ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

ক্লাসিক

ভাটিয়ালী গানের বরপুত্র আবদুল আলীম

মাহমুদ ইউসুফ

২৭ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৫১


প্রিন্ট

নদীর স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে যে রাগিণীতে গান গাওয়া হয় তাকে ভাটিয়ালী গান বলে। ভাটিয়ালী একটি রাগিণীর নাম। ভাটিয়ালী নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের জনপ্রিয় গান। বাংলাদেশের অধিবাসীদের প্রাণের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত একটি বিশিষ্ট সম্পদ এই গান। নদীর মাঝি বা নদীপাড়ের জনজীবনে এই গানের প্রচলন অত্যধিক। নদীর স্রোতের সাথে আছে জীবনের চলার এক অপূর্ব সাদৃশ্য। ভাটিয়ালী গানের সাথে ভাটি, মাল্লা-মাঝি, নৌকা, দাঁড়, গুন, পাল, খাল, নদী, দুই পারের জনবসতি প্রভৃতির প্রসঙ্গ জড়িত। সাথে থাকে গ্রামীণ জীবন, গ্রাম বাংলার মানব-মানবীর প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ-অনুভূতি, বিরহ-আকুলতা ইত্যাদির সম্মিলন। অন্যভাবে বলা যায়, ভাটিয়ালী হলো বোটসম্যানস সং বা মাঝিমাল্লাদের গান। আবদুল আলীম ছিলেন এই ভাটিয়ালী গানের মহানায়ক। ছিলেন পল্লীগানের একনিষ্ঠ সাধক এবং লোকসংস্কৃতির মুখপাত্র।

ভাওয়াই সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ আর ভাটিয়ালী সম্রাট আবদুল আলীম বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের দুই মহীরুহ। তাদের বাদ দিয়ে বাংলার সুর সঙ্গীত, গানের ভুবন, বিনোদন তথা কৃষ্টি কালচার নিয়ে আলোচনা করা যায় না।
আবদুল আলীমের অ্যাকাডেমিক শিক্ষা তেমন ছিল না। তিনি ছিলেন জাতশিল্পী, জন্মগতভাবে শিল্পী বা বর্ন আর্টিস্ট। তিনি গানের জগতে প্রবেশ করেন ১৯৪৩ সালে। ইসলামি গান দিয়ে তার সঙ্গীতসাধনা শুরু। ১৯৭৪ সালে মৃত্যু পর্যন্ত গান ছিল তার জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। নেশা আর পেশা। তার চিন্তা, মন, মনন, প্রচেষ্টা, কর্ম, সাধনা সবই ছিল সঙ্গীতকেন্দ্রিক। পল্লীগানের উন্নয়ন এবং বিশ^দরবারে তার প্রতিষ্ঠায় তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। তার রেকর্ডকৃত প্রথম গান দুটি হলো : ‘আফতাব ঐ বসলো পাটে আঁধার এলো ছেয়ে, চল ফিরে চল মা হালিমা আছেরে পথ চেয়ে।’ এবং ‘তোর মোস্তফাকে দে না মাগো, সঙ্গে লয়ে যাই, মোদের সাথে মেষ চারণে ময়দানে ভয় নাই।’ গীতিকার ছিলেন মোহাম্মাদ সুলতান। জাতীয় কাজী নজরুল ইসলামের নির্দেশে তাঁরই সুরে গান দুটির রেকর্ড করেন মেগাফোন কোম্পানির ট্রেনার ধীরেন দাস। সময় : ১৯৪২ সাল, কলকাতায়।
আবদুল আলীম প্রধানত ভাটিয়ালী তারকা হলেও আধ্যাত্মতত্ত্ব, মুর্শিদী, গজল, বাউল, ইসলামি সঙ্গীত, বিচ্ছেদী, মেয়েলী গীত, প্রেমমূলক ও চলচ্চিত্রের গানও গেয়েছেন প্রচুর। তবে ইসলামি সঙ্গীত দিয়েই তার শুভযাত্রা। সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেছেন এর ওপর ভিত্তি করে।
আবদুল আলীম আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া আমি ভাবি যারে, এই সুন্দর ফুল, বেলা দ্বিপ্রহর-আল্লা মেঘ দে প্রভৃতি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। আল্লা মেঘ দে পানি দে, ছায়া দেরে তুই- আবদুল আলীমের কণ্ঠে এ গান যখন ধ্বনিত হয়েছিল বর্তমান মিয়ানমারে, তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। (সৈকত আসগর : আবদুল আলীম, পৃ ৩৯ )

আব্বাসউদ্দীন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে- গানখানা বহুবার গেয়েছি। যত দিনই গেয়েছি। গানের শেষে ‘ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ উপখ্যান বা প্রবাদবাক্য কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে।
চীনের প্রধানমন্ত্রী মি. চৌ এন লাই ঢাকায় এলেন। আমরা এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গুলিস্তান সিনেমা হলে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাই। সন্ধ্যা ৭টায় নাচ-গান আরম্ভ হলো। রাত ৯টায় অনুষ্ঠান শেষ হয়। এই অনুষ্ঠানে আমি আল্লা মেঘ দে পানি দে গানখানি পরিবেশন করেছিলাম।
অনুষ্ঠান শেষে প্রতিটি শ্রোতা হলের বাইরে এসে থমকে দাঁড়ালেন। বাইরে আরম্ভ হয়েছে ঝমঝমাঝম বৃষ্টি। অথচ প্রেক্ষাগৃহে যখন সবাই ঢুকেছিলাম তখন ছিল তারকাখচিত নির্মল আকাশ।
মি. চৌ এন লাই ঢাকা পরিত্যাগের পূর্বমুহূর্তে বিমানঘাঁটিতে বলে গিয়েছিলেন, এ দেশের অনেক কিছুই হয়তো ভুলে যাবো কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় একটি চিত্র বহু দিন দাগ কেটে থাকবে। সেটা হচ্ছে- তোমাদের দেশের শিল্পী গান দিয়ে আকাশের পানি আনতে পারে’ (আব্বাসউদ্দীন আহমদ : আমার শিল্পী জীবনের কথা, পৃ. ১৩৯-১৪০)।

সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০টির মতো গান রেকর্ড হয়েছিল আবদুল আলীমের। বেতার টিভিতে রেকর্ডকৃত গানের সংখ্যা প্রায় ৮০টি। প্রথম ছায়াছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ শুরু করে প্রায় ৫০টি ছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গীত নিদর্শন : সদা মন চাহে মদিনা যাবো, আফতাব ঐ বসল পাটে আঁধার এলো ছেয়ে, তোর মোস্তফাকে দে না মাগো, এই সুন্দর ফল সুন্দর ফুল মিঠা নদীর পানি, নবী মোর পরশমণি নবী মোর সোনার খনি, আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, রুপালী নদীরে রূপ দেখে তোর হইয়াছি পাগল, গহিন গাংগে ধরলাম পাড়ি- গাংগের ঠিকঠিকানা পাইলাম না, ও বিদেশী নাইয়া ঝিলিমিলি পাল তুলে যাও, ভাটি গাঙ্গে ভাইটাল সুরে বাঁশি কে বাজাইয়া যাওরে বন্ধু, ও ধীরে ধীরে ভাটির গাঙ্গে ভাটির দেশে যাও তরণী বাইয়া, উজান দেশের মাঝি ভাই ধন ভাটির দেশে যাও, সারা জীবন বাইলাম তরী সারি গান গাইয়া, সে পাড়ে তোর বসত বাড়ি এ পাড়ে তোর বাসা, শোন ওভাই মন মাঝিয়া নাও যেন যায় না ডুবিয়া, প্রাণের বন্ধুয়ারে সহে না দারুণ পরানে, নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা কোন দূরে যাও চইলা, কৈ রইলি তুই পিরিতি শিখাইয়া রে বন্ধু বিনোদিয়া, আহারে মন পাখি তুই আর কত কাল থাকবি খাঁচাতে, দীনের দরদি রে আমার নৌকা বাইয়া দেয়, মনের ভাব না জানিয়া পিরিতি কইরো না, আরে ও বন্ধু রইলে কোথায় তোরে না দেখলে মোর প্রাণ যায়, পথের দিশা দাও গো মুর্শিদ পথের দিশা দাও, থাকবো না আর এই আবেশে চলরে মনা আপন দেশে, মন পাখিরে জান নাকি কোথায় সে ঠিকানা, মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায় সালাম আমি করব গিয়া নবীজীর রওজায়, পুবাল হাওয়া পশ্চিমে যাও কাবার পথে বইয়া, ঘরে আমার মন বসে না কেমনে ঘরে রই, বউ কথা কও বউ কথা কও রইলা পাখি ডাকে সকাল সাঁঝে, কে কান্দেরে নদীর কিনারায়, দাগের মতো দাগ লাগাইলি রে নিঠুর কালিয়া, ও গুণের ননদ লো ও সাধের ননদ লো, ও ধান ভানিরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, তোমার সবই ছিল জানা, গঙ্গায় তো রাঙ্গা ঢেউ খেলে ও বুবু জান, ও বন্ধুরে প্রেম দরিয়ায় এত যে ঢেউ আগে না জানিতাম, তেরে ইস নদিয়ামে মুঝকো কেয়া রঙ্গ দেখায়ে, ঢেউ উঠছে সাগরে রে কেমনে পাড়ি ধরি রে, এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি, ছাড়িলাম হাছনের নাও রে, আমি ভাবি যারে পাই নাগো তারে সে যেন কতই দূরে, কেউ কোনো দিন বাইন্ধো না ঘর মেঘলা নদীর চরে, ভোমরা রে গাইও না গান গুণ গুণ, মনের মানুষ হইয়া যদি মনের কথা কও, তোরে দেখলে পরে অঙ্গ জ¦লে না দেখিলে প্রাণ যায়, না না না তোমার সাথে কথা বলুম না, ওলো সুন্দরী তুই ঘরে আয়, কার কথায় কইরাছো এত মন ভারি, হলুদিয়া পাখি সোনারই বরণ, দোল দোল দোলনি রাঙা মাথায় চিরুনি, উজান গাঙের নাইয়া, আমায় পোড়াইলিরে তোর রূপের আগুন দিয়া, উজান দেশের মাঝি ভাই ধন, ও পদ্মা নদীরে, পরে জায়গা পরের জমিন, সুজন সখিরে পার করিতে নেব আনা আনা, দুয়ারে আইসাছে পালকী নাইয়রি যাও তুলো রে তুলো মুখে আল্লাহ রসুল সবে বল ও মুখে আল্লাহ রসুল সবে বল ইত্যাদি।
আবদুল আলীমের প্রধান পরিচয় তিনি কণ্ঠশিল্পী। তিনি গীতিকার বা সুরকার ছিলেন না। অনেক গীতিকারের গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন, অনেক সুরকারের সুরে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তা ছাড়া অনেক বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পীর বিখ্যাত গানকে কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। আবদুল আলীম ছিলেন আবদুল লতিফের পল্লীগানের ভাণ্ডারী। তঁরা অনেক বিখ্যাত গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। (সৈকত আসগর : আবদুল আলীম, পৃ ৪০ )

ডিশ কালচার বা আকাশ সংস্কৃতি, বিজাতীয় কৃষ্টিকালচার, বলিউড বা হিন্দি ফিল্ম, কলকাতার বাংলা সঙ্গীতের ভারে হারিয়ে যাচ্ছে আবদুল আলীমের লোকগীতি। বিলুপ্ত হচ্ছে পল্লীগীতি এবং আবহমান বাংলার চিরায়ত সম্পদ। এটা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। আবদুল আলীমের প্রতি উদাসীনতা আমাদের আশাহত করে। 

 

এ বিভাগের আরো কিছু সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫