ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

আলোচনা

মহাশ্বেতা দেবী

রবিউল ইসলাম

২৭ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৫৬


প্রিন্ট

বাংলা সাহিত্যে স্বনামধন্যা লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। একাধারে তিনি লেখক, শিক্ষক, অধ্যাপক ও মানবাধিকার আন্দোলন কর্মী। ১৯২৬ সালে ১৪ জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ২৮ জুলাই তার প্রথমতম মৃত্যুবার্ষিকী। তার বাবা মণীষ ঘটক। তিনি ছিলেন কল্লোল সাহিত্য অঙ্গনের সঙ্গে খ্যাতনামা কবি ও ঔপন্যাসিক। মণীষ ঘটকের ভাই ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। মহাশ্বেতা দেবীর মা ধরিত্রী দেবীও ছিলেন লেখক ও সমাজকর্মী। তার ভাইয়েরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ছিলেন।

যেমন- শঙ্খ চৌধুরী ছিলেন বিশিষ্ট ভাস্কর এবং শচীন চৌধুরী ছিলেন দি ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি অফ ইন্ডিয়া পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। মহাশ্বেতা দেবীর বিদ্যালয়-শিক্ষা শুরু হয়েছিল ঢাকা শহরেই। ভারত বিভাজনের পর তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠভবনে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৪ সালে মহাশ্বেতা দেবী বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেই সময় বিজয়গড় কলেজ ছিল শ্রমিক শ্রেণীর ছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সময় মহাশ্বেতা দেবী একজন সাংবাদিক ও একজন সৃজনশীল লেখক হিসেবেও কাজ চালিয়ে যান। তিনি দেখেছেন অসহায় লোকজনদের তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের কাছাকাছি হয়েছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোধা ও শবর উপজাতি, নারী ও দলিতদের নিয়ে পড়াশোনা করেন।

কথাসাহিত্যে তিনি ক্ষমতাশালী জমিদার, মহাজন ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আধিকারিক, ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পুলিশের হাতে উপজাতি ও অস্পৃশ্য সমাজের অকথ্য নির্যাতনের চিত্র অঙ্কন করেছেন। তার অনুপ্রেরণার উৎস সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : উত্তর-ঔপনিবেশিক গবেষক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্পগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে তিনটি গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। এগুলো হলো ইম্যাজিনারি ম্যাপস (১৯৯৫, রুটলেজ), ওল্ড ওম্যান (১৯৯৭, সিগাল) ও দ্য বেস্ট স্টোরিজ (১৯৯৭, সিগাল)।

যে মানুষ সমাজে বঞ্চিত নিগৃহীত বৈষম্যের শিকার তাদের পক্ষে লড়াইয়ে তার লেখনী ছিল চির উদ্যত, তার কণ্ঠস্বর ছিল সোচ্চার। এই প্রতিবাদী অবস্থান তার সৃষ্ট শিল্পসাহিত্যে যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তা খুবই প্রশংসনীয়। এভাবে তিনি দাঁড়িয়েছেন প্রতিবাদের মুখোমুখি। তিনি দীর্ঘ জীবনে প্রতিটা মুহূর্ত শিল্পসাহিত্য ও সমাজসংস্কারের কাজে উৎসর্গ করেছেন। পশ্চিম বাংলার উপজাতি নারীদের ওপরে গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য তিনি সবার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। তিনি তার বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে উপজাতি নারীসমাজের ওপরে শোষণ ও বঞ্চনের কথা তুলে ধরেছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক মনিপুরি নারী সাবিত্রী হেইসনামকে নারী নির্যাতনে মুখ্য প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। এবং সাবিত্রীকে জোয়ান অব আর্ক স্থানে স্থান দিয়েছেন।

মহেশ্বতাদেবীর ভাব গল্পের উচ্ছব খাবল খাবল ভাত খায়। ভাতে হাত ঢুকিয়ে দিতে সে স্বর্গসুখ পায় ভাতের স্পর্শে। চুন্নির মা কখনো তাকে এমন সুখ দিতে পারিনি। খেতে খেতে তার কী হয়। ভাতের স্পর্শে চুন্নির মা মুখ ডুবিয়ে দিয়ে খায় শুধু ভাত বাদার ভাত ভাদার ভাত খেলে তবে তো সে আসল বাদার খোজ পেয়ে যাবে। একদিন আছে আরেকটা বাদ্য আছে। সে বাদার খোঁজে নির্ঘাত পাবে উচ্ছব। আরো ভাত খেয়েনি চুন্নি তুই ও খা। চুন্নির মা ও খা। ছোট খোকা খা, আমার মধ্যে বসে তোরা খা। এবার পানি খায়, তারপর আরো ভাত। ভোরের ট্রেনে চেপে বসে সোজা ক্যানিং যাচ্ছি। ভাত পেটে পড়েছে এখনো ঝানচি যে ক্যানিং হয়ে দেশঘরে যেতে হবে। উচ্ছব হাঁড়িটি ঝাপটে টানায় মাথা ছুঁয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, তার শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে হাজার চুরাশির মা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।
অন্যান্য জনপ্রিয় বই হলো- তারুণ্যের অধিকার, নৈশেঘ, গণেশ মহিমা, চটিমুণ্ডা এবং তার তীর, শালগিরার ডাকে, নীলছবি, বন্দোবস্তী, আইপিসি ৩৭৫, সম্প্রতি প্রতি ৫৪ মিনিট মুখ, তিতুমীর ইত্যাদি। ১৯৭৯ সালে সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পান। সমাজসেবা ১৯৮৬ সালে পদ্মস্মৃতি, ১৯৯৬ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, এশিয়ার নোবেল নামে খ্যাত রেমন এক্সেস পুরস্কার ১৯৯৭ সালে লাভ করেন। ২০০৬ সালে পদ্মভুষণ ও ২০০৭ সালে স্যার সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালে যশবন্তরাও চবন জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ২০১৬ সালে ২৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি মরেও অমর।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫