ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

গল্প

মনের আগুন

সিরাজুল করিম

২০ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:০৫


প্রিন্ট

ইদানীং আমাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই আছে। আমার আর রীনার। কেন জানি না, রীনা আমাকে আর সহ্য করতে পারে না। একদিন না পেরে বললাম, রীনা তুমি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ জান?
সে বলল, জানি না। আমার জানার দরকারও নেই।
বললাম, তুমি আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাচ্ছ।
আমি কেন নেবো ?
তবে কে?
তোমারই কর্মকাণ্ড।
বললাম, তোমার জন্যই তো আমার আজ এ অবস্থা। তোমার জন্যই আজ আমি নিঃস্ব, সর্বহারা।
ভেবে দেখো। আমি নই। তোমার বোকামিই তোমাকে পথে বসিয়েছে। তুমি আমাকে অহেতুক দায়ী করছ।
একদিন আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম, চিন্তাভাবনা ও কাজে কর্মে। আমাদের নৈকট্য অনেকেরই ঈর্ষার কারণ ছিল। আমরা ছিলাম একজন আরেকজনের আপনজন, নিকটজন ও প্রিয়জন। এখন আমরা দূরের মানুষ। বিয়ের পর দু’বছর হলো। আমরা আজ এ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের আছে এক বছরের একটা ফুটফুটে ছেলে। আমরা যখন ঝগড়া করি, তখন সে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে এক অপলক দৃষ্টিতে। মনে হয় অবোধ শিশুটা চেষ্টা করে দু’জনের ঝগড়া থামাতে। কিন্তু পারি না আমরা কেউ। না পারি আমি, না পারে রীনা। একদিন প্রচণ্ড ঝগড়া হচ্ছিল আমাদের। ছেলেটার কান্না থামানো যাচ্ছিল না। একসময় রীনা তাকে বুকে তুলে নেয়। তারপর সে শান্ত হয়।
রীনা হয়তো ভাবছে আজ কেন তার এই দুর্ভোগ। আমার প্রলোভনের ফাঁদে, আমার কৃত্রিম প্রেমের গভীর ফাঁদে পা রেখেছিল রীনা। তাই সে আজ জীবন থেকে তলিয়ে গেল। রীনার ভাবনা তাকে নিয়ে যায় অনেক পেছনে। করিমের পুরনো সংসার ভেঙে তার আসা আমার সংসারে। কিন্তু রীনার কপালে সুখ নেই। যেমন ছিল না করিমের সংসারে।
আকাশ, একটা রিকশা ডেকে দাও তো। অফিসের সময় হলো। রীনার কথায় আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে।
দরজার সামনেই তো রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। উঠে পড়লেই হয়। তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে রীনা রিকশায় ওঠে।
একদিন রীনাকে বললাম, আমি তো প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুদও খাই না। আর তুমি চাকরি করো ব্যাংকে অর্থাৎ সুদের কারবারীদের সাহায্য কর। এ হয় না। তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। তোমার যা প্রয়োজন আমিই দেবো। আমার এক বেলার টিউশনির টাকাই যথেষ্ট তোমার হাত খরচের জন্য।
ঠিক তো?
হ্যাঁ, আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের কোনো কিছু আমার জীবনে নেই। জীবনে আমি কারো সাথে বেঈমানি, মোনাফেকি করিনি। যেমন করিনি তোমাকে বিয়ে করে। আর কেউ হলে হয়ত এ সুযোগে প্রতিশোধ নিত।
আবার বিয়ের কথা?
হ্যাঁ, তাই। আমি কি তোমাকে লুকিয়ে বিয়ে করেছি? যা করেছি প্রকাশ্যে, গোপনে নয়। বিয়ে হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসন আর দেশের প্রচলিত নিয়মে। এসব ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
ফায়ার সার্ভিসের সামনেই আমার বাসা। বাঁশির শব্দে, গাড়ির আওয়াজ আর লোকের ছুটাছুটিতে একসময় আমার ঘুম ভেঙে যায়। হয়ত কোথাও আগুন লেগেছে। হয়ত কোনো অফিসে নতুবা কোনো দোকানে বা বাড়িতে। তাই দমকল বাহিনীর লোকদের এত দৌড়াদৌড়ি, ছুটাছুটি। এমন সময় রীনা এলো অফিস থেকে।
তুমি যে আজ তাড়াতাড়ি ফিরলে?
ওহ! ভালো লাগছে না তোমাকে ছেড়ে এতক্ষণ অফিসে থাকতে।
আজকাল দেখি আমার জন্য ভালোবাসা তোমার উথলে পড়ছে।
আকাশ, তুমি সব সময় খোঁচা মেরে কথা বল।
আচ্ছা রীনা, এই যে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ছোটাছুটি করছে, কেন বলত?
কেন আবার কি? আগুন নেভানোর জন্যই।
কার আগুন?
ঘরের।
কিন্তু তারা কি পারে, ঘরের মানুষের মনের আগুন নেভাতে? তারা কি পারবে আমার মনের আগুন নিভিয়ে দিতে?
তোমার মনে আবার আগুন লাগাল কে? প্রিয় ছাত্রী পারুল, না কি মল্লিকা? খুব তো বললে মনে আগুন ধরেছে, আগুন লেগেছে।
মন বলে তোমার কি কিছু আছে?
রীনা তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ? তুমি কি থামবে? মন ছাড়া কি মানুষ থাকে? অমানুষ যারা, তাদেরও তো মন থাকে। মানুষের মন তো অনেক পাওয়ারফুল-শক্তিশালী। একটু থেমে রাগ দমন করে বললাম, মানুষের মন পুড়লে কি হয়, জান?
না জানি না। শুধু তুমিই জান। দেশে তুমিই একমাত্র পণ্ডিত।
মন পুড়লে মন খাঁটি হয়, মন হয় বিশুদ্ধ। সোনা পুড়লে যা হয় তা।
ঘরে আগুন লাগার পর এক সময় মানুষের মন শান্ত হয়, গৃহদাহের যন্ত্রণাও থেমে যায়। আর মন পুড়লে মানুষ বিদ্রোহী হয়ে শক্তিশালী হয়। মার্কিনিদের সাথে যুদ্ধে ভিয়েতনামীদের ঘর পুড়েছিল; কিন্তু মন পোড়াতে গিয়ে তাদের বিদগ্ধ মন সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়েছিল। এতেই মার্কিনিদের পরাজয় ঘটেছিল। মানুষের মন এক প্রচণ্ড শক্তির উৎস যা আনবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী, যা পারমাণবিক বোমা দিয়েও ধ্বংস করা যায় না।
আজ তোমার কি হয়েছে যে আমাকে অহেতুক জ্ঞান দান করছ? আমি কি তোমার অনুগত ছাত্রী যা বলবে তাই শুনব, তাই মেনে নেবো।
এক সময় তুমি তাদের চেয়েও অনুগত ছিলে।
হ্যাঁ ছিলাম। এখন আর নেই।
আর তাই তো আমি জ্বলছি। তোমার বিদ্রোহের জ্বালায় জ্বলছি। জ্বলে পুড়ে ছাই হচ্ছি, ছারখার হচ্ছি। আমি জ্বলছি ঘরের আগুনে নয়, জ্বলছি ঘরের মানুষের মনের আগুনে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫