ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আলোচনা

ইসমাইল হোসেন শিরাজী: জাগরণের কবি

ড. এম এ সবুর

১৩ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৩৯


প্রিন্ট

‘স্বাধীনতা লাভ করিতে না পারিলে মন কখনো সুস্থ ও সবল হইতে পারে না। জাতি স্বাধীন না হইলে তাহার চিন্তাশক্তিও স্বাধীন এবং বলবতী হইতে পারে না’ এ উক্তিটি গাজি-এ-বলকান কবি সৈয়দ মৌলবি ইসমাইল হোসেন শিরাজীর (১৮৮০-১৯৩১ খ্রি.)। তিনি ছিলেন জাতীয় জাগরণের কবি এবং পরাধীন ভারতের ঘোরবিরোধী। তিনি পরাধীন ভারতের করুণ দশা দেখে ব্যথিত হয়েছেন। তাই জাতীয় জাগরণের পূর্ব শর্ত হিসেবে তিনি পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা কামনা করেছেন। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে তিনি জাতীয় মুক্তি চেয়েছেন। বিদেশী রাজশক্তিকে সমূলে উৎখাত করতে তিনি বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এ জন্য ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি অস্থির উদ্বিগ্ন ছিলেন। আর এ অস্থিরতা থেকেই তিনি অতীত কাহিনী গেয়ে ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তার ভাষায়-
গাবো সে অতীত কথা, গৌরব কাহিনী
নাচাইতে মোসলেমের নিস্পন্দ ধমনী।
গাবো সে দুর্মদ-বীর্য দীপ্ত উন্মাদনা,
কৃপা করি অগ্নিময়ী করো এ রসনা।
(স্পেন বিজয় কাব্য)
শুধু অতীতচারিতা নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্নও বুনেছেন তিনি। তাঁর আশা মুসলমানদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার হবে। পরাধীন মুসলিম বিশ্বে আবার স্বাধীন পতাকা উড়বে। তাঁরা আবার বিশ্বনেতৃত্ব গ্রহণ করবে। তাঁর এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়ণ করতে তিনি আবেগোচ্ছল কণ্ঠে বাঙালি তরুণ-নবীন মুসলিমদের আহ্বান করেছেন এভাবে-
আবার উত্থান লক্ষে
বহাও জগৎ বক্ষে
নব-জীবনের খর প্রবাহ প্লাবন।
আবার জাতীয় কেতু
উড়াও মুক্তির হেতু
উঠুক গগনে পুনঃ রক্তিম তপন। (অনল প্রবাহ)
বিপ্লব বা জাতীয় জাগরণে যুবক-তরুণদের ভূমিকাই বেশি। শিরাজী বুঝতে পেরেছিলেন ঘুমন্ত অধঃপতিত জাতিকে জাগাতে হলে নবীন-তরুণদেরকেই অগ্রসর করতে হবে। তারাই জাতিকে পতন থেকে উত্থান, গ্লানি থেকে গৌরবে উন্নীত করতে পারে। এ জন্য তিনি মুসলিম যুবক-তরুণদের আহ্বান করে বলেন-
আশার তপন নব্য যুবগণ!
সমাজের ভাবী গৌরব কেতন।
তোমাদের ’পরে জাতীয় জীবন
তোমাদের ’পরে উত্থান-পতন
নির্ভর করিছে জানিও সবে। (অভিভাষণ)
স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন অসীম সাহসিকতা। যারা মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে শহীদের আকাক্সক্ষা নিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা সংগ্রাম সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে পারে বিজয়ের মালা তাদেরই গলায় পরে। তাই ইসমাইল হোসেন শিরাজী বাঙালি মুসলিমদের মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে তেজদীপ্ত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন-
শহীদের রক্তরাগ মাখি চোখে, মুখে-বুকে;
উঠ বঙ্গ! নব রঙ্গ তেজঃভঙ্গ দেখাও সুখে।
শহীদের শাহাদৎ অমৃত করিয়া পান,
যত মোর্দা লভ গোর্দা, লভ আজি দীপ্ত প্রাণ।
(বজ্রবাণী)
ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করার জন্য সুদানের কবি মেহেদি আরবি ভাষায় অগ্নিঝরা শব্দসম্ভারে ‘কাফিয়া’ রচনা করেছিলেন। ‘কাফিয়া’র অনলবর্ষী ভাষা সুদানের মুসলিম প্রাণে যে উদ্দীপনা জাগিয়েছিল তাতে ইংরেজ শোষকদের ভিত কেঁপে উঠেছিল। বাঙালি জাতির জাগরণের উদ্দেশ্যে ইসমাইল হোসেন শিরাজীও সুদানি মেহেদির ‘কাফিয়া’ অনুবাদ করে বাংলায় রচনা করেন ‘স্বাধীনতা বন্দনা’। এতে তিনি মেহেদির সুরে কণ্ঠ মিলিয়ে নিদ্রামগ্ন বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে গাইলেন-
পতিত জাতির উদ্ধার হেতু
উড়াও আকাশে রক্তিম কেতু
জাগুক মাতুক ছুটুক দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা।
জয় জয় জয় স্বাধীনতা।
গোঁড়ামি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম সাধনা করেছেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। মুসলিম সমাজের পীরপূজা, কবরপূজা, এগারই শরীফ পালন ইত্যাদি অনৈসলামিক আচার অনুষ্ঠানের তিনি ছিলেন ঘোর বিরোধী। মূল ইসলামের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ব্রত থাকায় তাঁর সাথে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মোল্লা মৌলবিদের বাদ-প্রতিবাদ লেগেই থাকত। জাতীয় জাগরণে তাই তিনি মুসলমানদের ইসলামের মূল শিক্ষার দিকে ফিরে এসে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আহ্বান জানিয়ে তুরস্ক ভ্রমণ গ্রন্থে লেখেন, ‘মুসলমানগণকে দক্ষিণ হস্তে কোরান এবং বাম হস্তে বিজ্ঞান গ্রহণ করিতে হইবে।’ ধর্মকে তিনি শক্তিমত্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ধার্মিক লোকদের জাগরণের মন্ত্রে দীক্ষিত করার লক্ষ্যে ধর্মের অবস্থান তুলে ধরতে তিনি লিখেছেন,‘যেখানে শক্তি নেই, তেজ নেই, বিক্রম নাই, আধিপত্য নাই সেখানে ধর্মও নাই।’ (শক্তির প্রতিযোগিতা)।
শিরাজী মুসলিম নারী জাগরণের নকিব। তিনি ইতিহাসের বিস্মৃত মুসলিম বীরাঙ্গনাদের শৌর্য-বীর্যের কাহিনী সাহিত্যে ও বক্তৃতায় আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরেছেন। জাতীয় জাগরণে তিনি নারী জাগরণকে অপরিহার্য অভিহিত করেছেন।
আর জাগরণের পূর্বশর্ত শিক্ষা ও স্বাধীনতা। তাই নারী জাগরণের জন্য শিক্ষার গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি রচনা করেছেন স্ত্রীশিক্ষা। এতে তিনি লিখেছেন, ‘নারীকে পিছনে রাখিয়া অন্ধ অন্তপুরের শতাধিক মূর্খতা ও কুসংস্কারের জটিল ও কুটিল বেষ্টনে বেষ্টিত রাখিয়া যাহারা জাতীয় জাগরণের কল্যাণ ও মুুক্তির কামনা করে, আমার বলিতে কুণ্ঠা নাই তাহারা মহামূর্খ। নারীশক্তি জাগাইতে না পারিলে সন্তানের শক্তি, সন্তানের প্রাণ আসিবে কোথা হইতে?’ (স্ত্রীশিক্ষা)
নারীশিক্ষার পাশাপাশি নারীদের সামাজিক সচেতনতা জাগরণেরও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বাল্যবিবাহের ঘোর বিরোধী ছিলেন শিরাজী। বাল্যবিবাহ রহিতকরণের নির্দেশনা দিয়ে তিনি লিখেন-
স্ত্রী জাতির তরে শিক্ষা দাও / কোরাণের মর্ম বিদিত করাও /
বাল্য পরিণয় উঠাইয়া দাও। (অনল প্রবাহ)
বাঙালি নারীদের জাগরণে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি তুরস্ক যুদ্ধ শেষে দেশে এসে তুরস্কের প্রগতিশীল নারীদের জীবনাদর্শ তুলে ধরে লিখেছেন, তুর্কীনারী জীবন। এতে তিনি তুর্কি নারী জীবনের সাথে বাঙালি নারী জীবনের তুলনামূলক আলোচনা করে নারী জাগরণ ও প্রগতিবাদের কথা ব্যক্ত করেছেন।
ইসমাইল হোসেন শিরাজী কাব্য এবং সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন নিছক সাহিত্যপ্রীতিতে নয়। মূলত জাতীয় জাগরণ ও সমাজের কল্যাণেই তিনি সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বাংলার মুসলিম সমাজের কুসংস্কার দূর করে আধুনিক জীবন জগতের সাথে যুক্ত করার সাধনায় তিনি ব্রতী হয়েছিলেন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আত্মগৌরববোধ সঞ্চয়ের মাধ্যমে তাদের নিস্তব্ধতা ভাঙতে চেয়েছিলেন তিনি। মুসলিম নবজাগরণ কামনাই যে তাঁর সাহিত্যে ভাবনার মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং তা শৈশবেই তাঁর মনে অঙ্কুরিত হয় তার প্রমাণ অনল প্রবাহ।
ছাত্রাবস্থায় রচিত তাঁর এ গ্রন্থখানির অনল সহ্য করতে না পেরে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দুই বছর কারাদণ্ড দিয়েছিল। তাতেও তিনি দমিত হননি বরং অগ্নিতে ঘৃতাহুতির মতো আরো জ্বলে উঠে বাঙালি মুসলিম সমাজকে জাগরিত করতে সারা জীবন সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছেন। অবহেলিত, উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ মুসলিম জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে তিনি গাইলেন-
আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া, / উঠরে মোসলেম উঠরে জাগিয়া, /
আলস্য জড়তা পায়েতে ঠেলিয়া, / পূত বিভূ নাম স্মরণ করি।
শিরাজীর জাগরণ বাণী সে দিন ‘আসহাবে কাহাফের’ মতো নিদ্রায় আচ্ছন্ন বাংলার মুসলিম সমাজের কানে বাঁশির সুরের মতো ধ্বনিত হয়েছে। মুসলিম বঙ্গের দামাল কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের কিছু আগে শিরাজীর কণ্ঠে ‘সুবহি সাদিকের’ বাণী ঝঙ্কৃত হয়েছে। ইসমাইল হোসেন শিরাজীর অনল প্রবাহই ২০ বছর পরে নজরুল ইসলামের অগ্নি-বীণা রূপ ধারণ করেছিল। কাজী নজরুলের ভাষায়, ‘তাঁহার (শিরাজী) সমগ্র জীবনই ছিল অনলপ্রবাহ। আর আমার রচনা সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের প্রকাশ।’ নজরুল ইসলাম ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে চাবুক মেরে জাগিয়ে দিতে চেয়েছেন আর তাঁর পূর্বসূরি মুসলিম জাগরণের কবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী বলেছেন-
ওরে মূর্খ মুসলমান! / আছিস রে কিভাবে মগন /
বাঁচতে চাহিস যদি / জাগ তবে জাগরে এখন।’ (উন্মেষণা)
ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সব সাহিত্যই উদ্দীপনামূলক ও মুসলিম চেতনা জাগরক। তাঁর রচিত গদ্য-পদ্য সাহিত্যে জাতীয় জাগরণ সমভাবে বিবেচ্য। অনল প্রবাহ, প্রেমাঞ্জলি, সঙ্গীত সঞ্জীবনী, উদ্বোধন, স্পেনবিজয় কাব্য পদ্য সাহিত্যে যেমন মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরে বাঙালি মুসলিম সমাজকে জাগরণের চেষ্টা করেছেন। তেমনি তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোতেও মুসলিম জাতীয় চেতনা ও শৌর্য-বীর্য স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া বাঙালি মুসলিম সমাজকে ধর্ম-সংস্কৃতি, শিক্ষা-সাহিত্য, রাজনীতি-অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন উদ্বুদ্ধ করতে তিনি প্রায় ৩০০ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। যেমন ‘এছলাম ও আত্মোৎসর্গ’, ‘এছলামের মূল শক্তি’, ‘এছলাম ও ঐক্যশক্তি’, ‘এছলাম ও জ্ঞানচর্চা’, ‘আত্মশক্তি ও প্রতিষ্ঠা’, ‘নবজাগরণ’, ‘জাতীয় ধনভাণ্ডার’, ‘নব্যযুবক ও ছাত্রগণের প্রতি’, ‘কেন স্বাধীনতা চাই’, ‘বজ্রবাণী’, ‘মাতৃভাষা ও মুসলমান’, ‘আত্মপরিচয়’, ‘আত্মবিশ্বাস’ প্রভৃতি। এসব প্রবন্ধের নামকরণ থেকেই চেতনার গভীরতা সহজেই বোঝা যায়। স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা, তুর্কী নারীজীবন, তুরস্ক ভ্রমণ, আদব কায়দা শিক্ষা, স্ত্রীশিক্ষা প্রভৃতি গদ্য গ্রন্থে তিনি বাঙালি মুসলিম জাগরণের প্রয়োজনীয়তা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রকৃতপক্ষেই শিরাজী ছিলেন মুসলিম জাগরণ ও স্বাধীনতার একনিষ্ঠ সাধক। পরাধীন ঘুমন্ত ও ঐতিহ্য বিস্মৃত বাঙালি মুসলিম সমাজকে জাগ্রত করতেই মূলত তাঁর সাহিত্য সাধনা। বাঙালি মুসলিম জাতির স্বাধীনতা অর্জন ছিল তাঁর স্বপ্ন লক্ষ্য। জন্মদিনে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫