ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

নারী

বাঁশের তৈরী পণ্যই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন

১৬ জুলাই ২০১৭,রবিবার, ১৮:৪৩


প্রিন্ট

বাঁশ দিয়ে তৈরী পণ্য একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। মিরেরসরাইয়ে এ শিল্পের সাথে জড়িত আছে অনেক নারীর জীবন-জীবিকা। কিন্তু এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা। এসব নিয়ে লিখেছেন এম মাঈন উদ্দিন

মিরসরাই উপজেলার পূর্ব মায়ানী এলাকার গৃহবধূ সালেহা বেগম। পরিবারের সাত সদস্যদের সংসার নিয়ে অনেক কষ্টে ছিলেন। স্বামী ওবায়দুল হক অন্যের কাজ করে যা আয় করে তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তার মধ্যে তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ। সংসার নিয়ে অনেকটা হাফিয়ে উঠেছে এই দম্পতি। তিন বছর আগে একই গ্রামের গোলাম রসুলের স্ত্রী হনুফা বেগমের পরামর্শে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সামগ্রী তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতে থাকেন। বাজার থেকে বাঁশ ক্রয় করে তা দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে থাকেন। এখন মোটামুটি ভালো চলছে তাদের সংসার। স্বামীর পাশাপাশি সালেহাও পরিবারের জন্য সহযোগিতা করছেন। সালেহাকে এই কাজে সহযোগিতা করেন তার বড় মেয়ে রাবেয়া।
১০ বছর আগে উত্তর ওয়াহেদপুর এলাকার হাবাধন বিবির স্বামী রফিক উদ্দিন দুই মেয়ে এক ছেলে রেখে অন্যত্র বিয়ে করেছেন। স্ত্রী-সন্তানদের কোনো খোঁজ খবর রাখে না। তিন সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন? কার কাছে যাবেন? চিন্তায় শেষ নেই তার। পরে বাঁশের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে তা বাজারে বিক্রি করে তা দিয়ে সংসার চলে যায়। তার উপর দুই সন্তানের পড়াশোনাও চলছে।
হারাধন বিবি জানান, এলাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঁশ ক্রয় করে তা দিয়ে ডালা, কুলা, চালনি, পানডালা, মাছ ধরার ঝুড়ি, চাটাই, খেলনা, কলমদানি, ফুলদানি, বাঁশি কিংবা গৃহসজ্জার বাহারি পণ্য বিক্রি করে সংসার চলে তার। এগুলো বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে যাচ্ছে।
শুধু সালেহা কিংবা হাবাধন নয়, এভাবে বাঁশের সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে মিরসরাই উপজেলার প্রায় দুই সহস্রাধিক নারী। তবে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড়। আদৌ এই পেশা কত দিন টিকে থাকবে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
জানা গেছে, উপজেলার মিঠাছড়া, আবুতোরাব, আবুরহাট, শান্তিরহাট, কমরআলী, বড়দারোগাহাট, জোরারগঞ্জ বাজারের মতো প্রাচীন হাটগুলোতে এখনো প্রত্যক্ষ করা যায় কিছু মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপকরণ আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বাঁশ। বাঁশ দিয়ে তৈরি স্থানীয় ভাষায় ডালা, কুলা, চালনি, পানডালা, মাছ ধরার ঝুড়ি, চাটাই, খেলনা, কলমদানি, ফুলদানি, বাঁশি কিংবা গৃহসজ্জার বাহারি পণ্য বিক্রি করে সংসার চলে তাদের।
বড় দারোগাহাট বাজারে বাঁশের টুকরি খাঁচি বিক্রেতা আনিছ মিয়া বলেন, আমার স্ত্রী এগুলো তৈরি করে। আমি তাকে সাহায্য করে থাকি। আমি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার বড় দারোগাহাট বাজারে এসব বিক্রি করি।
চাটাই বিক্রেতা ফজলুল করিম ফুলসাব বলেন, কৃষকের বাড়ি থেকে কিনলে প্রতি বাঁশে খরচ পড়ে ১০০-১৫০ টাকা। কাঁচা বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করতে হয়। বাড়ির অন্য সদস্যরা এ কাজের সাথে যুক্ত থাকায় বাড়তি শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। একটি বাঁশ দিয়ে প্রায় ৬০০ টাকার পণ্য তৈরি করা যায়। মাসে গড়ে ২০-৩০টি বাঁশ কাজে লাগিয়ে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় সম্ভব। তবে বাইরে থেকে বাঁশ কিনলে বাঁশ কেনায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লেগে যায়। দিনে দিনে বাঁশের বাগান কমে যাওয়ায় দাম ও বাড়ছে, তাই বাঁশপণ্যের দামও অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলার মিঠাছড়া, আবুরহাট ও আবুতোরাব হাটে বাঁশের তৈরী পণ্য বিক্রি হয় বেশি। সে দিন আবুতোরাব বাজারে নিতাইচন্দ্র দাস আসেন নানান পণ্য বিক্রি করতে। প্রতি সপ্তাহে পণ্য বিক্রি হয় দেড় হাজার টাকার। লাভ থাকে এক হাজার টাকার মতো।
আমবাড়িয়া গ্রামের হাজেরা আক্তার বাঁশ দিয়ে মোড়া তৈরি করে সংসার চালান। মোড়া বিক্রি থেকে প্রতি মাসে আয় হয় প্রায় চার হাজার টাকা। স্বামী সিরাজ মিয়াও এ কাজে সহযোগিতা করেন। বাঁশ কিনে আনেন তিনি। জানালেন, মোড়া তৈরির কৌশল। বাঁশ চিড়ে ১০-১২ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর শলা তৈরি করা হয়। শলার সুতলি প্লাস্টিক ও রিকশার অব্যবহৃত টায়ার দিয়ে তৈরি হয় ছোট, মাঝারি ও বড় এই তিন ধরনের মোড়া। ছোট মোড়া ৮০, মাঝারি ১২০ ও বড়টি ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিটি মোড়া বিক্রি করলে লাভ থাকে ৫০-৭০ টাকা।
এলাকার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বাইরা, নলি ও মুলি এ তিন ধরনের বাঁশ পাওয়া যায়। বাইরা দিয়েই বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে সুবিধা বেশি। ডালা, কুলা, পালি, পানডালা ও মাছ ধরার ঝুড়ি বাইরাতেই সুবিধা। প্রতিটি ডালা ৪০, খাঁচা ৬০, ঝুড়ি ১০০ ও পানডালা ৪০ টাকায় বিক্রি করেন বিক্রেতারা। কুলা ও পালির চাহিদা থাকে বারো মাস। প্রতিটি কুলা ৯০ ও পালি ৪০ টাকায় বিক্রি করা হয়।
করেরহাট ইউনিয়নের ছত্তরুয়া গ্রামের শেফালী আক্তার বলেন, এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র শিল্প। এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাঁশের তৈরী বিভিন্ন পণ্যের শোরুম নির্মাণের পাশাপাশি প্রতি বছর এসব নিয়ে মেলার আয়োজনও করা যেতে পারে। এতে গ্রামাঞ্চলে বেকারের সংখ্যা কমবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫