ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

রাজনীতিতে ‘তৃতীয় শক্তি’

তানভীর আহমেদ

১৪ জুলাই ২০১৭,শুক্রবার, ২০:২৩


প্রিন্ট

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘তৃতীয় শক্তি’ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে। সম্প্রতি জেএসডির পক্ষ থেকে একটি পোস্টার ছাপানো হয়। পোস্টারে মূল বক্তব্য হলো রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান চাই। ঢাকাসহ সারা দেশে পোস্টারটি লাগানো হয়।
পৃথিবীর সব দেশেই রাজনীতিতে প্রথম শক্তি আছে। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শক্তি আছে। বাংলাদেশেও রাজনীতিতে দলীয় সমর্থন শক্তি-সামর্থ্য, সর্বোপরি নির্বাচনী পরিসংখ্যানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতকে যথাক্রমে প্রথম শক্তি দ্বিতীয় শক্তি, তৃতীয় শক্তি ও চতুর্থ শক্তি মনে করা হয়।
২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির কথা দীর্ঘ দিন ধরে প্রচার হতে থাকে। বিশেষ করে রাজনীতির ওয়ান ইলেভেন পর্বে। প্রধান দুই নেত্রীকে মাইনাস করে মাইনাস টু ফর্মুলা দিয়ে রাজনীতিতে সংস্কারের কথা বলা হয়। প্রচলিত দুই দলীয় রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ আসে। তাই রাজনীতির ‘গুণগত পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে’ তৃতীয় শক্তির উত্থানের কথা বলা হতে থাকে। ওয়ান ইলেভেনের পর্ব ব্যর্থ হওয়ার পর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের প্রাককালে জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, গণফোরাম, বিকল্পধারা মিলে তৃতীয় শক্তি বা থার্ডফ্রন্ট গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়।
আসলে এ দেশের জনগণ তৃতীয় শক্তি বলতে সামরিক বাহিনী বা সেনাসমর্থিত সরকারকে বুঝে থাকে। দেশের মানুষ তৃতীয় শক্তি বলতে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার সাথে তুলনা করে। প্রথম ও দ্বিতীয় বাচ্চা মায়ের দুধ খায়। তৃতীয় বাচ্চা কিছু না পেয়েই আনন্দে লাফায়।
‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থানের কথা না বলে জনগণের শক্তি বা গণশক্তি কিংবা নতুন শক্তির উত্থান ঘটানোর কথা বলা উচিত। তাহলেই জনগণ একটা সুস্পষ্ট ধারণ পেত। প্রচলিত রাজনীতির বাইরে নতুন শক্তির উত্থান ঘটানোর চেষ্টা। রাজনীতিতে একটা ইতিবাচক বিষয়। পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা সব সময় জনগণের মাঝে কাজ করে। কল্যাণকর কিছু পেলে জনগণ তা গ্রহণ করবে এবং সাড়া দেবে। পরিবর্তন ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে করতে হবে। জনগণকে সংগঠিত করে করতে হবে।
ব্রিটিশদের আগমনের পূর্ব মুহূর্তে মোঘল রাজশক্তি এবং দেশী শাসক ও রাজন্যবর্গ দুর্বল হতে থাকে। মারাঠা শক্তি, মুঘল শক্তি ও শিখ শক্তির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ হানাহানি চলতে থাকে। সে সময় মুসলিম শক্তি ও হিন্দুশক্তির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালে বাংলার শাসন ক্ষমতা লাভ করে। এভাবে তৃৃতীয় শক্তি হিসেবে ব্রিটিশ শাসনের এ দেশে আবির্ভাব ঘটে।
তাই তৃতীয় শক্তির ধারণাকে তারা ঔপনিবেশিক ধারণা মনে করা যায়। বলা উচিত জনশক্তি গণশক্তি বা নতুন শক্তির এবং নতুন ধারার রাজনীতির উত্থান চাই।
বাংলাদেশের রাজনীতি সত্যিই কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রয়োজন। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সীমিত করে ভারসাম্য আনা প্রয়োজন। ফরাসি সংবিধান ভালো করে অধ্যয়ন করে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা যেতে পারে। সেজন্য সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের শাসনকাল সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা যায় কি না বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
পার্লামেন্টে রাজনৈতিক দলের আনুপাতিক হারের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটা সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ডে আছে। জনগণ রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবে। যে দল ৫ শতাংশ ভোট পাবে সে দল পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে দলটি কোনো আসন পাবে না। এভাবে দেশে একটি ভারসাম্যমূলক প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র চালু করা যেতে পারে বলে অনেকের অভিমত।
এখন দেশের জনগণের ভোটাধিকার আছে। কিন্তু ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই। তাই জনগণের কর্তৃত্বের জন্য ‘রিকল সিস্টেম’ চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি জনগণের আশা আকাক্সক্ষা পূরণ না করেন, তাহলে জনগণ অনাস্থা দিয়ে তাদের প্রতিনিধিকে প্রত্যাহার করে নিতে পারবে। দেখা যায়, নির্বাচনের পর জনগণ তার নির্বাচিত এমপি মন্ত্রীর দেখাই পায় না। রিকল সিস্টেম চালু হলে এমপি মন্ত্রীরা তাদের গরজেই জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন।
‘প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র’ চালু হলে জনগণ দলকে ভোট দেবে। দলই সিদ্ধান্ত নেবে কাকে সংসদে পাঠাবে। সে ক্ষেত্রে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব কমে আসবে, দলীয় খরচেই প্রার্থীরা নির্বাচিত হবেন। সরকার দলগুলোকে নির্বাচনী খরচ দিতে পারে। তাতে দুর্নীতি অনেক কমে আসবে। নির্বাচনী বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে।
সেজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি কিছু সাংবিধানিক সংস্কারের কথা ভাবা যেতে পারে। অনেকের মতে, পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ বা সিনেটের মতো সংস্থা গড়ে তুলতে পারলে নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারের দায়িত্ব তারা পালন করতে পারেন। এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হানাহানি হ্রাস পাবে।
প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে যা দুর্যোগকালীন সময়ে জাতীয় নেতৃত্ব দেবে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে।
জাতীয় স্বার্থে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে একমতে আসতে হবে। ঐকমত্যের ভিত্তিতেই হতে পারে রাজনৈতিক সংস্কার; চাপিয়ে দিয়ে নয়। রাজনীতিতে নতুন শক্তি বা গণশক্তির উত্থানের প্রয়োজন। দেশের মানুষের চাহিদা এবং সামাজিক শক্তিগুলোর আকাক্সক্ষাকে ধারণ করেই রাজনীতি করতে হবে। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এলে জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হবে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫