ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

মতামত

আফগান যুদ্ধের বিভীষিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি

ইকবাল কবীর মোহন

১৭ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৯:১৩ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৭,মঙ্গলবার, ১০:২০


প্রিন্ট
বিভীষিকাময় আফগান পরিস্থিতি

বিভীষিকাময় আফগান পরিস্থিতি

পৃথিবীর ছাদ পামির। আর পামিরের দক্ষিণ পাদদেশে সাদা বরফের টুপিপরা দেশ আফগানিস্তান। অসংখ্য পর্বতশৃঙ্গ শোভিত উপত্যকার দেশ এটি। আফগানিস্তানের উত্তর সীমান্তে হিন্দুকুশ পর্বতমালা, পূর্বে কোয়াক গিরিপথ থেকে পশ্চিমে দন্দান শিকান গিরিপথ পর্যন্ত কয়েক শ’ মাইল দীর্ঘ। এই পর্বতমালার নানা স্থানে রয়েছে ১১টি গিরিপথ। স্মরণাতীতকাল থেকে এই গিরিপথগুলোই উত্তর ও পশ্চিম থেকে দক্ষিণ ও পূর্বে এবং দক্ষিণ ও পূর্ব থেকে উত্তর ও পশ্চিমে যাতায়াতের সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই পথগুলোই ছিল দেশটিতে রাজনৈতিক অভিযানের মাধ্যম। এখান দিয়েই আলেকজান্ডার দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন। এই পথ ধরে মুসলিম সেনাপতি কুতাইবার অধীনে মুজাহিদরা উত্তরে অভিযান পরিচালনা করেছেন। ত্রয়োদশ শতকে চেঙ্গিস খান এই পথ ধরে ধ্বংসের বিষাণ বাজিয়ে মুসলিম মধ্য এশিয়া মিসমার করে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় হানা দিয়েছিলেন। তারপর এ পথেই চতুর্দশ শতকে তৈমুর লং, ষোড়শ শতকের শুরুতে বাবর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেছেন। সুতরাং উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমের দরোজা হিসেবে আফগানিস্তান সব সময়ই সমরকুশলীদের কাছে অপরিসীম গুরুত্ব লাভ করেছে এবং এর নিয়ন্ত্রণের জন্য সাম্্রাজ্যবাদীরা লালায়িত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন তারই ধারাবাহিকতা। রুশ আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে নানা রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই, সঙ্ঘাত ও রক্তপাত সংঘটিত হয়েছে। এর ফলে আফগানিস্তান পরাশক্তি আমেরিকা ও বিরোধী পক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তির লড়াইয়ের লীলাভূমিতে পরিণত হয়। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর থেকে দেশটিতে শুরু হয় আমেরিকার আগ্রাসন। এরই প্রেক্ষাপটে বীর আফগান জাতি আমেরিকা ও এর দোসর আফগান সরকারের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, সঙ্ঘাত ও রক্তপাতের ষোল বছরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশটি। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আফগানিস্তান অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। আগ্রাসী শক্তিরও কম ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এরই মধ্যে আমেরিকা ও তার দোসরদের ৩,০০০ সেনা প্রাণ হারিয়েছে এবং আফগান সামরিক ও বেসামরিক লোক মারা গেছে অগণিত। সরকারিভাবে এক লাখ ৫০ হাজার আফগানের মৃত্যুর খবর বলা হলেও এই সংখ্যা তার কয়েকগুণ বেশি হবে। আফগানিস্তানে জাতিসঙ্ঘ সহায়তা মিশনের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতি বছর দেশটিতে নারী ও শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। তাদের মতে, দেশটিতে প্রাণহানি ১০ লাখের অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। এই মিশনের হিসাব মতে, সঙ্ঘাত ও হানাহানির কারণে ২০১৬ সালেই দেশটি থেকে পালিয়ে গেছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। ২০০৮ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ উদ্বাস্তু সংখ্যা। আফগানিস্তানের তিন কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ লোক দেশটি থেকে সরে গেছে বলে জানা গেছে। এ পর্যন্ত উদ্বাস্তু হয়েছে ৩০ লাখ মানুষ। এ বছরের বিগত পাঁচ মাসে আরো ৯০ হাজার মানুষ দেশ থেকে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।


আফগান সরকার ও আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াইরত তালেবানরা আরো শক্তিশালী আক্রমণ রচনা করছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত ২১ এপ্রিল তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশ বালকায় দেশটির ন্যাশনাল আর্মির ওপর এক ভয়ানক আক্রমণ চালায়। এতে ১৪০ জন সেনার প্রাণহানি হয়। এর এক সপ্তাহ আগে আমেরিকা আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের আসাদখেল গ্রামে ৯,৭৯৮ কেজি ওজনের (যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোমা) একটি নন-নিউক্লিয়ার রোমা ফেলেছিল। এর ফলে সেখানে ৯৪ জন ‘ইসলামি যোদ্ধা’ প্রাণ হারায় বলে আমেরিকা দাবি করেছে। আমেরিকা যে এলাকায় বোমা বর্ষণ করে সেখানে কোনো সাংবাদিকের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। মনে করা হয়, এই বোমা বর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় তালেবানরা এক সপ্তাহ পরই ভয়ানক আক্রমণ চালায়। কারো কারো মতে, তালেবানরা এখনো আফগানিস্তানের ৪০ ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে বড় অংশ হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ হেলমান্দ, দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ কান্দাহার, জাবুল ও উরুজান। ধারণা করা হচ্ছে, শিগগিরই তালেবানরা দক্ষিণ আফগানে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। উল্লেখ্য, এই এলাকার সাথে পাকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত সংযোগ রয়েছে। আফগানিস্তানে আমেরিকা ও তার পশ্চিমা সহযোগী এবং আফগান সরকারের ১৬ বছরের অব্যাহত আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞের পরও তালেবানদের এই সফলতা দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে চরম ব্যর্থতা বলে মনে করা হচ্ছে।


মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্সের ডিরেক্টর ড্যান কোটস সম্প্রতি সিনেটে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘পদক্ষেপ যা-ই নেয়া হোক না কেন, ২০১৮ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাবে।’ তার অর্থ, দেশটির আশরাফ ঘানি সরকার এবং জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে আফগানিস্তানে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে না। তালেবানরা একটার পর একটা প্রদেশে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলছে। আর আমেরিকানরা পেরে উঠছে না। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার আফগান ফ্রন্ট প্রধান জেনারেল জন নিকলসন আফগানিস্তানে আরো সৈন্য বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন। এর ফলে শিগগিরই ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ অতিরিক্ত মার্কিন ও ন্যাটো সেনা আফগানিস্তানে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে। এই ঘোষণা এমন একসময়ে এলো যখন বিগত ২৫ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোবাহিনীর উদ্দেশে বক্তব্য দিলেন। তখন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল ট্রাম্পকে বলেন, তিনিও আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা পাঠাতে প্রস্তুত আছেন। ন্যাটো নীতিগতভাবে ২০১৪ সালে আফগানিস্তানে তাদের মিশন স্থগিত ঘোষণা করেছিল। আমেরিকা ছাড়া ন্যাটোর বাকি সদস্যরা আফগানিস্তানে তাদের উপস্থিতি মানতে নারাজ। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে আফগানিস্তানে তাদের সফলতা নিয়ে সন্তুষ্ট নন। তারা নিজ নিজ দেশে নির্বাচনে লড়েছেন। তারা ভালো করেই জানেন আফগান ইস্যু তাদের দেশে জনপ্রিয় কোনো বিষয় নয়।


যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প ও হিলারিÑ এদের কেউ নির্বাচনে আফগান যুদ্ধ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি। উল্লেখ্য, প্রতি বছর আফগানিস্তানে মার্কিনিদের যুদ্ধের জন্য ব্যয় হয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার। তার অতিরিক্ত আরো ১১৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে দেশটির পুনর্গঠন কার্যক্রমের জন্য। এই অর্থের ৬১ শতাংশই ব্যয় করা হয় আফগান ন্যাশনাল আর্মির জন্য। ২০১০ সালে আফগান সেনাবাহিনীর এক লাখ সদস্য দিয়ে তালেবানদের প্রতিরোধ এবং নিঃশেষ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে মার্কিন সরকার। তবে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে ২০১৪ সালে ওই ধরনের পদক্ষেপ বাতিল করা হয়। বিভিন্ন পক্ষের এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পরও আফগান ইস্যুতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে কেউ যেন তেমন উৎসাহী নয়।


আফগানিস্তানে মার্কিন স্বার্থ এতটাই অরক্ষিত যে, সম্প্রতি দেশটির সরকার পুরনো শত্রু (তাদের বিবেচনায়) গুলবদ্দিন হেকমতিয়ারকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছে। হিজবে ইসলামির এই নেতা ১৯৯২ ও ১৯৯৬ সালের মধ্যকার সময়ে কাবুল অধিকার করে রাখেন। প্রতিপক্ষ তাকে ‘কাবুলের কসাই’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। যাকে কাবুলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের হোতা মনে করা হতো এখন তিনি কাবুলের রাজনৈতিক মঞ্চে অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিগত ২১ মে গুলবদ্দিন হেকমতিয়ার আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে দেশের ক্রমবর্ধমান নাগরিক হত্যার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, কারজাই তার মেয়াদের শেষ দিকে আফগানিস্তানে আমেরিকার যুদ্ধ কৌশল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। তিনি নাগরিকদের ওপর নৈশকালীন মার্কিন আক্রমণের বিরোধিতা এবং ‘মোয়াব’ (মাদার অব অল বমবস) ব্যবহারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের বোমা ব্যবহার দেশের নিরপরাধ জনগণের বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। এটা শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, আমাদের পরিবেশ, গাছপালা-উদ্ভিদ, পানি এবং মাটির জন্য বিষাক্ত উপাদানের বিস্তার ঘটাচ্ছে।’ এরই প্রেক্ষাপটে কারজাই ও হেকমতিয়ারের মধ্যকার বৈঠক দেশটিতে নতুন ধারার মার্কিনবিরোধী মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে।


হোয়াইট হাউজ থেকে আফগানিস্তানে সৈন্যসংখ্যা বুদ্ধির যে কথা বলা হয়েছে ট্রাম্পের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার এইচ আর মেকমাস্টার তার স্বীকৃতি দেননি। বরং তিনি বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত এখনো নেয়া হয়নি। মেকমাস্টার জানেন, আফগানিস্তানে সেনা বৃদ্ধির পরও কোনো ফল পাওয়া না গেলে, তা তার নিজের ব্যর্থতা বলে ধরে নেয়া হবে। আর যদি কোনো সফলতা আসে তা হলে তার সব কৃতিত্ব যাবে ট্রাম্পের পকেটে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আফগানিস্তানে আরো ৫,০০০ সেনা বাড়ানো হলে তালেবান আরো আগ্রাসী হয়ে উঠবে এবং নিঃসন্দেহে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাবে। অন্য দিকে, আফগানিস্তানের ন্যাশনাল সিকিউরিটির ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে এবং তার ফলে তালেবানদের প্রতি সহানুভূতি বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ২০ বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবানরা যে নির্মম রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছিল তার ফলে জনগণ তাদের প্রতি ছিল রুষ্ট। আর বর্তমানে তার উল্টো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের জনগণের বড় অংশ তাদের প্রিয় মাতৃভূমির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য আবার তালেবানদের ওপর আস্থা রাখতে চাইছে। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে অন্তত এই রিপোর্টই বেরিয়ে এসেছে। তালেবানরা যদি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে তা হলে এটি হবে পরাশক্তি আমেরিকার বড় ধরনের বিপর্যয়। এই অবস্থা আমেরিকার কোনো সরকারই মেনে নেবে না। আফগানিস্তানের ধ্বংসের বিনিময়ে হলেও তারা এই পরিস্থিতি প্রতিরোধ করবে। দেখা যাক কোনো দিকে যায় আফগান পরিস্থিতি। তবে বিশ^বাসী স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আফগান রাষ্ট্রের স্বপ্নই দেখে আসছে।

লেখক : সিনিয়র ব্যাংকার
e-mail : ikmohon@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫