ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

কবিতা

বর্ষণ উৎসবে কবিতা

মিলন সব্যসাচী

২৭ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ২০:০৬


প্রিন্ট

প্রকৃতির পাঠশালায় পৃথিবী প্রতিদিন প্রতিক্ষণ ঋতুকাব্য পাঠে নিমগ্ন। মানবজীবনেও ঋতুচক্রের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ঋতুচক্র মূলত মায়াবী প্রকৃতিরই ছন্দিত নন্দিত নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতির সঙ্গে মানবজীবন সুনিবিড় সম্পর্কের বন্ধনে বিজড়িত। বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যে কোনো কোনো ঋতুর রূপরস রঙ্গলীলা হৃদয়কে যতটা প্রভাবিত করে কোনোটা ঠিক ততটা দৃষ্টিগ্রাহী নয়। তবে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে প্রতিটি ঋতুর রয়েছে প্রত্যক্ষ পরক্ষ প্রভাব এবং ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধির বয়ান। মানবজীবনে সচিত্র স্বীকৃতিতে ঋতুচক্রের প্রভাব যুক্তিযুক্ত। এতে কোনো বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। পালাবদলের পালায় গ্রীষ্মের শেষান্তে প্রকৃতির পরিচিত পথ ধরে আসে বর্ষা। চৈত্রের খরতাপ রৌদ্দুরে চৌচির মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তরের অন্তর্মুখী দহন অবসানকল্পে বর্ষার সুভাগমনে বৃষ্টিতে ভিজে যায় তপ্ত পৃথিবীর প্রাণ। কখনো আকাশ যেন অবগুণ্ঠনে সজ্জিত নববধূর মতো, রোদ-বৃষ্টিতে মেঘমেয়েদের অপরূপ লুকোচুরি খেলায় মুগ্ধচিত্তে জাগে কত ভাবনার উঁকিঝুঁকি। বজ্রনিনাদে হঠাৎ কেঁপে ওঠে দিগন্তবিস্তৃত অসীম আকাশ। আঁধারের বুকচিরে যোজন যোজন পথ পেরিয়ে পৃথিবীর প্রান্তে বজ্রালোক ছুটে আসে। প্রবল বর্ষণে ভেজা বাতাসে নেচে যায় কদম কেয়ার মিষ্টি ঘ্রাণ। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দে উদ্ভাসিত হয় স্থবির হয়ে পড়া প্রকৃতির। ভাবুক মনে জেগে ওঠে সৃজনশীল ভাবনা। ঘরের কোণে বর্ষাবন্দী কবি মনে খুলে দেয় দৃষ্টির জানালা। বর্ষার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ভাবুক হৃদয়ে বিমুগ্ধ মাদকতার ঢল।
বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার বর্ষার প্রভাবে সমৃদ্ধ। স্বনামধন্য কবি কথাসাহিত্যিক বর্ষা ও বৃষ্টির বন্দনা গীতে সার্থক করে তুলেছেন তাদের স্বকালের সৃষ্টিসম্ভার। বর্ষায় বিশেষ করে কবিচিত্তের অতলান্তিক গভীরতা ছুঁয়ে ভাবনার নির্যাস নিগড়ে ক্রমেই ঝরে পড়ে লেখনীর ডগায়। শব্দপাখির ঝাঁক বৃষ্টিভেজা উড়াল পথের পরতে পরতে খুঁজে ফেরে চিত্রকল্পের ছন্দ ও বাক্যবিন্যাসের শিল্পশৈলী। বৃষ্টির মর্মস্পর্শী সুরের ভেতর কবি কর্ণপাত করেন সুদূর অতীতের ধূসর বাঁকে হারিয়ে যাওয়া ক্রোন্দসী প্রেয়সীর কান্না কিংবা অঝরধারায় পতিত অশ্রুবৃষ্টির হাহাকার। কবি তার আপন খেয়ালে সুর সেধে যায় ব্যথার বীণায়। কখনো কখনো আবার সুর সাধেন আনন্দ-বেহাগের সুপ্ততারে। বৃষ্টিমুখর দিনে নিঃসঙ্গ জীবনের নির্জনতায় সে যেন কাকে আপন করে কাছে পাওয়ায় ব্যাকুল ব্যস্ততায় অস্থির হয়ে ওঠে। হয়তোবা কোনো সুদূরিকা বিষাদের সুরে নৈঃশব্দ্যে গেয়ে যায়। ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না শুনে তোমায় মনে পড়ল, ব্যথা হয়ে আঁখিজল ঝরল।’ ভ্রমণ অনুভূতির গভীরে সীমাহীন শূন্যে শুধু হৃদয়ের হাহাকার বারবার ধ্বনিত হতে থাকে। অন্তরালোক খরিত বৃষ্টির বিন্দুতে বিন্দুতে হয়তোবা মিশে থাকে স্বর্গীয় প্রেম, আনন্দ-বেদনা, মিলন-বিরহের অতৃপ্ত বাসনা এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অন্তহীন ক্রন্দন। বৃষ্টি কখনো সখনো কারো কাছে বিরহীর অশ্রুজলে ফোটা নীলপদ্মের মৌনতা, কখনো আনন্দের অশ্রুধারায় প্রবাহিত জীবননদীর দুরন্ত ঢেউ। কবি বিদ্যাপতির ভাবনায় তার কবিতায় বিষাদের চিত্রই ফুটে উঠেছে।
ও সখি হামারি দুখের নাহি ওর
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের অন্যতম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর। তাঁর কবিতায় আষাঢ়-শ্রাবণ মেঘের গর্জনে প্রকল্পিত পৃথিবী, অতিবৃষ্টি বর্ষণের পরে প্রকৃতির নির্মলরূপ। মেঘমুক্ত আকাশজুড়ে দশ দিকে চাঁদের স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে পড়ার নয়নলোভা দৃশ্য উপস্থাপিত হয়েছে। যে দৃশ্যের অন্তরালে চাঁদের হাসি বিরহীচিত্ত ব্যাকুল করে দেয়।
খণ্ড খণ্ড মেঘ গণ
শশধর সমে রণ
ডুবকি উঠএ ঘনজিত।
তাহার নির্ম্মল নিশি
সুধা বিস্তারিত হাসি
তা দেখিয়া মন বিচলিত॥
কবি অক্ষয়কুমার বড়াল। জন্ম ১৯৬০ এবং মৃত্যু ১৯১৯ সালে। তিনি অধ্যাত্ম চেতনার সান্নিধ্যে ঋতু বৈচিত্র্যে বর্ষা বা বৃষ্টির স্বরূপ দেখেছেন। প্রবল বৃষ্টি, বিজলী চমক, ঘনঘন বজ্রনিনাদ, অন্তর ও তনুমনকে অস্থির করে তোলে। কবির নিগূঢ় উপলব্ধি আকাশের অজান্তে ঝরে পড়া বৃষ্টির মতো। অযথা জীবনের দিনগুলো ঝরে যায়। তাঁর ভাবনায় বৃথা এ জীবন মিছে জীবনের দায়ভার।
বৃষ্টি পড়ে ঝর ঝর ঝর বিজলী চমকে
হেথা হোথা বজ্রঘাত হয় ঘনঘন।
হৃদয় শিহরি ওঠে প্রকৃতি ধমকে
মিছে কাজে গেছে দিন, মিছে এ জীবন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৎস্যশিকারি ধ্যানী বকের দৃষ্টিতে বর্ণিল বর্ষার সৌন্দর্য দেখেছেন। বর্ষা ঋতুর প্রভাব যতটা পড়েছে তাঁরই চিন্তা-চেতনা, মেধা-মননে, অন্য কোনো ঋতু তাকে ততটা প্রবলভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি। তার রচিত বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতির অন্তরঙ্গতায় তাঁর হৃদয়ানুভূতির রোমান্টিক সুরসুধা ছড়িয়ে পড়েছে কালোত্তীর্ণ তাঁরই অনেক কবিতা ও গানে। তাঁর কাব্য ভাবনায় বর্ষা কখনো মানবীয় প্রেমবিরহের নিখাদ অনুভূতি আবার কখনো কখনো অপার্থিব প্রেমের প্রার্থীত প্রার্থনা। স্বচ্ছ ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ অদ্বিতীয়। ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় কবি বর্ষার আগমনকে প্রত্যক্ষ করেছেনÑ
ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে
জল সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ ভরসে
ঘন গৌরবে নব যৌবনা বরষা
শ্যাম গম্ভীরা সরসা।
‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় তার উপলব্ধি
এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘন ঘোর বরিষায়-
এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায় ॥
‘সোনারতরী’ কবিতায় কবি বৃষ্টিকে দেখেছেন আধ্যাত্ম চেতনার চোখে। অনুভূতির রঙে এঁকেছেন বর্ষার সৌন্দর্য।
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা-
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা ॥
বর্ষা নিয়ে রচিত তাঁর অসংখ্য কবিতার মধ্যে ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ ‘আষাঢ়’, ‘নববর্ষা’ ‘মেঘমুক্ত’, ‘কৃষ্ণকলি’, ‘আষাঢ় সন্ধ্যা’, ‘বর্ষার রূপ’ উল্লেখযোগ্য।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জন্ম ১৯৯৯ মৃত্যু ১৯৭৬ সালে। তাঁর কবিতায় বর্ষা, প্রেম ও প্রকৃতির এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছে। রোমান্টিকতায় বিচলিত হয়ে উঠেছে বিরহী প্রেমিক হৃদয়ের শূন্যতা। নিরবছিন্ন বৃষ্টি বর্ষণে একাকী শূন্যঘরে প্রবাসী প্রিয়জনের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ‘বাদল দিনে’ কবিতার মর্মার্থে সেই চিত্র সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে।
‘ব্যাকুল বন-রাজি শ্বাসিছে ক্ষণে ক্ষণে
সজনি ! মন আজি গুমরে মনে মনে।
বিদরে হিয়া মম
বিদেশে প্রিয়তম,
এ জনু পাখী সম
বরিষা জর-জর ॥
কবি জীবনানন্দ দাশ। জন্ম ১৮৯৯ মৃত্যু ১৯৫৪ সালে। তিনি বৃষ্টির পতনমুখী ছন্দ ও সুরের গভীরে খুঁজেছেন প্রকৃতিতে নেমে আসা নিস্তব্ধতার চিত্র। নিঝুম রাতের অন্ধকারে চোখের দৃষ্টি যত দূর যায় মৃত্যুময় নীরবতার মাঝেও বৃষ্টির সুমধুর সুর কবিকে জাগরিত করে। তিনি কেবলই বৃষ্টির স্রোতে ভেসে যাওয়া পানির শব্দ শুনতে পান।
শ্রাবণের গভীর অন্ধকার রাতে
ধীরে ধীরে, ঘুম ভেঙে যায়
কোথায় দূরে বঙ্গোপসাগরের শব্দ গুনে!
বর্ষণানেকক্ষণ হয়ে থেকে গেছে;
যতদূর চোখ যায় কালো আকাশ
মাটির শেষ তরঙ্গকে কোলে করে চুপ করে রয়েছে যেন;
নিস্তব্ধ হয়ে দূর উপসাগরের ধ্বনি শুনছে।
(শ্রাবণরাত ‘মহাপৃথিবী’)
কবি অমিয় চক্রবর্তী। জন্ম ১৯০১ মৃত্যু ১৯৮৭ সালে। তাঁর কবিতায় প্রেমিক হৃদয়ে শূন্যতার সন্তাপে প্রেম ও প্রকৃতির সংশ্লিষ্টতায় বৃষ্টি ও বর্ষার রূপ ফুটে উঠেছে। বজ্রমেঘে বিজলীর ঝিলিকে নিঃঙ্গমনে জ্বলে শুধু স্বজন হারানোর বেদনা প্রদীপ। যেজন জীবনে হারিয়েছে যাকে বর্ষার জলাধারে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না তাকে।
ফাল্গুন বিকেলে বৃষ্টি নামে।
শহরের পথে দ্রুত অন্ধকার।
লুটোয় পথের জল, হাওয়া তমস্বিনী;
আকাশে বিদ্যুৎজ্বলা বর্ষা হানে
ইন্দ্রমেঘ;
কালে দিন গলির রাস্তায়
কেঁদেও পাবে না তাকে অজস্র বর্ষার জলধারে।
(বৃষ্টি, ‘পারাপার’)
কবি জসীমউদ্দীন। জন্ম ১৯০৩ মৃত্যু ১৯৭৬ সালে। তিনি পল্লীজীবনের রূপকার। মাটি মানুষ ও প্রকৃতিবান্ধব কবি। বর্ষার জীবন্তরূপ তাঁর হাতেই স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। অন্য কোনো কবির পক্ষে ততটা সার্থক উপস্থাপন সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বর্ষা তাঁর কবিতায় কেবল ছকেবাঁধা সৌন্দর্যের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নয়। একাগ্র কাব্যসাধনায় তিনি বিমূর্ততাকে মূর্ত করে তুলেছেন। আবহমান বাঙালির ভাবনা চিরন্তন বৈশিষ্ট্যে।
রাহিয়ে নাচিছে ঝরঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে,
এসবের মাঝে রূপকথা যেন আর রূপকথা আঁকে।
যেন ও বৃদ্ধ গাঁয়ের চাষিরা, আর ওই রূপকথা,
বাদলের সাথে মিশিয়া গড়িছে আরেক কল্পলতা।
বউদের আজ কোনো কাজ নাই, বেড়ায় বাঁধিয়া রশি,
সমুদ্রকলি শিকা বানাইয়া নীরবে দেখিছে বসি।
(পল্লিবর্ষা ‘ধানক্ষেত’)
বন্দে আলী মিয়া। জন্ম ১৯০৬ মৃত্যু ১৯৭৯ সালে। তাঁর অন্যতম অনুষঙ্গ বর্ষাঋতুর বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টিতে বাদলা দিনের অবরুদ্ধ অবসরে বৃষ্টিভেজা বৃক্ষরাজির সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ কবি এভাবে অনুভূতি প্রকাশে মগ্ন।
দেয়া ঝর ঝর সারাদিন ধরি মেঘলা আকাশ হতে
গাছগুলা ভেজে চুপচাপ করি দাঁড়াইয়া কোনমতে।
সুপারি গাছের কচি মেথি চুয়ে পানি পড়িতেছে ঝরি
বাদল বাতাসে পাতাগুলি তার কাঁপিতেছে থর থরি।
তালের গাছের ডানা ঝাপটিয়া আদাড়ি পিছাড়ি করে
ধূসর বরণ আসমান যেন হাত বাড়াইয়া ধরে।
(বাদল দিনে ময়নামতির চর)
কবি ফররুখ আহমেদ। জন্ম ১৯১৮ মৃত্যু ১৯৭৪ সালে। তাঁর কবিতায় বর্ষা-বৃষ্টি আনন্দ মিলন বিরহ এবং অতীত স্মৃতি স্মরণের অখণ্ড অবসর। প্রতীক্ষিত বৃষ্টি রুক্ষ-সূক্ষ্ম প্রকৃতির প্রাণ সতেজ ও সবুজ করে তোলে।
রুগ্ন বৃদ্ধ ভিখারির রগ-ওঠা হাতের মতন
রুক্ষ মাঠ অসমান শোনে সেই বর্ষণের সুর,
পাড়ি দিতে চায় বহুপথ, প্রান্তর বন্ধুর,
যেখানে বিস্মৃত দিন পড়ে আছে নিঃসঙ্গ নির্জন
সেখানে বর্ষার মেঘ জাগে আজ বিষণ্ন মেদুর॥
(‘বৃষ্টি-ধানক্ষেত’)
কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল। জন্ম ১৯৩৬ মৃত্যু ১৯৮৯ সালে। প্রেম ও প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত হৃদয়ে অন্তলীন প্রেম-প্রতীমার সন্ধানে কাব্যের গভীরে এভাবে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছেন।
সারাদিন বৃষ্টি, বৃষ্টি, সবুজ সড়ক দ্বীপ জলে
মজ্জমান, স্ন্যাকবারে নিভে যায় নিয়ন সাইন
এ কেমন অপরাহ্ন? অন্ধকারে কিছুই দেখি না
ক্ষমাহীন বিস্মৃতির দীপান্তরে আশা ও বিশ্বাস অন্তরীণ !
পরম সোহাগে তাকে বুকে নিই, বলি ওঠো।
(‘স্বগীয় বেড়াল’ ‘আক্রান্ত গজল’)
কবি ওমর আলী। জন্ম ১৯৩৯ মৃত্যু ২০১৫ সালে। জীবনঘনিষ্ঠ প্রকৃতির সংশ্লিষ্টতায় পল্লীর সরল সহজ রূপকল্প তার কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। অতিবৃষ্টিপাতে জনজীবনের দুর্ভোগ ও কষ্টে কবিতার চিত্রকল্পে তিনি উপস্থাপন করেছেন।
শালিক ঘুঘুরা ভেজে বৃষ্টির পানিতে দিনভর,
নরম পালকগুলো ভিজে ওঠে, দেয় ঝেড়ে ফেলে,
কোথাও কানাকুয়োর ঘন ঝোপে ভাঙা কণ্ঠস্বর,
ডাহুক সাঁতার কাটে বিলের তরঙ্গে বুক মেলে।
শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরে সারাদিন, সূর্য ঢেকে থাকে
মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢেকে রাখে শুভ্র জ্যোৎস্নাকে।
(শ্রাবণের বৃষ্টি ‘আত্মার দিকে’)
কবি শহীদ কাদরী। জন্ম ১৯৪০ মৃত্যু ১৯১৬ সালে তাঁর কবিতায় বর্ষাঋতুর রূপবৈচিত্র্যের বর্ণনায় তিনি তুলে ধরেছেন এভাবে।
নামলো সন্ধ্যার সঙ্গে অপ্রসন্ন বিপন্ন বিদ্যুৎ
মেঘ, জল, হাওয়া-
হাওয়া ময়ূরের মতো তার বর্ণালী চিৎকার
কী বিপদগ্রস্থ ঘরদোর
ডানা মেলে দিতে চায় জানালা কপাট
নড়ে ওঠে টিরোনসিরসের মত যেন প্রাচীন এ বাড়ী।
(‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ ‘উত্তরাধিকার’)
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। জন্ম ১৯৩৪ মৃত্যু ২০১১ সাল। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির প্রেমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা চিত্র উন্মুখ হয়ে উঠেছে। তিনি তপ্তমাটির বন্ধ্যাত্ব দেখে কিষানের কান্না ধ্বনি শুনতে পান। বৃষ্টি ও বর্ষার কাছে তাঁর প্রার্থীত প্রার্থনা।
‘আমি সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা করেছি
বর্ণ এবং বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেছি
শস্য এবং গাভীর জন্য প্রার্থনা করেছি
আমি ভূমি এবং কৃষকের জন্য প্রার্থনা করেছি।
(‘বৃষ্টি এবং সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’)
কবি হুমায়ুন কবির। জন্ম ১৯৪৮ মৃত্যু ১৯৭২ সালে। তাঁর কবিতায় জ্যৈষ্ঠের অপরাহ্নের মেঘ-বৃষ্টি শান্তি-সুখের বার্তা বলে মনে হয়। উপলব্ধির আঙিনায় দাঁড়িয়ে বিরতিহীন বৃষ্টির প্রতীক্ষায় প্রহর গুনেছেন। বর্ষার ছোঁয়ায় কদম-কেয়া ফুলের সুবাসমাখা তার কবিতার শব্দ ছন্দ।
জল পড়ে পাতা নড়ে, সুনীল কদম
একাকার জলে আর জলে
অপরাহ্নে শান্তি এলো বৃষ্টির করুণা ধারা বেয়ে
মশানে বাসক পাতা দ্রোণ ফুল দক্ষিণার হাত।
জ্যৈষ্ঠের বিকেলে বৃষ্টি, বৃষ্টি ঝরে নিবিড় সেতার।
(‘রবীন্দ্রসঙ্গীতে বৃষ্টি’)
জীবন ও প্রকৃতির অপরূপ সান্নিধ্যতায় ঋতুচক্রের বৈচিত্র্যময় বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতিপ্রেমী কবিচিত্তে উপেক্ষিত হওয়া অশোভনীয়। বরং কবি তাঁর মুগ্ধ মনের মাধুরী ঢেলে ষড়ঋতুর অপূর্ব উদ্ভাসনকেই কবিতায় তুলে ধরেন। নানন্দিক শৈল্পিকতায় প্রতিটি কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে সার্থক সৃষ্টি শৈলীর মহোল্লাসে বর্ষণমুখর বর্ষার চিরন্তন আবেদন এবং প্রভাব প্রত্যেক কবির কবিতায় প্রত্যক্ষ-পরক্ষভাবে সমোজ্জ্বল।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫