ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

গরিবের ঘোড়া রোগ!

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

১৫ জুলাই ২০১৭,শনিবার, ১৭:০৪


প্রিন্ট

স্কুল থেকে ফিরে ঝুমু সোজা রান্না ঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ে। বারবার নাক টেনে গন্ধ শুঁকার চেষ্টা করছে। সারা রান্নাঘর তন্ন তন্ন করে কোথাও সে গোশতের টিকিটির নাগাল পায় না। অথচ সকাল বেলায় ঝুমুর বাবা বলেছে, আজ গোশত রান্না হবে। গরুর গোশত। পাত পেড়ে বাপ-মেয়ের ধুমসে খাওয়া-দাওয়া হবে। কত দিন পর আজ গোশত রান্না হচ্ছে। স্কুলের বন্ধুদের আজ ঝুমু বলেছে, বাসায় ফিরে গোশত দিয়ে পেট পুরে ভাত খাবে। গরুর গোশত- আহ! কত দিন খাওয়া হয় না। জিবে জল এসে যায়। খাওয়ার লোভে ঝুমু ক্লাসে পর্যন্ত ঠিক মতো মন বসাতে পারেনি। কখন স্কুল ছুটি হবে, কখন বাড়ি যাবে। বাড়ি আসার পথে টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ঝুমু একখানা লেবু কিনতেও ভুল করেনি। গরম গরম ভাত আর গোশতের সাথে লেবু না হলে চলে? বড় লোকেরা এভাবেই খায়। সাথে দইও খায়। এক হালি লেবু কিনতে চেয়েছিল ঝুমু; কিন্তু দোকানি দাম চাইলো বিশ টাকা! আপাতত একটা কিনে ঝুমুকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো। নিজের শিশুসুলভ বুদ্ধি খাটিয়ে স্কুলের সহপাঠী থেকে দু’খানা টিস্যুও জমিয়ে রাখে। গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে বাপ-মেয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছবে। কিন্তু সব রান্নাঘর উল্টেপাল্টে নিরাশ বদনে ঝুমু ঘরে গিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়। ভরদুপুরে না খেয়ে আজো মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়ে। ঝুমুর অসহায় মা মেয়ের সব কিছু দেখেও চুপটি করে থাকেন। শরমে মুখ লুকায়। শূন্যে উদাস নেত্রে ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে।

২.
বৃদ্ধ জমির মিঞা গরিব রিকশাচালক। বয়স পঞ্চাশোর্ধ্ব। ঝুমুর অসহায় বাবা। শরীরে আগের মতো শক্তি-সামর্থ্য নেই। দুর্বল বলে কেউ রিকশায় ওঠতে চায় না। তা ছাড়া আজকাল রিকশাগুলোও প্রযুক্তিনির্ভর। মোটরচালিত হয়ে গেছে। চোখের পলকে উল্কার গতিতে শাঁ শাঁ বেগে ছুটে চলে। তার জীর্ণশীর্ণ পায়েচালিত প্যাডেল মার্কা রিকশায় কে বা ওঠতে চায়। ছোট্ট মেয়ে ঝুমুটাকে আজ কথা দিয়েছে, স্কুল ফেরত গোশত-ভাত খাওয়াবে। যদিও গত তিন মাস থেকে মেয়েকে এমন মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে আসছে। প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দিনশেষে কথা রাখতে পারে না। যন্ত্রণায় ভুগতে হয়। নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরোয় তাদের আবার গোশত! অক্ষমতার জন্য নিজেকে নিজে ধিক্কার দেয় জমির মিঞা। মাত্র তিন ক্লাস পড়ুয়া এইটুকুন একটা একরত্তি মেয়েকে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারে না। গরিব বলে আজকাল কেউ দাওয়াতও দিতে চায় না। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে এক কেজি গোশত পাঁচ শ’ টাকা!! চোখের সামনে ঝুমুর অসহায় বাবা নিজের ডান হাতের পাঁচখানা আঙুল টান টান করে মেলে ধরে। এত্তগুলো টাকা! ভাবতে ভাবতে জমির মিঞার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। দাঁতের চোয়ালগুলো ক্রমে খিঁচ মেরে শক্ত হয়ে আসে।

৩.
এই বয়সে বৃদ্ধ জমির মিঞাকে চোরের মতো ঘরে ঢুকতে হয়। জানে এতক্ষণে নিশ্চয়ই মেয়েটার কাঁদতে কাঁদতে ঘুম এসে গেছে। তাই শুকনো লংকা হোক আর যাই হোক এক্ষুনি তাড়াতাড়ি গপাগপ দু’মুটো খেয়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। কোনো অবস্থাতে মেয়ের সামনে পড়া যাবে না। যদিও সারা দিনের অক্লান্ত ঘর্মাক্ত কষ্টের পর ক্লান্ত- শ্রান্ত দেহটাকে দুপুরের কিছু সময় বিছানায় এলিয়ে দিতে পারলে ভালো হতো। দেহ মনে একটু প্রশান্তি লাগত। মেয়ের কাছে পাছে ধরা পড়ার ভয়ে এইটুকু সুখও জমির মিঞাকে বিসর্জন দিতে হচ্ছে। বেরিয়ে যাওয়ার আগে দরজার ফাঁক গলে মেয়ের নিষ্পাপ কচিপানা মুখখানা দেখতে গিয়ে, জমির মিঞার চোখ স্থির হয়ে যায় মেয়ের হাতে রাখা ছোট্ট লেবুটার দিকে তাকিয়ে। মুহূর্তে হাহাকার করে ওঠে হৃদয়। নিজের অক্ষমতার জন্য বারবার নিজেকে নিজে অভিসম্পাত করে। জামার আস্তিনে চোখ মুছতে মুছতে বৃদ্ধ জমির মিঞা রিকশার প্যাডেলে আস্তে করে চাপ দেয়। তখন রিকশা থেকেও তার গোটা দেহটাকে ভীষণ ভারী ভারী মনে হয়। গোটা দেহখানা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে চায়। সামনের দিকে দেহমন কোনোটিই এগোতে চায় না।

ছোট শরীফপুর, কুমিল্লা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫