ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

প্রকৃতি ও পরিবেশ

রাজধানীতে লাল রক্তের কালো ব্যবসা

আবুল কালাম

১৪ জুন ২০১৭,বুধবার, ১৭:১৭ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৩৯


প্রিন্ট

রাজধানীতে চলছে আসল রক্তের নকল বানিজ্য। ব্লাড ব্যাংক থেকে কেনা রক্তে রোগীরা বহন করে নিয়ে যাচ্ছে মরণব্যাধির মারাত্বক সব ভাইরাস। রক্তের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ রোগ জীবাণু। বাড়ছে মরণব্যাধি এইচআইভি এইডস-এ আক্রান্ত হবার ঝুঁকি।

অন্যদিকে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগও দেশজুড়ে রক্ত পরীক্ষা আর নিরাপদ রক্তের যোগান নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে দিন দিন বাড়ছে লাল রক্তের কালো বানিজ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা রক্তে মিলছে মরণব্যাধির সব ভাইরাস। এসবের মধ্যে রয়েছে হেপাটাইটিস-বি ও সি, এইচআইভি (এইডস), ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, এনিমিয়াসহ নানা রোগের জীবাণু। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্লাড ব্যাংকগুলো থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনায় হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিস ও এইডসের জীবাণু পাওয়া গেছে। এ তথ্যানুযায়ী, পরীক্ষা করা ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৬ ব্যাগ রক্তের মধ্যে ৩ হাজার ৪২৯ ব্যাগে বিভিন্ন রোগের জীবাণু পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৮৭ ভাগ ব্যাগের রক্তেই ছিল হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস। বাকি ব্যাগগুলোর মধ্যে ৩ হাজার ব্যাগে হেপাটাইটিস-সি, ১৪২ ব্যাগে সিফিলিস ও ১৩ ব্যাগে এইচআইভি জীবাণু পাওয়া যায়। যা রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে বেশ উদ্বেগের বিষয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ‘রক্ত সঞ্চালন বিভাগ’ সূত্রে জানা যায়, এখানে গড়ে প্রতিদিন ১০০ ব্যাগের মতো রক্ত রোগীরা বিভিন্ন প্রয়োজনে নিয়ে যায়। স্ক্রিনিং করে প্রতিদিন পাঁচ-ছয় ব্যাগ অনিরাপদ রক্ত পাওয়া যায়। এ হার আশঙ্কাজনক। অপরদিকে স্বেচ্ছায় রক্ত দানকারী সংগঠন সন্ধানীর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৯ শতাংশ রক্তদাতাই মাদকাসক্ত। এইচআইভি, এইচসিভি, এইচভিএসজি, ভিডিআএল ও ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের জীবাণু রয়েছে তাদের রক্তে।

তাদের মতে, প্যাথেডিন জাতীয় মাদক নিতে গিয়ে এরা একে অপরের সুই ব্যবহার করে। যার মাধ্যমে রক্তে হেপাটাইটিস বি ও সি, এইডস জাতীয় রোগের জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। মাদকের টাকা যোগাড় করতেই এরা প্রতিনিয়ত রক্ত বিক্রি করে। আর এদের ক্রেতা হচ্ছে রাজধানীর বৈধ-অবৈধ অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংক।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ব্লাড ট্রান্সমিশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিরাপদ রক্তের জন্য একজন রক্তদাতাকে কমপক্ষে ভয়াবহ পাঁচটি রক্তবাহিত ঘাতক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিতে হয়। এগুলো হলো: হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি বা এইডস, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিসের মতো কঠিন রোগ। সাধারণত সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন ছাড়া রক্ত পরিসঞ্চালন করা ঠিক নয়। আবার ‘ক্রস ম্যাচ’ ও স্ক্রিনিং রিপোর্ট ছাড়া রক্ত পরিসঞ্চালন করা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের বেশীর ভাগ প্রতিষ্ঠান তা উপেক্ষা করায় তার ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৪০টির বেশি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। তবে সারাদেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা শতাধিক। অবৈধ ব্লাড ব্যাংক তো নিয়ম মানছেই না, তার ওপর লাইসেন্স নিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে বৈধ ব্লাড ব্যাংকগুলো। তারা শুধু পেশাদার রক্ত বিক্রেতার কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তা প্যাকেটজাত ও ফ্রিজবন্দি করে তা চড়া মূল্যে বিক্রি করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হলেও মিলছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ লাখ ব্যাগ রক্ত। এসব রক্তের মধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের কার্যক্রমের আওতায় স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে আসছে ৮০ হাজার ব্যাগ। কিছু সংগৃহীত হচ্ছে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে। আর অবশিষ্ট রক্তের জোগান আসছে পেশাদার রক্তদাতার কাছ থেকে। যার সবটাই জোগান দেয় কথিত ব্লাড ব্যাংকগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশজুড়ে অর্ধ লক্ষাধিক পেশাদার রক্তদাতা রয়েছেন। এ সংখ্যা ঢাকাতেই শুধু ২৫ হাজারের বেশি। এসব পেশাদার রক্তদাতারা নানা জটিল মরণ ভাইরাসে আক্রান্ত। তাদের বেশির ভাগ মাদকাসক্ত, হেরোইনসেবী, ও নানা ধরনের ভাসমান মানুষ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে এই রক্ত রোগীর জন্য ব্যবহার অনেকটা মৃত্যুর পরোয়ানা। মাদকাসক্ত কিশোর থেকে সকল বয়সের নারী-পুরুষ রক্ত বিক্রি করে নিয়মিত গ্রহণ করছে মাদকদ্রব্য। নেশার উপকরণ ক্রয় করার জন্য তরুণ-যুবকরা বিক্রি করছে রক্ত। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, মাদকাসক্ত তরুণ-যুবকসহ নারী-পুরুষের রক্তে মরণব্যাধি এইডস ও হেপাটাইটিস বি-ভাইরাসসহ নানা ধরনের সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু থাকার আশংকা একশতভাগ। মাদকাসক্তদের মধ্যে অনেকে নেশার ইনজেকশন প্যাথেডিন ব্যবহার করে থাকে। এই ইনজেকশন পুশ করার একই সিরিঞ্জ ও নিডল বহুবার ব্যবহার করা হয়। একসঙ্গে ৫ থেকে ৬ জন একই সিরিঞ্জ ও নিডল ব্যবহার করে থাকে। এই সিরিঞ্জ ও নিডলের মাধ্যমে মরণব্যাধিসহ সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু সহজে ছড়ায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডাইরোলজিষ্ট বিশেষজ্ঞ জানান, পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের ব্লাড ব্যবহারে মৃত্যুর ঝুঁকি একশত ভাগ। তিনি বলেন, দূষিত রক্ত রোগীদের দেহে ব্যবহার করার ফলে লিভার সিরোসিসের মতো মারাÍক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। বাড়ছে এইচআইভি/এইডস-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি।
অপরদিকে খ্যাতনামা লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান ও ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. নজরুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর আগে তারা রক্তদাতাদের ওপর এক জরিপ চালিয়েছিলেন। এতে দেখা গেছে, রক্তদাতাদের মধ্যে ২৯ ভাগ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে এবং ছয় ভাগ হেপাটাইটিস সি ও ই ভাইরাসে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৯০ ভাগ সিফিলিস ও গনোরিয়াসহ নানা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত। এব্যাপারে তারা পেশাদার রক্তদাতার রক্ত ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সংলগ্ন চানখারপুল মোড়ে ডোনার লাইফ ও ১২ নম্বর বকশীবাজার লেনে ঢাকা নিউ প্যাথলজি সেন্টার নামে দুটি ব্লাড ব্যাংক আছে। সেখানেও দেদার রক্ত বেচাকেনা চলে আসছে। সম্প্রতি র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত এগুলোতে অভিযান চালায়। ভ্রাম্যমাণ আদালত চাঁনখারপুল এলাকার ডোনার ব্লাড ব্যাংক থেকে সাত ব্যাগ রক্তের প্লাজমাসহ ৭০ ব্যাগ রক্ত উদ্ধার করে। যেখানে রক্ত দেয়ার পর রক্তদাতার নাম-ঠিকানার রেকর্ড পর্যন্ত রাখা হয়নি। পাঁচজন রক্তদাতার নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়, যারা সবাই ছিল মাদকসেবী। রক্তের প্লাজমা করার কোনো যন্ত্রও নেই ওই ব্যাংকে।
এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে র‌্যাব-১ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত রাজধানীর মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছেই অভিযান চালিয়ে দূষিত রক্ত বেচাকেনার দুটি অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের সন্ধান পায়। ভ্রাম্যমাণ আদালত মহাখালী আমতলার ২৪ নম্বর ভবনে দি ঢাকা ক্লিনিক এ্যান্ড প্যাথলজিতে এবং মহাখালীর নিউ এয়ারপোর্ট রোডের এইচ ১৮/১ নম্বর ভবনে সিটি ল্যাব এ্যান্ড ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালিয়ে সংগৃহীত দূষিত রক্তের বেশ কিছু ব্যাগ উদ্ধার করে। রক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রক্তদাতাদের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। যেখানে রক্তের ব্যাগের গায়ে ব্যবহার করার কোনো সময়সীমা উল্লেখ ছিল না। এছাড়া ব্লাড ব্যাংক দুটির বৈধ লাইসেন্সও নেই। ভেতরে ছিল নোংরা-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এছাড়া শেরে বাংলা নগর, মিরপুর, মহাখালী, মিটফোর্ড, ধানমণ্ডি- এলাকায়ও অনেক প্যাথলজি সেন্টারেও চলছে রক্ত বেচাকেনার ব্যবসা।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় ভাগে ‘বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা’র ধারা-২ এ বলা আছে, ‘প্রত্যেক রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের গবেষণাগারে একটি বা দুটি ফার্মাসিউটিক্যাল রেফ্রিজারেটর, ব্লাড ব্যাংক ফ্রিজ, ডিপফ্রিজ, রক্তের নমুনা সংগ্রহের জন্য ডোমেস্টিক ফ্রিজ, কম্পাউন্ড মাইক্রোস্কোপ, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন, ওয়াটার বাথ, ইনকিউবেটর, ভিউ বক্স, ডিস্টিল্ড ওয়াটার প্লান্ট, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য ও রি-এজেন্ট থাকতে হবে। বিধিমালা ৯(২)(ঘ)-তে বলা আছে, রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রে রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসা কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ, টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, রেজিস্টার্ড নার্স ও ল্যাব সহকারী রাখার নিয়ম থাকলেও রাজধানীর অধিকাংশ বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক এমন নিয়মের তোয়াক্কাও করছে না। ফলে তাদের সরবরাহকৃত রক্ত নিরাপদ কি না সে বিষয়ে কোন নিশ্চয়তা নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫