ঢাকা, সোমবার,২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আলোচনা

বর্ষা দুর্গের বাংলা

শামসুদ্দোহা চৌধুরী

১৩ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৪২


প্রিন্ট

কাকাতুয়ার ঠোঁটের মতো বাঁকানো একচিলতে খালে নতুন টগবগা পানিতে উদোম ছেলেপুলেদের বাঁধভাঙ্গা অবগাহন। বাঁশের সাঁকো থেকে এলোপাথাড়ি লাফঝাঁপ, খলবলা পানির স্রোতে গাঁয়ের কিশোরীদের রিমিঝিমি বাদলে নেয়ে উঠানো শরীরে মুক্তোসম বিন্দু বিন্দু পানি টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ার মাহেন্দ্রক্ষণে কলসি কাঁখে বাড়ি ফেরার ব্যস্ততম সময় পার করে দেয়া। কড়–ইয়ের মগডালে বসে জবুথবু কাক কোকিলের করুণ নয়নে তাকিয়ে থাকা। পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথে মাথায় মাথাল চাপিয়ে হাঁটুরেদের ত্রস্তপায়ে বাড়ি ফেরার পাশাপাশি খেয়াপারের মানুষের কোষা নাওয়ের অপেক্ষা। লুঙ্গি গোছকাছা মেরে নদীতীরে টেঁটা কোচ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকের মাছের দিকে তাকিয়ে থাকার অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা। এই দেখাদেখি এবং বিয়েবাড়ির ঢলঢলে লাবণ্যের নতুন কনের কাঁচা হলুদ গোসলের বর্ষা উৎসবের প্রকৃতি, চাতক-চাতকীর দীর্ঘ বিরহের অবসান, রাতে শ্রাবণের ঘনঘোরের মাঝে নিশিপক্ষির বৃষ্টিবিলাপের সাথে একাকার হয়ে যাওয়া কদম, বকুলের মাতাল সমীরণের মাঝে হুট করে বাংলার ড্রয়িংরুমের দরজা ঠেলে মৌসুমের চিরায়ত অতিথি বর্ষা এসে ঢুকলো। করপুটে ধরা হাস্নাহেনা, কদম্বের, বকুলের গন্ধ বিলাস। নতুন অতিথির একহাতে বর্ষাফুলের গুচ্ছ অন্যহাতে ধরা ধস, ভাঙনের জীবননাশি হাতিয়ার, এ যেন মনে করিয়ে দেয় একদিকে মার্বেলপাথরের ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওড়ানো খিচুড়ির সাথে ঝালমাংেেসর রসনাবিলাস, অন্যদিকে বর্ষার অবগাহনে নেয়ে ওঠা কৃষকের একহাঁটু কাদাপানিতে ধানের রোয়া লাগানোর স্বপ্নে বিভোর বাংলার কিষান। বর্ষার ভোগবাদী, ভোগত্যাগিদের মাঝে বর্ষার সম্পদের সুষম বণ্টনের এক অমীমাংসিত ঘাটতি বাজেট নিয়ে প্রতিবছরই হাজির হয় বর্ষা অতিথি, বর্ষা তোমার সম্পদের সুষম বণ্টনের হিসাব কি পৌঁছে দিতে পারবে নদীভাঙন বানভাসী মানুষের কাছে? বর্ষা যেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘মম একহাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য’ কবিতার মতোই। বর্ষা ভাবুক মানুষের কাছে চন্দন গন্ধের নির্মল আবহ নিয়ে আসে অন্যদিকে বর্ষা মানেই হাওরের ফুলে ফেঁপে ওঠা পাহাড়ি ঢলের সর্বস্ব হারানো কিষানের বুক চাপড়ানো কান্না, নদীভাঙনের মানুষের বিলাপ, নগরে একহাঁটু, কোমর সমান দুর্গন্ধ পানিতে রিকশা কুপোকাৎ। পচাগলা নর্দমা, রাশি রাশি আবর্জনা বর্জ্যরে ড্রেন এ যেন মশাদের গুলশান, বারিধারার মতো বিলাসবহুল এপার্টমেন্ট। সেই এপার্টমেন্ট থেকে ঝাঁক ঝাঁক বোমারু বিমানের মতো লক্ষ কোটি মশা পুনুর পুনুর অবিশ্রাম ভয়ঙ্কর শব্দ তুলে নগরবাসীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহ দমাতে পৌরপিতাদের মশা মারতে কামান দাগানোর ব্যর্থ চেষ্টায় নাকাল নগরবাসী, অন্যদিকে নগরবালাদের বর্ষাবরণ উৎসব। চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুতে অসহায় রোগকাতর নগরবাসী, তার সাথে বর্ষা রাজনীতির ইঁদুর-বিড়াল খেলা এবং অন্যদিকে বর্ষার ঘনঘোর বরিষণে বাংলার মানুষ মনের অজান্তে কবি হয়ে যায়। কবিতার বদ্ধ অর্গল খুলতে থাকে। কবিতার ভেলায় ভেসে যায় কবিরা। বর্ষা এসেছে বলেই মনময়ূরী তাথা থৈ ধ্বনি তুলে নেচে উঠলো। সাহিত্যের মাঝে বর্ষা এসে ঢুকে গেল কবে তার সঠিক ইতিহাস আমাদের না জানা থাকলেও বর্ষা কিন্তু আবহমান বাংলায় চিরায়ত আবেদন নিয়ে আসে। এসেছে সেই প্রাগৈতিহাসক কাল থেকেই। এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায় এ কথার আবেদনতো চিরদিনের।
প্রাগৈতিহাসিক কালের বর্ষা বন্দনা কেমন ছিল? সহস্রাধিক বয়সের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তার প্রমাণপঞ্জি পাওয়া কঠিন ব্যাপার। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের যক্ষের বিরহ বন্দনা, শ্রাবস্তি, উজ্জয়িনী, পাটলিপুত্র পার হওয়া মেঘমালার পরানের দীর্ঘশ্বাস, মেঘমালার ঘনঘোর ছায়ার নিচে পাহাড়ে, টিলায়, নগরে, বন্দরে, বাগান বাগিচায়, মনোহর পুষ্পোদ্যানে বর্ষার অবিরাম বারিপাত, কেয়া, কামিনীর, কদম্ব, বকুল, অসংখ্য বর্ষাফুলের মাতাল সমীরণে ভরা ভেজা বাতাস, তার সাথে মেঘের লুকোচুরির মাঝে শ্রাবস্তি, অবন্তি নগরীর মায়াকাননের দীর্ঘ প্রলম্বিত রেখা ধরে সেই যে মেঘদূতের অবিশ্রাম দিবানিশি ছুটে চলার মাঝে কবির বর্ষা বিলাসের দুর্দান্ত প্রার্থনা। বর্ষার কাছে প্রণয়-প্রণয়িণীর চির বিরহের অবসানের সাথে ইদানীংকালের ‘আষাঢ় মাসের ভাইসা পানির’ হাওরের রমণীর কাক্সিক্ষত মানুষের বর্ষা বন্দনাতো একই মনে হয়। চর্যাপদের কবিরা কেমন করে কাটিয়েছে বর্ষাকাল। ঘনঘোর বরিষণের মাঝে বৌদ্ধবিহারে বসে সন্ধ্যার মেঘমালায় মোমের মৃদু আলোয় মহাযানি তন্ত্রযানি হীনযানি বৌদ্ধ ভিক্ষুরা গুরুর পদতলে বসে চর্যাপদের পয়ারে তুলে এনেছিলেন বর্ষার ফুলে ফেঁপে ওঠা তরঙ্গবিক্ষুব্ধ নদীতে ডিঙ্গি কিভাবে পার হবে। সেই বর্ষার ভবনদী পারাপারের জন্য গুরুরাই তো শেষ ভরসা চর্যাপদের কবিদের ভাষায় উঠে এসেছে তার বয়ান। চর্যাপদে বর্ণনা করেছেন শবরী, ডোম্বি বালিকারা ডিঙ্গির হাল ধরে বসে আছে তাদের কড়ি দিয়ে পারাপারের কথা। বর্ষার অবিশ্রাম বারিপাতে পাহাড়ে, টিলায় কার্পাস ফুল ছেয়ে আছে, তন্তুবাইদের কুটিরে তাঁতের টুকটাক শব্দ। সেখানে শবরী, ডোম্বি রমণীরা জীর্ণ কুঁড়েঘরে বসে দিনযাপন করছে। তার চারপাশে বিড়ালের মতো ছোক ছোক করে ঘুরছে মুণ্ডিত মস্তকের কামার্ত ভিক্ষুরা। বিহারের শ্রাবণের ঘনঘোর বরিষণের মাঝে কনকপ্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপধুনার গন্ধে সিদ্ধাচার্য, চর্যাপদী কবিরা বর্ষার কবিতা উৎসবে মেতে উঠছে, এই তো ছিল শবরপা, কানপা, লুইপাদের বর্ষা উদযাপন। সমসাময়িক কালে অথবা তারো কিছু পরে সেন আমলে অজানা কবিদের লেখা ‘সদক্তিকর্ণামৃতে’ উঠে এসেছে সে সময়ের বর্ষা কবিদের বয়ান। এ সমস্ত কবি হয়তোবা ছিল রাজদক্ষিণাবর্জিত। তাদের কাব্যের শানে নজুল ছিল ‘শণে ছাওয়া কুঁড়েঘরের চালায় অবিশ্রাম বারিপাতে চালা ফুটো হয়ে বর্ষার পানি গলগল করে ঝরে পড়ছে। বাইরে সাপ, কেঁচো, ব্যাঙের অবিশ্রাম গর্জন। জীর্ণশীর্ণ দেহের কঙ্কাাল রমণীর একমুষ্টি চালের জন্য বুকচাপরানি কান্না’ এতো সে সমাজের নিরন্ন মানুষের চিরায়ত দলিল। এখনো কি এর ব্যতিক্রম আছে? তবে সেন আমলে রাজা লক্ষ্মণ সেনের দরবারে যে একদল বর্ষা কবির দুর্দান্ত বর্ষার রাগের মেহফিল জমে উঠেছিল তাতো স্বীকার্য। বর্ষার গুর্জরি রাগে কবি জয়দেব তার বিখ্যাত ‘গীত গোবিন্দের’ পসরা খুলে বসেছিলেন। মৃদঙ্গ, তবলার তেরেকাট ধ্বনিতে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল লক্ষ্মণ সেনের বিক্রমপুরের রাজপ্রাসাদ। কবি জয়দেবের ‘গীত গোবিন্দের’ সেই অমর শ্লোক কি ভোলা যায় ‘মেঘৈ মৈদুরম্বরঙ বনভূমি শ্যামাস্ত মালদ্রুমৈ’। কবি ধোয়ী তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ পবনদূত কি কালিদাসের আদর্শে লিখেছিলেন কি না তা জানা নেই। সেই থেকে আজতক অজস্র কবি, প্রাবন্ধিক, লেখক বর্ষা নিয়ে বহুরৈখিক লেখায় বর্ষাকে তুলে এনেছেন তার সঠিক ইতিহাস আমাদের অজান্তেই রয়ে গেছে
এই শ্রাবণের বুকের ভেতর আগুন আছে অথবা তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা অথবা নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে, তীল ঠাঁই আর নাহিরে ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে বলে রবীন্দ্রনাথের বর্ষাবিলাপ তো তাঁর অজস্র গানে কবিতায় প্রবন্ধে গল্পে উঠে এসেছে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? এ কথা তো স্বীকার্য সত্য যে রবীন্দ্রনাথের কাছে বর্ষা মানেই কবিতা আর গানের সীমানাহীন সাগরের ঊর্মিমালায় সোনার তরী ভাসিয়ে জীবনদেবতার সন্ধান করা। বর্ষার তরঙ্গসঙ্কুল নদী তীরে যে কবি জীবনের সমস্ত সঞ্চয় নিয়ে বসে আছেন, সেই ভবনদী পাড়ি দেবেন কিভাবে এ যেন চর্যাপদের কবিদের সাথে একই সুরে পরপারে চলে যাবার এক জীবনঘনিষ্ঠ জিজ্ঞাসা। কি আর্শ্চয মিল। আসলে কবিরা যে শেকড়ের পানেই দিনান্তে ছুটে যান, পরানের গভীরের হাহাকারের সাথে হাজার বছর আগের কবিদের পয়ারের সাথে বর্তমানের কবিদের বর্ষা পয়ারের কি অদ্ভুত মিল। কবি নজরুল ইসলাম তাঁর অসংখ্য গানে বর্ষাকে উজ্জীবিত করেছেন, জীবনানন্দ দাশ, কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, ফররুখ আহমদ, জসীম উদদীন নমস্য কবিরা ছাড়াও এ সময়ের অসংখ্য কবি বহুরৈখিক লেখায় বর্ষাকে তুলে এনেছেন এর কারণ বর্ষা কবিদের কাছে এক আলাদা ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। এই আসাটা আবহমান কাল থেকেই। তার সাথে বর্ষাবরণ উৎসব তো বাঙালির কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এই ‘বর্ষা মঙ্গল’ উৎসব তো রবীন্দ্রনাথ চালু করেছিলেন শান্তিনিকেতনে। তার সাথে বৃক্ষ উৎসবও চালু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, বর্ষার মাসে বৃক্ষ রোপণের মাঝে বৃক্ষ কাটার প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। এই বর্ষার চিরায়ত আহ্বানের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় তার শেকড়ের সত্তা।
এই বর্ষাকে আমরা নিন্দিত নন্দিত যাই করি না কেন, বর্ষা কিন্তু বাঙালিকে আপন সন্তানের মতো বুকে আগলে রেখেছে আবহমান কাল থেকেই। বর্ষার দিগন্তজোড়া পানি, অসংখ্য হাওর বাঁওড়, জলাভূমি। জালের মতো বিছানো বর্ষার তরঙ্গসঙ্কুল নদী, অপরূপ বিলঝিল, জায়জঙ্গল, মশামাছি নিয়ে বর্ষার যে জলজ সংসার, তাকে আমরা নন্দিত করার পাশাপাশি বহমানকাল থেকেই নিন্দিতও করেছি। এর কারণ বর্ষা মানেই নদীর ভাঙন, প্রাচীন বাঙালির অনেক কীর্তির ধ্বংসের কারিগরও বর্ষা। আবার এই বর্ষা মানে বিদেশী লুটেরাদের, আগ্রাসীদের কাছে মহাতঙ্কের নাম। বর্ষা দুর্গের জন্য বাইরের লুটেরারা কখনো বাংলা আক্রমণ করতে সাহস পায়নি। বাংলায় বর্ষার দিগন্তজোড়া পানির কাছে বিদেশী তস্করদের বিশাল বাহিনী ছিল নিতান্ত অসহায়। কখনো ভুলেও বিদেশীরা বাংলা আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখাতো না বিশেষত বর্ষায়। এই বর্ষার বিপদের জন্য দিল্লির সম্রাটরা বাংলাকে নামকরণ করেছিল ‘দোজখ ই নেয়ামতপুর’ নামে। এর মানে প্রচুর ধনসম্পদের মাঝে দোজখ। বাংলার অপরিমিত ধনসম্পদের লোভে দিল্লির সুলতানরা বাংলায় অভিযান করতেন কিন্তু বর্ষা আসার সাথে সাথে পাততাড়ি গুটিয়ে অমীমাংসিত বিজয় নিয়ে দিল্লি সুলতানের সেনাবাহিনীর ঘোড়া ছুটে যেত দিল্লি পানে। বাংলার শাসনকর্তারা তাদের দুর্গ, প্রাসাদ, রাজধানী সাজিয়েছিলেন নদীতীরে। রাজধানী, প্রাসাদ, অস্ত্রাগারের চারদিকে কেটেছিলেন দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষাব্যূহ আঙিনা, গাঙ চারদিক ঘিরে পরিখা কেটেছিলেন যাতে বর্ষার পানি সে খালে আটকে রেখে শত্রুদের ধাবিত ঘোড়াকে থমকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এর একটি কারণই ছিল কোনো রকমে হানাদারদের বর্ষা পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখো, বাংলার প্রতিরক্ষার জন্য বর্ষার পানি সৈন্যরা তো আছেই। আছে মশা, বিষাক্ত সাপখোপের বাহিনী, জল, বৃষ্টি, আর মশা বাহিনীর আক্রমণে, পিছুটান দিয়ে দৌড়াও দিল্লির পানে। সামরিক এই বুদ্ধিটাকে সঠিকভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন সে সময়ের বঙ্গ সুলতানরা। বর্ষা এসে গেলে জায় জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বঙ্গ বাহিনীর বর্ষা মার খেয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হতো বিদেশী লুটেরাদের। মধ্যযুগীয় ইতিহাসে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। এ কারণেই দিল্লি সুলতানরা ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ প্রর্যন্ত বাংলা আক্রমণের সাহস পায়নি। মূলত ২০০ বছরের অধিককাল বাংলা স্বাধীনই ছিল। বর্ষা দুর্গের অসংখ্য প্রমাণের মাঝে একটি কাহিনী উল্লেখ করবো। চর্তুদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার সুলতান ছিলেন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। যিনি ‘শাহই বাঙ্গালা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দিল্লির সম্রাট ফিরুজ শাহ তুগলক পাণ্ডুয়া গৌড়, সোনারগাঁও অধিকারের বাসনা নিয়ে বাংলাভিমুখে দুই লাখ সৈন্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। পাণ্ডুয়ায় শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের কাছে সে খবর পৌঁছে যায়। ইলিয়াস শাহের ছিল জঙ্গল জলাভূমির মাঝে দ্বীপসম দুর্গম একডালা দুর্গ। সুতরাং তাড়া কিসের, রাজপ্রাসাদের ধনদৌলত, সোনাদানা, মোহর, হীরাজহরত, হান্ডি পাতিল, খাবারদাবার, এমন কি জেনানা মহলের বেগম, দাসী বান্দি, সেন্যসামন্ত নিয়ে ঢুকে পড়ো একডালা দুর্গে। বর্ষার কাদামাটি দিয়ে দুর্গের প্রাকার বানাও, তাঁবুতে রাজকবিদের মেহফিল বসাও, অপেক্ষা করো, করতে থাকো, কখন তুগলকের সেনাবাহিনী আসবে, তার প্রতীক্ষায় থাকো। মাটির কেল্লায় খাবারদাবারের অভাব নেই, কাঞ্চনীদের নৃত্যে বিভোর হও। একসময় তুগলকের বিশাল বাহিনী এসে পড়ে পাণ্ডুয়ায়, ফিরুজ তুগলকের চোখ ছানাবড়া। রাজধানীর প্রাসাদ ফাঁকা, কোনো লোকজন নাই। সৈন্যসামন্ত নাই। ব্যাপারটা কি, অবশেষে গুপ্তচর মারফত খবর বাংলার সুলতান একডালা দুর্গে বহাল তবিয়তে আছেন। রাতে পরামর্শদাতাদের সাথে যুদ্ধবৈঠক হলো কিভাবে একডালা দুর্গ দখল করা যায়। তুগলকের সমরকুশলীরা বললো দুর্গের চারদিকের দুর্ভেদ্য খাল অতিক্রম করে এ দুর্গ জয় করা অসম্ভব।
অপেক্ষা আর অপেক্ষা, দেখতে দেখতে বর্ষা এসে গেল। অবিশ্রাম বারিপাতে গোলাবারুদ ভিজে একসা, পেটের পীড়া, ম্যালেরিয়ার আক্রমণে সেনারা মানসিক, দৈহিকভাবে পর্যুদস্ত শেষমেশ কি আর করা বঙ্গ সুলতানের কাছে সন্ধি প্রস্তাব পাঠিয়ে ভগ্নমনোরথ হয়ে তুগলুক ফিরে গেলেন দিল্লিতে। পলায়নরত সৈন্যদের অবশ্য পেছন দিক থেকে আক্রমণ করেছিলেন বঙ্গ সুলতান, যুদ্ধও হয়েছিল। কিন্তু দুর্গম বর্ষার কারণে পিছুটান দিয়েছিল তুগলকের বাহিনী।
শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পরে তার পুত্র সিকান্দার শাহের রাজত্বকালে বঙ্গ অভিযানের প্রতিশোধ নিতে দিল্লিশ্বর তুগলক ফের অভিযান করেছিলেন বঙ্গে। সিকান্দার শাহ পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একডালাতে আশ্রয় নিয়ে বর্ষাশক্তিকে ব্যবহার করে দিল্লির সম্রাটকে দিল্লি পানে ফিরে যেতে বাধ্য করেছিলেন।

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫