদি জমি লিজ নেয়া সম্ভব না হয়, তাহলেও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য আমদানির বিষয়ে আমাদের উচিত আরো মনোযোগী হওয়া। আমাদের দেশে মিয়ানমারের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ব্যাপক চাহিদা আছে, তা মিয়ানমারকে বোঝানো এবং সে দেশকে আরো অধিক কৃষি উৎপাদনে আগ্রহী করে তোলা যায়। এতে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য আমদানিতে বিশেষ কোনো দেশের ওপর একচেটিয়াভাবে নির্ভর না করলেও চলবে। সেই সাথে মূল খাদ্যশস্য উৎপাদনে আমরা সব সময় একটি সুষম অবস্থার মধ্যে থাকতে পারব। কয়েক বছর ধরে যে ‘পূর্বমুখী ডিপ্লোম্যাসি’র কথা বেশ জোর দিয়ে বলা হচ্ছিল, এর বাস্তবায়নে আমরা সত্যিকারের লাভবান হবো।
একচেটিয়া ভারতনির্ভরশীলতার জন্য ভুক্তভোগী হবে বাংলাদেশই। বিষয়টি মাথায় রেখে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করা উচিত। মিয়ানমারের সাথে নির্ভরযোগ্য ডিপ্লোম্যাটিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হলে সুফল পাবে আমাদের দেশের জনগণ এবং সেই সাথে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও মিয়ানমারের জনগণ।
সত্যি বলতে কী, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের দেশের সরকারের আচরণভঙ্গি সেকেলে মনে হয়। যেসব ঘটনা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ঘটলে খুব যতেœর সাথে চেপে যাওয়া হয়, সে ধরনের কিছু ঘটনা মিয়ানমারের সাথে ঘটলে অনেক বেশি মিডিয়া কভারেজ দেয়া হয় বলে অনেকে মনে করেন। এসব ক্ষেত্রে ভারতের বেলায় বেশির ভাগ সময় যাদের চুপ করে থাকতে কিংবা মেপে মেপে কথা বলতে দেখা যায়, অন্যদের বেলায় তাদের মুখ যেন লাগামহীন হয়ে যায়।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের বিষয়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা যেখানে প্রতিকূল মানসিকতা প্রদর্শন করে যাচ্ছে, সেখানে মিয়ানমারের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি আমাদের শোভা পায়?
মিয়ানমারের ওপর যখন আন্তর্জাতিক অবরোধ চলছিল দশকের পর দশক ধরে, তখন ভারত গোপনে ও প্রকাশ্যে মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। সে সময় মিয়ানমারের অর্থনীতিতে চীন-জাপানের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। সেখানে আমরা কেন বিমুখ থাকলাম আমাদের এ অন্যতম প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে? আসলে এর প্রধান কারণ, আমাদের দেশে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অনুপস্থিতি। সত্যি বলতে কী, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের কোনো সুস্পষ্ট পররাষ্ট্রনীতি নেই। এখন আছে প্রকাশ্যে ও গোপনে শুধু বিশেষ দেশপ্রীতি। বিভিন্ন সরকারের এ ভারতনীতির একটু কম-বেশি হয় পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের ওঠানামার ওপর। আজ ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সর্Ÿোচ্চ পর্যায়ে। তাই বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় প্রভাব সর্Ÿোচ্চ পর্যায়ে। ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ কতগুলো স্বার্থের কারণে ভারতকে ডিঙিয়ে বাংলাদেশসংক্রান্ত বিষয়ে কিছু রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই। এমনকি এ কথাও শোনা গেছে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূতকে প্রেসিডেন্ট ওবামা নিয়োগ দিয়েছিলেন এ বিষয়ে ভারতের তদবির গুরুত্ব দিয়ে। এ দিকে সরকারের আচরণ হচ্ছে, ভারতকে ছাড়া অন্য কাউকে একদম পাত্তা না দেয়ার মতো। আজ মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি টিকে আছে শুধু সেখানে বাংলাদেশী শ্রমিক চাহিদার ওপরে এবং আফ্রিকায় টিকে আছে জাতিসঙ্ঘ শান্তি মিশনের ওপরে। বাংলাদেশের শান্তি মিশনের সাফল্যের কারণ হচ্ছে আফ্রিকান সহমর্মিতা। আফ্রিকানরা মনে করে, বাংলাদেশীরাও তাদের মতো শত শত বছর ধরে পরাধীন আর নির্যাতিত ছিল।
মিয়ানমারের সাথে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ টেরিটোরিয়াল সমুদ্র এরিয়ার কিছু অংশ হারিয়ে আমাদের ‘সমুদ্র বিজয়’-এর নেপথ্যে কী ছিল? আমাদের সরকারকে ব্যবহার করে আমাদের সমুদ্র এরিয়া মিয়ানমারকে পাইয়ে দিয়ে ভারত মিয়ানমারের সাথে তার সম্পর্ক মজবুত করে নিয়েছে বিশেষভাবে। সমুদ্রে ‘আউটার কন্টিনেন্টাল শেলফ’ নিয়ে মিয়ানমারের সাথে আপাতগুরুত্বহীন বিবাদে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতের রায় কিছুটা নিজেদের পক্ষে আসায় বাংলাদেশ সরকারের বিজয়োল্লাস মিয়ানমারের সরকার ও জনগণের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে তিক্ততা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া ঘটে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে। সমুদ্র বিজয় নিয়ে দেশজুড়ে সরকারি উল্লাসের পর আগের চেয়ে বেশি হারে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রে নির্দয়ভাবে ঠেলে দিয়েছিল মিয়ানমার।
চার দশক ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে না পারার প্রধান কারণ হচ্ছে এ বিষয়ে পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপ। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য দেয়া রিলিফ এবং বিভিন্ন অর্থসাহায্য পকেটস্থ করার লোভও এ ক্ষেত্রে দায়ী। রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের হয়তো সহায়ক হবে। মিয়ানমারের সাথে আমাদের ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা মনোযোগী হইনি। কখনো চিন্তা করে দেখিনি আমাদের কোন কোন পণ্য আমদানিতে আমরা মিয়ানমারের ওপর নির্ভরশীল হতে পারি? আবার সেসব পণ্য উৎপাদনে এবং আমাদের দেশে রফতানিতে মিয়ানমার আমাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধের জন্য মিয়ানমারের সাথে সে ধরনের সম্পর্ক তৈরিতে অনেক বিষয়ে বাধা ছিল। কিন্তু ওই বাধা উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল কি?
সম্পর্ক তৈরির জন্য প্রথমে একটি পদক্ষেপ নেয়া যায়। তা হলো, মিয়ানমারকে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টুরিস্ট ডেসটিনেশন হিসেবে বানিয়ে নেয়া। মিয়ানমারে চীন-জাপান-যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মতো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে আমরা আমাদের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে মিয়ানমারমুখী করে দিতে পারি। অনেক ছোট ছোট বাণিজ্যের মাধ্যমে মোট মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারা যায় মিয়ানমারের সাথে। যেমন পাস্তুরাইজড তরল গরুর দুধ আমদানি। বাংলাদেশে যে পরিমাণ দুগ্ধ উৎপাদন হয় তা এত বেশি অপর্যাপ্ত যে, তা দিয়ে পুরো জাতির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য পরামর্শে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় দৈনিক দু-এক গ্লাস হলেও দুধ পান করাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ৭০-৮০ শতাংশেরও বেশি লোকের প্রতিদিন দূরের কথা, প্রতি সপ্তাহে এমনকি প্রতি মাসে দু-এক গ্লাস দুধ খাওয়ার সুযোগও খুব কমই হয়। বিশাল চাহিদা অনুপাতে উৎপাদন খুব কম হওয়ায় দুধের দাম যেমন মানুষের নাগালের বাইরে, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ভেজাল। আবার আমরা যদি চিন্তা করতাম, মিয়ানমার থেকে আমরা তরল দুধ আমদানি করব না, কিন্তু গরুর জন্য শুধু কাঁচা ঘাস আমদানি করব। তাতেও কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ কোস্টাল জেলাগুলোতে গরুর খামার করে দেশের চাহিদা মেটানো যায়। কিন্তু মিয়ানমারের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়লে আমরা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হব না এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় থাকবে। যেটি আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫