ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

আসামির স্বীকারোক্তির আইনগত ভিত্তি

সিরাজ প্রামাণিক

১৬ জুলাই ২০১৭,রবিবার, ১৯:২৮


প্রিন্ট

একটি দেশে, একটি সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনগোষ্ঠীর আইন সম্পর্কে সচেতনতা। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার অপপ্রয়োগ নিয়ে এ লেখা।
দোষ স্বীকারোক্তি বলতে অপরাধী স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করাকে বোঝায়। দেশে প্রচলিত কোনো আইন দিয়ে যে কর্মকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, এরূপ অপরাধ সংঘটনের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে অপরাধ সংঘটন সম্পর্কে বিনা প্ররোচনায়, কোনোরূপ প্রলোভন ছাড়া নির্ভয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বেচ্ছায় সত্য বক্তব্য পেশ করে তাকে স্বীকারোক্তি বলে।
স্বীকারোক্তি লিখে রাখার সময় ম্যাজিস্ট্রেটকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে, এটা স্বেচ্ছামূলক। শুধু অপরাধীর বক্তব্যই নয়, বরং তার আচরণের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। দোষ স্বীকারোক্তি লেখার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা, ৩৬৪ ধারা, সাক্ষ্য আইনের ২৪ থেকে ৩০ ধারা ও হাইকোর্ট জেনারেল রুলস অ্যান্ড সার্কুলার অর্ডারসের (ক্রিমিনাল) ২৩ ও ২৪ নম্বর রুলস প্রযোজ্য। এ বিধানগুলোর মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায়ই দোষ স্বীকারোক্তি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ আছে। স্বীকারোক্তি লেখার শেষে স্বীকারোক্তির নিচে তিনি একটি প্রত্যয়নপত্র দেবেন।
‘আমি (নাম) এর নিকট ব্যাখ্যা করেছি যে, তিনি স্বীকারোক্তি করতে বাধ্য নন এবং যদি তিনি স্বীকারোক্তি করেন, তাহলে উক্ত স্বীকারোক্তি তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং আমি বিশ্বাস করি যে, এ স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছা প্রণোদিতভাবে দেয়া হয়েছে। এ স্বীকারোক্তি আমার উপস্থিতিতে এবং আমার শ্রুতি গোচরে গৃহীত হয়েছে। এটা স্বীকারোক্তি প্রদানকারী ব্যক্তিকে পড়ে শোনানো হয়েছে এবং তিনি তা সঠিক বলে স্বীকার করেছেন এবং এ লিখিত স্বীকারোক্তিতে তার প্রদত্ত বিবৃতির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বিবরণ রয়েছে।’
আসামির স্বীকারোক্তি রেকর্ডের ক্ষেত্রে তার শপথ নেয়ার কোনো আইনগত বিধান নেই। কোনো অপরাধজনক ঘটনার পুলিশি তদন্ত চলাকালে ঘটনার সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেফতার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তির জন্য নিয়ে এলে বা ওই ঘটনার সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এলে ম্যাজিস্ট্রেট প্রথমে ওই ব্যক্তিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে জানবেন ওই ব্যক্তি স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য ইচ্ছুক কি না। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে- কখন, কোথায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং কোথা থেকে সে পুলিশের হেফাজতে আছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যদি ম্যাজিস্ট্রেট মনে করেন ওই ব্যক্তি স্বীকারোক্তি দিতে আগ্রহী, তাহলে তাকে এ বিষয়ে চিন্তাভাবনার জন্য যুক্তিযুক্ত সময় দিবেন। সাধারণত ন্যূনতম তিন ঘণ্টা সময় দেয়ার বিধান রয়েছে। এ সময় ওই ব্যক্তি পুরোপুরি ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবেন। এ সময় ওই ব্যক্তিকে পুলিশের সাথে বা অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে আলাপ বা পরামর্শ করার সুযোগ দেয়া যাবে না এবং এ সময় তিনি যাতে কারো মাধ্যমে কোনোভাবেই প্রভাবিত না হতে পারেন, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যুক্তিযুক্ত সময় শেষে ওই ব্যক্তি যে স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে বিবেকের তাড়নায় পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হয়েও স্বীকারোক্তি করছেন, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন করবেন এবং তার উত্তর লিখে রাখবেন।
এরপর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৪ ধারা অনুসরণে ওই ব্যক্তির স্বীকারোক্তি লিখে তা তাকে পড়ে শোনাবেন। পড়ে শোনানোর পর ওই ব্যক্তি তা সঠিকভাবে লেখা হয়েছে বলে স্বীকার করলে তাতে তার স্বাক্ষর নেবেন এবং ১৬৪ ধারার বিধান মতে প্রত্যয়নপত্র দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট তাতে স্বাক্ষর করবেন। লিখিত স্বীকারোক্তি পড়ে শোনানোর পর যদি স্বীকারোক্তিদাতা ব্যক্তি তাতে কোনো সংশোধনের কথা বলেন, তবে তা সেভাবে সংশোধন করতে হবে।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী কোনো পুলিশের সামনে রেকর্ড করা যাবে না, এটা অবশ্যই শুধু ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এবং তার তত্ত্বাবধানে রেকর্ড হবে, এমনকি এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করার সময় সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষেও কোনো পুলিশ উপস্থিত থাকতে পারবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ (৩) ধারা মোতাবেক, সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করার আগে তিনি অবশ্যই জবানবন্দিদাতাকে এটি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করবেন, এই জবানবন্দী দিতে তিনি কোনোভাবে বাধ্য নন এবং তাকে এ-ও স্পষ্ট করে বলতে হবে, যদি এ ধরনের কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন, তাহলে এটা তার বিরুদ্ধেও ব্যবহার হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দিদাতাকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে এই মর্মে সন্তুষ্ট হবেন, এই জবানবন্দিদাতা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং কোনো ধরনের প্রভাবিত না হয়ে এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।
স্বীকারোক্তির শেষে সব কিছু উল্লেখ করবেন, অর্থাৎ আইন দিয়ে আরোপিত দায়িত্বগুলো তিনি কিভাবে পালন করেছেন এবং তিনি কিভাবে আশ্বস্ত হয়েছেন যে, এই জবানবন্দী স্বেচ্ছা প্রণোদিতভাবে দেয়া হয়েছে এবং তিনি জবানবন্দী দেয়ার ফলাফল সম্পর্কে ব্যক্তিটিকে অবহিত করেছেন কি না ইত্যাদি উল্লেখ করে একটি মেমোরেন্ডাম লিখবেন, যেটা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর একেবারে শেষে থাকবে এবং ওই মেমোরেন্ডামের নিচে তিনি স্বাক্ষর করবেন।
আইনের বিধি-বিধানগুলো পালন করার পর কেউ যদি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন, তখন তা আইনের দৃষ্টিতে সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী প্রমাণ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য হবে, অন্যথায় নয়। সুতরাং পুলিশি হেফাজতের তোড়ে কোনো আসামি যেসব স্বীকারোক্তি দেয় সেগুলোর আইনগত ভিত্তি নেই। আদালতে সেগুলো সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে এ ধরনের স্বীকারোক্তির অর্থ কী? পুলিশ হেফাজতে প্রায়ই মানুষ মরছে। মৃত্যুগুলোর খবর নিশ্চয়ই প্রজা থেকে রাজারা জানছেন।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
seraj.pramanik@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫