ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

কম্পিউটার ও আইটি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতার জন্য হুমকি

আহমেদ ইফতেখার

২৮ জুলাই ২০১৭,শুক্রবার, ১৯:৩৬


প্রিন্ট

মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের জন্য প্রযুক্তিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তা না হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপদ থেকে বাঁচা যাবে না। এ বিপদ থেকে উদ্ধারের একমাত্র উপায় হতে পারে বৈশ্বিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণ। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং জানিয়েছেন, নিউক্লিয়ার এবং বায়োলজিক্যাল যুদ্ধের যে হুমকি রয়েছে তা থেকে বাঁচতে যুক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এখন যেকোনোভাবে প্রযুক্তি এতটাই এগিয়ে গেছে যে, এ-সংক্রান্ত আগ্রাসন আমাদের ধ্বংস করে দিতে পারে। আমরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছি, যা আমাদের ধ্বংস করতে পারে আর এখন আমাদের এমন একটা সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে যেখানে রোবট আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অনেক কাজ করে দেবে। মানবসভ্যতার বিকাশে আমরা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময়ে আছি বলেও হুঁশিয়ার করে তিনি বলেন, মানুষ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।
উন্নত প্রযুক্তির মহাকাশযান তৈরিসহ মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ সমাদৃত মহাকাশ ভ্রমণ সংস্থা স্পেসএক্স এবং গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এলন মাস্ক। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল গভর্নর অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বেশ সমালোচনা করেছেন মাস্ক। মানবসভ্যতার অবসান ঘটাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বশেষ সংস্করণের সঙ্গে তিনি যুক্ত আছেন। তাই এ ব্যাপারে কতটা সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত, তা নিয়ে বেশ চিন্তিত মাস্ক। এবারই যে প্রথম মাস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সবাইকে সতর্ক করছেন এমনটি নয়। কয়েক বছর ধরেই সতর্কতার বাণী শুনিয়ে আসছেন তিনি। পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকির কারণ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের পরই মাস্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দায়ী করেন। এক টুইট বার্তায় ২০১৪ সালে মাস্ক বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা পালন করতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্রের পরই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তির মাধ্যমে কারো যেন ক্ষতি না হয়, এ ব্যাপারে সরকারকে আরো মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন মাস্ক। সময় পেরিয়ে যাওয়ার আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ও ব্যবহার নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ এবং নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন। অনেক শিল্পকারখানাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়মনীতি ও ঝুঁকির কথা তোয়াক্কা না করেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। আর এতে মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নীতিমালা প্রণয়নের আগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারকে পরামর্শ করার আহবান জানান মাস্ক। তিনি বরাবরই প্রাণঘাতী রোবটিক্স নিয়ে তার ভয়ের ব্যাপারে বিশেষভাবে সোচ্চার ছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের থেকেও বেশি বিপজ্জনক।
জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন কনভেনশনাল উয়েপনস-এ অংশগ্রহণকারী ১২৩টি দেশ স্ব-চালিত রোবটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে সরকারি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ২০১৭ সালে একটি দল গঠনের পক্ষে তাদের ভোট প্রদান করেছেন। স্টিভ উজনিয়াক, ইলন মাস্কের মতো সিলিকন ভ্যালির অভিজাত ব্যক্তিরা হত্যাকারী রোবটের উন্নয়নে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা উভয়ই আগের বছর জাতিসঙ্ঘের কাছে লেখা এক চিঠিতে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রাণঘাতী স্বচালিত অস্ত্র নির্মাণের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ছাড়া স্টিফেন হকিং, গুগলের গবেষণা পরিচালক পিটার নরভিগ এবং মাইক্রোসফটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এরিক হরভিৎজসহ আরো সহস্রাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি চিঠিতে স্বাক্ষর করে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। আর্জেন্টিনা, পেরু, পাকিস্তান, কিউবা, মিসরসহ ১৯টি দেশ হত্যাকারী রোবটের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে। অন্য দিকে মাত্র পাঁচটি দেশ এই ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছে।

জাকারবার্গ-এলোন মাস্ক দ্বন্দ্ব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে এলোন মাস্ক ও মার্ক জাকারবার্গের অবস্থান বরাবরই বিপরীতমুখী। এআই নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুক লাইভে এক আলোচনায় অংশ নেয় ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা। এক ফেসবুক ব্যবহারকারীর প্রশ্নের জবাবে এলোন মাস্ককে দায়িত্বহীন বলে মন্তব্য করলে এলোন মাস্ক ও মার্ক জাকারবার্গের ব্যক্তিগত তর্কবিতর্কে রূপ নেয়। এলোন মাস্ক ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানির টেসলা, স্পেসএক্সসহ বেশ কয়েকটি ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। সম্প্রতি তিনি দাবি করেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে মার্ক জাকারবার্গের জ্ঞান সীমিত। এমন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে এলোন মাস্কের অবস্থানকে ‘দায়িত্বহীন’ বলে দাবি করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বরাবরই শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন এলোন মাস্ক। চাকরি ক্ষেত্রের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় হয়ে দেখা দিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কারণ রোবট সব কিছুই মানুষের চেয়ে ভালোভাবে করতে সক্ষম হবে। এ বিপর্যয় থেকে মানুষকে রক্ষা করতে মৌলিক বেতনের একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা প্রণয়নেরও পরামর্শ দিয়েছিলেন। এলোন মাস্ক মন্তব্য করেন, ‘মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মৌলিক ঝুঁকি’।
এলোন মাস্কের এমন শঙ্কা নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্নের সম্মুখীন হন মার্ক জাকারবার্গ। তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন। জাকারবার্গ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমার জোরালো মতামত রয়েছে। এ প্রযুক্তি নিয়ে আমি আশাবাদী। আমি মনে করি, আরো অনেক কিছু তৈরি করা সম্ভব এবং বিশ্ব আরো উন্নত হবে। বিশেষত এআই প্রযুক্তি নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে না বলছেন, এ নিয়ে মহাপ্রলয়ের দৃশ্য সাজাচ্ছেন। কেন করছেন আমি তা বুঝি না। এটা ঠিক নয়। এটি দায়িত্বহীনতার পরিচয়। আগামী এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিতে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের এ দুই উদ্যোক্তার মধ্যে ব্যবসা নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একে অপরের মতাদর্শের বিরোধী হলেও খাতটিতে বিনিয়োগ করেছেন দুই কর্মকর্তাই। এর আগে অলাভজনক একটি সার্চ কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়েছিলেন এলোন মাস্ক। এ প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সহায়তা করার জন্য এআই উন্নয়ন, তবে কাউকে আঘাত করার জন্য নয়। মার্ক জাকারবার্গ গত বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যক্তিগত সহকারী জার্ভিস উন্মোচন করেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শীর্ষে চীন
আগামী এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় শীর্ষস্থানে পৌঁছাতে চায় চীন। এই লক্ষ্যে চীন সরকার সম্প্রতি ন্যাশনাল আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ঘোষণা করেছে। এরই অংশ হিসেবে স্বচালিত গাড়ি ও অন্যান্য এআই প্রযুক্তিতে চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে চীনা শিল্প খাতে ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার ভিত্তি হিসেবে দেখছেন চীনের নেতারা। ২০৩০ সাল নাগাদ চীনকে ‘লিডিং ওয়ার্ল্ড সেন্টার ফর আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইনোভেশন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য ২০২৫ সালের মধ্যে এ খাতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জনের কথা বলছে সরকার। আর এ জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল, গবেষণা ও শিক্ষাগত সম্পদ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমানে চীনের ম্যানুফেকচারিং প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিক ব্যয় সঙ্কোচন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাদের কারখানায় রোবটসহ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনের অন্য মাধ্যমগুলো স্থাপন করছে। মার্কিন প্রশাসনের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে চীনসহ অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সামরিক প্রযুক্তিব্যবস্থায় ঢুকে যেতে পারে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫