ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

রাজনীতি

নতুন করে দাম না বাড়াকেই সাফল্য হিসেবে দেখছে সরকার

চাল আমদানি বাড়লেও দাম কমেছে সামান্যই

জিয়াউল হক মিজান

১৮ জুলাই ২০১৭,মঙ্গলবার, ০৫:৪৮


প্রিন্ট

আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয়ার পর থেকে দেশে প্রতিদিনই প্রচুর পরিমাণে চাল আসছে। সীমান্তের স্থল বন্দরগুলোয় খালাস হচ্ছে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টন। সরকারিভাবে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা চালের প্রথম চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে গত বৃহস্পতিবার। ওই চালানে চাল এসেছে ২০ হাজার টন। আজ মঙ্গলবার আসবে দ্বিতীয় চালান। তৃতীয় চালান আসবে ২২ জুলাই। চাল আমদানি বৃদ্ধির প্রভাবে পাইকারি বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি চার থেকে পাঁচ টাকা কমেছে। খুচরাপর্যায়ে কমেছে দুই থেকে তিন টাকা। খুচরা বাজারে গতকাল মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫০ এবং সরু চাল ৫৬ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। কিন্তু ভোক্তারা এতে সন্তুষ্ট নন। তাদের দাবি, শুল্ক কমানোর সময় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, চালের দাম কেজিতে ছয় টাকা কমবে। যদিও এর মধ্যেই সাফল্য দেখছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। তাদের দাবি, আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে বাজারে চালের দাম কত টাকা কমল সেটা বড় কথা নয়। সবচেয়ে বড় লাভ, চালের দাম নতুন করে বাড়েনি।
খাদ্য অধিদফতর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সব মিলিয়ে আমদানি হয়েছিল এক লাখ ৩৩ হাজার টন চাল। আর চলতি অর্থবছরের ১৫ দিন না যেতেই আমদানি হয় বিদায়ী অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। আমদানি প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরো অন্তত ১৫ লাখ টন। স্বাভাবিক কারণেই চালের দাম আরো কমবে বলে আশা করছেন তারা। যদিও দুই মাস আগে আমদানি শুল্ক কমানো হলে চাল সিন্ডিকেট জনগণের পকেট থেকে যে দুই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তা সম্ভব হতো না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 
সন্তোষজনক বাড়তি মজুদ থাকায় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চালের শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করেছিল সরকার। এর সাথে রেগুলেটরি ডিউটি তিন শতাংশ যোগ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ২৮ শতাংশ শুল্ক গুনতে হতো। ফলে গত দেড় বছর ধরে বেসরকারিপর্যায়েও চাল আমদানি প্রায় বন্ধ ছিল। কিন্তু চালের মজুদ কমতে কমতে দেড় লাখ টনে চলে আসায় এবং দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় আমদানি শুল্ক কমাতে বাধ্য হয় সরকার। রমজানের শেষ ভাগে এসে আমদানি বাড়াতে বিদ্যমান শুল্কহার ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকার। তফসিলি ব্যাংকগুলোকে বিনা বিনিয়োগে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার অনুমতি দেয়ার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ দিকে শুল্ক কমানোর ফলে চালের দাম কেজিতে ছয় টাকা কমবে বলে জানিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, চাল আমদানির পর ১৮ শতাংশ শুল্ক তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে কেজিপ্রতি চালের দাম কমবে কমপে ছয় টাকা। দেশে চালের কোনো সঙ্কট নেই দাবি করে তিনি বলেন, কিন্তু মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারিপর্যায়েও চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করা যায় বাজার দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কৃষকের নায্যমূল্য নিশ্চিতের জন্যই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কিন্তু হাওর অঞ্চলে বন্যায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। আমাদের শুল্ক আগেই কমানো উচিত ছিল। টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, সব ধরনের চালের দাম এক মাসে ৪ থেকে ৮ শতাংশ এবং এক বছরে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
এ দিকে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে গত চার মাস ধরেই খাদ্যমন্ত্রী কারুল ইসলাম প্রায় প্রতিদিনই দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে বললেও চালের আমদানি শুল্ক কমাতে এনবিআরকে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন তিন মাস আগে। এ সময়ের মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় অনেক পানি গড়ালেও অজ্ঞাত কারণে এনবিআর ছিল ঠায় দাঁড়িয়ে। অবশেষে আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও তত দিনে জনগণের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজশের কারণেই চালের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তটি অনেক বিলম্বে এসেছে। আর সিদ্ধান্তটি যখন এসেছে তত দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় শুল্ক কমিয়েও এ থেকে কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি হিসাবে চলতি বছর ধানে ব্লাস্ট রোগ এবং হাওরে আগাম বন্যায় চালের উৎপাদন ১২ লাখ টন কম হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে উৎপাদন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টন। গত বছরগুলোয় বিদেশ থেকে বেসরকারিপর্যায়ে গড়ে চাল আমদানি করা হতো ১৫ লাখ টন করে। অথচ গত এক বছরে আমদানি হয়েছে মাত্র এক লাখ ২৮ হাজার টন। সরকারি গুদামে চালের মজুদ তলানিতে নেমে এসেছে। সারা বছর যেখানে গড়ে ১০ লাখ টন খাদ্য মজুদ থাকার কথা সেখানে আছে মাত্র এক লাখ ৯১ হাজার টন। কিন্তু আমদানিকারকদের তীব্র চাপের মুখেও আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার বা কমিয়ে আনার বিষয়টি গত দুই মাস ধরে এনবিআর এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। প্রতি কেজি মোটা চালের দাম বেড়ে যায় ১৫ টাকা। ১০ থেকে ১২ টাকা বাড়ে সরু চালের দাম।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় গেলে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পায় হয় বর্তমান সরকার। ক্ষমতায় গিয়ে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু গরিবের ওই চাল ক্ষমতাসীন দলের ধনী নেতাকর্মীদের বাড়িতে যাওয়া ঠেকাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটিই ভেস্তে যায়। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কৃতিত্ব ঘরে তুলতে গিয়ে আরেক দফা হোঁচট খায় সরকার। দেশের মোট জনসংখ্যা যে পরিংখ্যান দেয়া হয় তার সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না বেসরকারি গবেষকরা। আবার চালের উৎপাদন বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা থেকেও সরকার বেরিয়ে আসতে পারছে না। ১৫ লাখ টন খাদ্য আমদানির বছরও কিছু চাল রফতানি করে বাহাবা নিতে চায় সরকার। এভাবেই মূলত দানা বেঁধে ওঠে চালসঙ্কট।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫