ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

গল্প

চিঠি

সাহিদা সাম্য লীনা

২৭ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:১৮


প্রিন্ট

কেঁদে কেঁদে সারা রাত বালিশ ভিজাল রাহিমা। রাতে একটুও ঘুমায়নি। তবে আজ কান্না পাচ্ছে কেন, রাহিমার এত দিন পর। যে কান্নাটা করার কথা এক বছর আগে। সেদিন একটুও কান্না আসেনি। কেমন যেন হয়ে গেছিল রাহিমা সেদিন। যেন দাঁড়িয়ে থাকা এক মূর্তি! শুনেছি বড় আঘাত পেলে এমনি হয়। চুপচাপ হয়ে যাওয়া। বুক আর চোখ হয়ে যায় পাথর। যে পাথর থেকে বৃষ্টি ঝরে না। বুক থেকে বেরিয়ে আসে না তখন কোনো কষ্টের স্রোত! কোনো অভিযোগ রাখেনি সেদিন।

সেদিন এমনি আঘাত পেয়েছিল রাহিমা যেন পৃথিবীটাই তখন তার কাছে অচেনা লাগছিল। আকাশ সমান অন্ধকার এসে ভর করে ফেলেছিল ওকে। জীবন চলে জীবনের নিয়মে। কারো জন্য বসে থাকে না। সবাই আসবে এই জগতে। আবার কেউ চলে যাবে আগে ও পরে। এটাই নিয়তি। আবার কেউ কাউকে ভালোবাসতে সবসময় পারেও না। এটাও মেনে নিতে হয়। রাহিমাও মেনে নিয়েছিল। সব কিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছে জীবনের বহতা ঘরে! শুধু একজন মানুষের শূন্যতা! একজনের অভাব তাকে দিনের পর দিন কুরে কুরে খাচ্ছে। যা ওর কপালে নেই আর যতক্ষণ ওর জন্য ছিল, এই ভেবে সেসব ভুলে ছিল কাজের মধ্যে। যেন ওর কেউ ছিল না কখনো এমন ভাব!

কাল রাতে ফোনটা পেয়েই তো কান্না এলো ওর। এখনো কাঁদছে রাহিমা। একজন স্বপ্নের মানুষ নয়ন। ঢাবিতে ভর্তির পরেই দুজনের পরিচয়। নয়নের ব্যক্তিত্ববোধই রাহিমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। নয়নও ভীষণ পছন্দ করত রাহিমাকে। দু’জনেই একি সাবজেক্ট নিয়ে পড়ে। যাতে একজন আরেকজনের কাছ থেকে কোনো কারণে দূরে না থাকতে হয়। একসাথে পড়া, ক্লাসে যাওয়া সব হতো। অনেক আনন্দসুখে কেটেছে সেই সময়গুলো। এক সাথে পাস করে বেরোলো দুজন। চাকরিও পেল দু’জন এক সাথে। রাহিমা একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি নিলো। আর নয়ন একটা বিদেশী সংস্থার মার্কেটিং অফিসার। এভাবে চলছিল ওদের। চাকরি হওয়ার কারণে দু’জনের দেখা আগের চাইতে একটু কমে গেল। ফোনে কথা হতো। তবে নয়ন অনেক ব্যস্ত থাকত।

এক ছুটির সকালে দেখা করল দুজন। রাহিমাই কথা তুলল। নয়ন দেখ, অনেক তো হলো। চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। নয়ন যেন অবাক হয় এ কথা শুনে। বলে, দেখ রাহিমা এখনো সময় আছে বিয়ে করার। আমি তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না। আমরা দুজন আর একটু নিজেদের গুছিয়ে উঠি। রাহিমা নয়নের কথায় ওর চোখের দিকে তাকায়। নয়নকে কেন জানি অচেনা লেগেছিল সেদিন।
একদিন অফিসে রাহিমা। ফোন করে জানায় ওর ছোট খালা- হ্যাঁ রে, শুনছিস আজ একটা বিয়ে খেতে গেলাম কমিউনিটি সেন্টারে, আমাদের পাশের বাসার মেয়ে। ওর বর যে ছেলেটা ওকে চেনা মনে হলো। নয়নের মতো দেখতে মনে হলো। অবশ্য ওর বরের নাম জিজ্ঞেস করিনি। একটু খবর নিস তো! ছোট খালার কথা শুনে রাহিমা প্রথমে অবাক হলেও, হেসে উড়িয়ে দেয়। বলে কি যে, বল খালা, ওর সাথে সেদিনও দেখা হলো। এমন হলে নিশ্চয় জানাত! ছোট খালাকে বুঝিয়ে রেখে দিল ফোন রাহিমা। কিন্তু পরক্ষণে কি যেন সন্দেহ হতে লাগল রাহিমার। সে খবর নিলো।

প্রথমে ওর বন্ধুরা কেউ ঠিক জানাতে পারল না। দুই দিন পর ওদের ইউনিভার্সিটির বন্ধু রেখার মাধ্যমে জানলো সবে ইন্টার পড়া এক মেয়েকে পরিবারের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে নয়ন। খবরটা শুনে ভীষণ আহত হয় রাহিমা। অবাক হয় তবে কি ওর সৌন্দর্য সব নষ্ট হয়ে গেছে! যা নয়নকে আর ধরে রাখতে পারেনি। এতদিনের সব স্মৃতি, দেয়া কথা কিছুই তো রাখল না নয়ন! এত সময় তারা দু’জন-দু’জনকে দিয়েছিল; কিভাবে ভুলে গেল নয়ন! ওর সব মিথ্যা অভিনয় ভেবে রাহিমা নিজেকে সামলে নিলো। অফিসের কাজে নিজেকে এতটা ব্যস্ত রাখল আর নয়নের কথা মনেই পড়েনি! কখনো তার সামনে যাওয়ার সুযোগও রাখল না। এভাবে এক বছর কাটল। কাল রাতেই ফোন এলো। সে রেখাই জানাল রাত ৯টার দিকে নয়ন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। কেউ টের পায়নি। যখন পেল হাসপাতালে নেয়ার পথেই সব শেষ। শোনার পর থেকেই কেঁদেই যাচ্ছে রাহিমা। ওর বিয়ের খবরে কাঁদেনি এক বছর। নয়নের প্রতারণায় দুঃখ পেলেও সব অভিমান জমা ছিল বোধহয়। নইলে এতটা কান্না এলো কেন রাহিমার আজ! ওর প্রতি এত রাগ আজ নয়নের মৃত্যুর খবরে সব চলে গেল।

রাহিমার আজ মনে হলো ও একা হয়ে গেছে। ওর আপন কেউ নেই। ইউনিভার্সিটির রঙিন দিনগুলো মনে পড়ল রাহিমার। কত সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত ওদের। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল রাহিমা। উঠল বেলা করে। অফিস গেল না। ছুটি নিলো এক সাপ্তাহের। রুমেই থাকল সারাদিন। নয়নের দেয়া কিছু গিফট ছিল- এক একটা দিবসের। কখনো জন্মদিনের বা ভালোবাসা দিবসের। এরকম কয়েকটা। নয়নের ছবির ওপর চোখ রেখে অনেকক্ষণ কাঁদল আবার।

দরজার বেল বাজল। পিয়ন এসেছে। রাহিমার নামে রেজিস্ট্রি করা একটা খাম। পাশে নয়নের ঠিকানা লেখা। খামের গায়ের তারিখ তিন দিন আগের! রাহিমা রুমে এসে খামটা খুলে।
নয়ন লিখেছে- রাহিমা, ক্ষমা করে দিও। মা বাবার অবাধ্য হতে পারিনি। এত দিন তোমাকে ফোন করার ও সামনে যাওয়ার সাহসও করতে পারিনি। সেদিন তোমাকে রিকশায় দেখলাম। খুব কথা বলতে ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু তোমার কাছে আমার সেই সাহস আর যোগ্যতা সব হারিয়ে ফেলেছি। আমার সব অক্ষমতাকে ক্ষমা করে দিও।

রাহিমা জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। গেটের সামনে শিউলি গাছের নিচে সকালের বাসি ফুলগুলো পড়ে আছে। কিন্তু গন্ধ ছড়াচ্ছে এখনো। নয়নের ভালো লাগত শিউলি ফুল। রাহিমা ওকে ছোট করে মালা গেঁথে দিতো। নয়ন শুকানো পর্যন্ত রেখে দিতো।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫