ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

আবু সালেহ : বাংলা ছড়ার জ্বলন্ত কণ্ঠস্বর

আমীরুল ইসলাম

২০ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৫৩


প্রিন্ট

আমার আইকন ছড়াকার আবু সালেহ। তার সাথে আমার রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে। ভিন্ন ভিন্ন দলে অবস্থানের কারণে বিরোধ আছে। কিন্তু ছড়াপ্রেমিক হিসেবে আমরা আবু সালেহর অতিভক্ত।
তাঁর ছড়ার স্টাইল, তাঁর ক্ষুরধার শানিত শব্দ-ছন্দ, তাঁর তীব্রশ্লেষ- আমাদের ছড়ামনকে আন্দোলিত করত। সেই ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় আবু সালেহর পল্টনের ছড়া আমরা হাতে পাই। বাঁশ পাতার কাগজের মলাটের ভেতরে ১, ২, ৩ ... শিরোনামে শতাধিক ছড়া গ্রন্থিত হয়েছে। কোনো ছড়ার সঙ্গে সুমুদ্রিত ইলাস্ট্রেশন নেই। পাতায় কোনো ছবি নেই। দীপ্ত, শানিত ও তীব্র ছড়ার সম্ভার পল্টনের ছড়া। যেন আগুন নিয়ে খেলা। তাঁর পংক্তিতে পংক্তিতে আগুনের ফুলকি। যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তাঁর ছড়া বারুদের মতো।
তাঁকে বলা হয়- গণমানুষের ছড়াকার। তিনি লিখেন, যেন আগুন রচিত হয়।
সালেহ ভাই ছড়াকারদের অতি ভালোবাসেন। যখনই যেখানে দেখা হয়, তিনি জলদগম্ভীর মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করেন, কি আমীরুল, কেমন আছ? লেখার নতুন বইগুলা পাঠায়ও। পড়–ম। আমি যে তোমার ছড়ার মুগ্ধ পাঠক। কি লিখলা এর মধ্যে?
আমি কাঁচুমাচু হয়ে যাই। এত বড়ো জীবন্ত একজন টাটকা ছড়াকার আমার প্রশংসা করছেন। আমি জানি ছড়াকার জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কি হতে পারে!
আমি বহুদিন ইচ্ছা পোষণ করেছি যে, তাঁর শিষ্য হবো। তার পেছনে পেছনে ঘুরেছিও অনেক। কিন্তু প্রকৃত শিষ্য হতে পারিনি। চিরদিন সালেহ ভাইয়ের অফুরন্ত ভালোবাসা পেয়েছি আমরা। সালেহ ভাইয়ের বিরোধিতা করেছি। কিন্তু ছড়া লিখি বলে সাত খুন মাফ। কোথাও আমাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে, সালেহ ভাই তীব্রভাবে তার প্রতিবাদ করেন। রুখে দাঁড়ান। ছড়াকারদের ব্যাপারে তাঁর কোনো আপস নেই। সালেহ ভাই ছড়া ও ছড়াকার বিষয়ে এমনই মত্ত যে, আমাদের প্রায়ই বলতেন দেখে নিও ... বাংলাদেশ একদিন এগিয়ে যাবে ছড়াকারদের নেতৃত্বে। ছড়াকাররাই হবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।
আমরা মুখটিপে হাসি। সালেহ ভাইয়ের ছড়াবিষয়ক তীব্র প্রেমের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। প্রেম মানেই পাগলামি। সালেহ ভাই একজন ছড়াগত প্রাণ, ছড়াপাগল ব্যক্তি।
বিশাল রাজনৈতিক মঞ্চে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছড়া পাঠ করে উদ্বেলিত করেছেন জনগণকে। তিনি ছড়া লিখে জেল জুলুম সহ্য করেছেন। তিনি অন্যায় ও স্বৈরতন্ত্রের প্রতিবাদ করেছেন। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য কখনো লেজুড়বৃত্তি করেননি। পেশা হিসেবে সারাজীবন সাংবাদিকতা, রিপোর্টিং তাঁর প্রিয় বিষয়। একবার দৈনিক খবরে একটা রিপোর্ট লিখেছিলেন চিড়িয়াখানায় গাধা নেই, তখন এরশাদের স্বৈরশাসন। হেডিং এ শ্লেষ ও ব্যঙ্গ সহজেই বোঝা যায়। একজন প্রকৃত ছড়াকারই পারেন এমন হেডিং দিতে।
সালেহ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পিতৃব্য, খেলাঘর প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, বিখ্যাত শিশু সাহিত্যিক হাবীবুর রহমানের গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ছিল। যে কারণে সালেহ ভাই মুডে থাকলে বলতেন, জানো আমীরুল হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে আমার কেমন সম্পর্ক ছিল?
এই প্রশ্নের মধ্যে আমি টের পেতাম- সালেহ ভাই আমাকেও কেমন গভীর ভালোবাসেন। সালেহ ভাই খুব সাহসী মানুষ। খুব উচ্চকণ্ঠ। নিরাপস ও নির্লোভ ব্যক্তি। সালেহ ভাই রাজনৈতিক নেতা, সালেহ ভাই সাংবাদিক নেতা। কিন্তু তিনি ছড়াকারদেরও নেতা। এটাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ব্যক্তি আবু সালেহ অনেক বড় হৃদয়ের মানুষ। দরাজ দিল। সবার জন্য তিনি বুক খুলে রেখেছেন খাপখোলা তলোয়ারের মতো। সালেহ ভাইয়ের জন্য আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তাঁকে আমরা অনেক ভালোবাসি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তার সঙ্গে আমাদের কখনো বিরোধ হয়নি। সালেহ ভাইয়ের অন্ধ ও রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে আমি, রিটন ভাই, সানী ভাই উষ্মা প্রকাশ করেছি। হতাশ হয়েছি। সালেহ ভাইয়ের সাথে মৃদুকণ্ঠে ঝগড়া করেছি। কিন্তু তাতে সম্পর্কের কোনো ছেদ হয়নি।
এটা সালেহ ভাইয়ের বিশাল হৃদয়ের কারণে সম্ভব হয়েছে। কখনো কখনো অর্বাচীন বালকের মতো সালেহ ভাইয়ের রাজনৈতিক ছড়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছি।
সালেহ ভাই দূর থেকে সব শুনেছেন। কিন্তু কখনো প্রশ্ন তোলেননি। দেখা হলে জানতে চাননি। আর খুচরা ছড়াকারদের কেউ কেউ সালেহ ভাইয়ের নামে কুটনামি করে থাকেন। আমরা জানি, সালেহ ভাই সেসব গ্রাহ্য করেন না। কান কথা কানে তোলেন না।
মধুর হৃদয়ের এ রকম ছড়াকার আর জন্ম নেবে কি? সালেহ ভাই প্রায় এককভাবে ছড়া নিয়ে সংগ্রাম করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক ছড়া নিয়মিতভাবে দৈনিকের সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। সাপ্তাহিক পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো তাঁর ছড়া।
ছড়া ও ছড়াকারদের মর্যাদা নিয়ে সালেহ ভাই লড়াই করেছেন। বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। জেল খেটেছেন। কিন্তু বাড়তি সুযোগ সুবিধার জন্য কোনোদিন কাঙালিপনা করেননি।
সালেহ ভাই একাত্তর বছর বয়সী তরুণ যুবা। আমরা ছড়াকাররা তার ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না। তিনি একক। স্বয়ম্ভু। অদ্বিতীয়ম। বাংলা ছড়ার জ্বলন্ত কণ্ঠস্বর। হয়তো সর্বাধিক ছড়ার স্্রষ্টা তিনি। ছোটদের-বড়দের হাজার পঞ্চাশেক ছড়া তিনি লিখেছেন বলে আমরা জেনেছি।
প্রতিদিন সালেহ ভাই ছড়া লিখে থাকেন। যে কোনো সংবাদ কিংবা মুখের বুলি কিংবা রাজনৈতিক টানাপড়েন তাঁর হাতে তাৎক্ষণিক ছড়ার ফুল হয়ে ওঠে।
সালেহ ভাই কিংবদন্তিতুল্য ছড়াকার। আমি তাঁকে বলব ‘ছড়াকবি’। না তিনি ছড়াকার পরিচয়েই থাকতে চান, কবি হয়ে নন। সালেহ ভাই। আপনি জানেন না আমরা আপনাকে কতটা ভালোবাসি। আপনি আমাদের একমাত্র সম্মুখযাত্রী ছড়ালেখক। আমরা সবসময় আছি, আপনার সাথে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫