ঢাকা, বৃহস্পতিবার,১৭ আগস্ট ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

প্রবাসী আয়ের এপিঠ-ওপিঠ

ফারিহা তাবাস্সুম

২৪ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ২০:০৭


প্রিন্ট

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীরা মোট এক হাজার ২৭৭ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন ৮০ লক্ষাধিক বাংলাদেশী। বিএমইটির তথ্য মতে, শুধু ২০১৬ সালেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রবাসে গিয়েছেন প্রায় সাড়ে সাত লাখ কর্মী। এ বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের জাতীয় আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস, জিডিপিতে যার অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। সুতরাং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ খাতের গুরুত্ব ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু টেকসই অর্থনীতির বিচারে ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান ধারার জনশক্তি রফতানিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা আলোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকের বেশির ভাগই অদক্ষ। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রবাসে কর্মরত মোট বাংলাদেশী শ্রমিকদের মধ্যে দক্ষ শ্রমিকের হার মাত্র ৪২ শতাংশ। আর এদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ পেশাজীবী। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে শ্রমের চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং বিদ্যমান চাহিদার মধ্যে দক্ষ শ্রমের চাহিদা অধিক হওয়ায় প্রবাসী এসব শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সঙ্কুলান ক্রমেই কমে যাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রবাসমুখী হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বেড়ে চলেছে। ফলে প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও কমছে রেমিট্যান্স এবং সেই সাথে বিপর্যয়ে পড়ছে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবার-পরিজন। অনেক ক্ষেত্রেই অধিক আয়ের হাতছানিতে পৈতৃক জমি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দেয়া একজন মানুষ যখন কোনো কর্মসংস্থানই জোটাতে পারেন না, তখন তার প্রবাসে থাকাও অসম্ভব হয়ে যায়, আবার দেশে ফেরাও দায় হয়ে পড়ে।
অন্য দিকে দেখা যায়, দীর্ঘ দিন প্রবাসে বাস করে ও বেশ ভালো পরিমাণ অর্থ আয় করে দেশে ফেরার পরও প্রবাসীরা অনেক ক্ষেত্রেই উপার্জনহীন হয়ে পড়েন। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে প্রবাস থেকে পাঠানো আয়ের বেশির ভাগ দিয়েই একটি দৃষ্টিনন্দন বসতবাড়ি তৈরির প্রবণতা দেখা যায়। ফলে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ আয় করার পরও সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পুঁজি গড়ে ওঠে না, যা দিয়ে দেশে ফেরার পর ভালো কোনো ব্যবসায় শুরু করা যায়। অন্য দিকে শ্রমের দক্ষতা গড়ে না ওঠার কারণেও অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘সামাজিক মর্যাদা’ রক্ষার্থে কোনো প্রচলিত কর্মসংস্থানেও তারা আগ্রহী হন না। তাই প্রবাসফেরত শ্রমিকদের অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা প্রায়ই স্থবির হয়ে পড়তে দেখা যায়।
প্রবাসী আয় ও জনশক্তি রফতানির রয়েছে একটি আর্থসামাজিক প্রভাব। প্রবাসযাত্রার মাধ্যমে অধিক অর্থ আয়ের হাতছানি ও বিপুল পরিমাণ শ্রম রফতানির ফলে যেসব নেতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী আর্থসামাজিক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে আমরা খুবই উদাসীন। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখন সাধারণ একটি প্রবণতা হলো, ছেলেরা পড়াশোনায় মনোযোগী না হলে বা বখে গেলে সহজ সমাধান হিসেবে তাদের প্রবাসে উপার্জন করতে পাঠিয়ে দেয়া। আবার যেকোনো উপায়ে বিদেশ যাওয়া এখনো একটি সন্দেহাতীত সম্মানজনক ও আকাক্সিক্ষত বিষয় বলে বিবেচিত হওয়ায় গ্রামীণ কিশোর-তরুণদের মধ্যে অনেক সময়ই শিক্ষাগত যোগ্যতা লাভের চেয়ে যেনতেন উপায়ে প্রবাসে কাজ করতে যাওয়ার প্রতি ঝোঁক অধিক পরিলক্ষিত হয়। আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলা এ প্রবণতার ফলে আমাদের গ্রামীণ সমাজের তরুণদের একটি বড় অংশ স্বল্পশিক্ষিত ও অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি বড় হুমকি। পাশাপাশি প্রবাসে কাজ করার প্রতি এ অন্ধ মোহের কারণে তৈরি হচ্ছে দেশীয় উৎপাদনশীল ও দক্ষতানির্ভর কর্মসংস্থানের প্রতি ক্রমবর্ধমান অনীহা।
গণহারে শ্রম রফতানির আরেকটি আর্থসামাজিক প্রভাব পড়ছে আমাদের পরিবারব্যবস্থায়। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের বেশির ভাগ পরিবার এখনো গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক। অর্থাৎ পরিবারের সদস্যদের সার্বিক দেখাশোনার মূল দায়িত্ব পিতাদেরই নিতে দেখা যায়। অথচ গণহারে প্রবাস গমনের ফলে অনেক পরিবারেই দীর্ঘসময়ের জন্য পিতার অনুপস্থিতি থাকে। প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় এর ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই বিরূপ। এক দিকে পিতার অনুপস্থিতিতে পরিবারের নিয়ম-শৃঙ্খলা শিথিল হয়ে পড়ায় উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। যে কারণে অনেক সময় পড়ালেখা ছেড়ে দেয়া, মাদকাসক্ত হয়ে পড়া ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। অন্য দিকে প্রবাসীদের মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সন্তানদের জন্য বিভিন্ন অত্যাধুনিক গেজেট বা যন্ত্র পাঠানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। গ্রামীণ পরিবেশে এসব গেজেট ব্যবহারে কোনোরূপ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কম থাকায় প্রবাসীদের সন্তানদের ও পাশাপাশি তাদের সঙ্গী-সাথীদের বিপথগামিতার সুযোগ তৈরি হয়। তা ছাড়া পরিবারের একজন সদস্য প্রবাসগামী হলে বাকি তরুণ ও যুবক সদস্যদেরও তার সাহায্যে প্রবাসমুখী হওয়ার যে প্রবণতা গ্রামীণ সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে তা পরিবারগুলোকে করে তুলছে পুরুষশূন্য, যা নিরাপত্তা ও অন্য মৌলিক পারিবারিক গুণাবলিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সর্বোপরি প্রবাসে কাজ করতে যাওয়ার মাধ্যমে স্বল্পসময়ে অধিক আয় নিশ্চিত করার অন্ধ প্রবণতা আমাদের এর আর্থসামাজিক ও সুদূরপ্রসারী ফলাফলগুলো থেকে উদাসীন করে রাখছে। অর্থনীতির চাকার গতিশীলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ খাতটির সম্ভাবনা যেন সঠিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে বিলীন না হয় এবং এর নেতিবাচক আর্থসামাজিক প্রভাব যেন আড়ালে থেকে না যায় তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য প্রবাসী, প্রবাসে গমনেচ্ছুক ও তাদের পরিবারসহ সার্বজনীন গণসচেতনতা বৃদ্ধি যেমন জরুরি, তেমনি দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারও আবশ্যক। তা ছাড়া যেনতেন উপায়ে বিপুল পরিমাণ অদক্ষ জনশক্তি রফতানির চেয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে দক্ষ জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে অধিক কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। ডেমোগ্রাফির স্বর্ণালি পর্যায়ে থাকা এ দেশের জনশক্তিকে টেকসই ও উন্নত জনসম্পদে পরিণত করার জন্য শ্রম রফতানির এ সম্ভাবনাময় খাতকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও এর সার্বিক প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫