ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

আলোচনা

ভাষাচার্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

১৩ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৩৬


প্রিন্ট

“যে সমস্ত অবিবাহিত লোক সন্ন্যাসী হয়ে তাদের নামের সংগে ‘স্বামী’ এই বিশেষণ যোগ করে দেয়, যেমন দয়ানন্দ স্বামী, সদানন্দ স্বামী ইত্যাদি, আমি তাদের মত স্বামী নই। আমার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও আমি তাঁদের মতই স্বামী। আমার নাম জ্ঞানানন্দ স্বামী, জ্ঞান চর্চায়ই আমার আনন্দ।” কথা ক’টি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয়বার অবসর গ্রহণকালে সংবর্ধনা সভায় বলেছিলেন। রসিকতা করে কথা ক’টি বলা হলেও এর ভেতর নিহিত আছে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্বন্ধে চিরন্তন সত্য কথা। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন এমন একজন জ্ঞানসাধক, যিনি আজীবন উক্ত সাধনায় একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত ছিলেন। প্রায় পৌনে এক শতাব্দীকাল ধরে অক্লান্তভাবে তিনি জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। তিনি জ্ঞান সাধনায় এই যে অসাধারণত্ব অর্জন করেছিলেন, তার জন্য তিনি কোনো দিন অহমিকা দেখাননি। তিনি ছিলেন শিশুর মতো সরল। হিংসা, ঈর্ষা, অহঙ্কার কোনো দিন তাঁর চরিত্রে ঠাঁই পায়নি। তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল শিক্ষকতা করে কাটান। তাঁর এই উজ্জ্বল মানবছায়ায় জ্ঞানের সুশীতল বারিধারা পান করে কতজন যে ধন্য হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সব সময় অসাধারণ হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতেন। অসাধারণ কিছু শেখার এই স্পৃহাই যে তাকে এতগুলো ভাষায় বুৎপত্তি লাভের সুযোগ করেছিল, সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, তিনি আঠারোটি ভাষার ওপর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। ভাষাগুলো হলÑ বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, পারসি, বৈদিক, আবেস্তান, তিব্বতি, উর্দু, হিন্দি, সিংহলী, মৈথিলি, উড়িয়া, আসামি এবং সিন্ধি। স্কুল জীবনেই তিনি বেশ কয়েকটি ভাষা আয়ত্তে এনেছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে শেখেন উর্দু এবং পারসি। বিদ্যালয় সূত্রে শেখেন ইংরেজি, বাংলা এবং সংস্কৃত। আর হওড়ার বাসার প্রতিবেশীর কাছ থেকে উড়িয়া ও হিন্দি ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর জীবনের দু’টি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ দু’টি ঘটনাকে তাঁর বিস্তৃত জ্ঞান-সাধনার দিগদর্শন বলা যেতে পারে।
আরবি ছিল তার পরিবারের প্রিয় ভাষা। অথচ এই আরবি ত্যাগ করে তিনি সংস্কৃতে এনট্রানস পরীক্ষা দেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, শিক্ষকের মারের ভয়ে। হুগলি জেলা স্কুলের তখনকার আরবি শিক্ষক নাকি কারণে-অকারণে ছাত্রদের বেদম প্রহার করতেন। শহীদুল্লাহর এটা পছšদ হতো না। তাই তিনি আরবির পরিবর্তে সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে এসে ধরা দিলেন সংস্কৃতের শিক্ষার্থী হিসেবে। এমনিভাবে তিনি সংস্কৃত শিক্ষায় উৎসাহ পেলেন। ১৯০৪ সালে তিনি সংস্কৃতকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়ে এনট্রাস পাস করেন। ১৯০৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাস করার পর তিনি হুগলি কলেজে ভর্তি হন সংস্কৃতে অনার্স পড়ার জন্য। এ সময় তিনি বেশ কিছুকাল ম্যালেরিয়া রোগে ভোগেন। বছর দুয়েক পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু তাতে তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে ১৯১০ সালে তিনি সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। তাঁর আমলে একজন মুসলমান ছাত্রের পক্ষে সংস্কৃতে অনার্স পাস করাটা আশ্চর্যজনক ছিল বৈকি।
আরেকটি ঘটনা, তিনি তখন বিএ (অনার্স) পাস করে সংস্কৃতে এমএ করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। কিন্তু সংস্কৃত বিভাগের কিছু শিক্ষক শ্মশ্র“বদন মুসলমান মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে পড়াতে অস্বীকার করলেন। সত্যব্রত শ্যামাশ্রয়ী এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এই মর্মে আপত্তি তুললেন যে, বেদ বেদাভগ ব্রাহ্মণদের ছাড়া আর কারো পড়ার অধিকার নেই। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বেশ গোলযোগের সৃষ্টি হলো। সংবাদটি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের বেড়া পেরিয়ে বাইরে এলো। তৎকালীন চিন্তানায়কদের তুমুলভাবে আলোড়িত করল। মওলানা মুহম্মদ আলী কমরেড পত্রিকার ‘দি লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা অব ইন্ডিয়া’ প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখলেন-
‘সংস্কৃত ও আরবিতে রচিত সাহিত্য ও দর্শনের অফুরন্ত খনি শ্রেষ্ঠ প্রত্নসাহিত্যের শিক্ষর্থীকে যে আকৃষ্ট করত তাতে সন্দেহ নেই এবং বর্তমানের চেয়ে অধিক সংখ্যায় মুসলিম বিদ্যার্থীরা সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করুক- এই আশা পোষণ করে, আমরা বিশ্বাস করি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পণ্ডিত জনৈক মুসলমান ছাত্রকে সংস্কৃত পড়াতে অস্বীকার করে শহীদুল্লাহ ঘটিত ব্যাপারের ন্যায় যে ঘটনার সৃষ্টি করে, আর তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।’
বেঙ্গলী পত্রিকার সম্পাদক সুরেন ব্যানার্জির মতো লোকও লিখলেন ‘টু ডে দিস অর্থডক্স পণ্ডিটস শুড বিথ্রোন ইন টু দ্য গাঙ্গেজ’।
তবে সেবার অর্থডক্সিরই (গোঁড়ামি) জয় হয়েছিল। বাকবিতণ্ডার ফলে সৃষ্ট চাপে বাধ্য হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্যই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগটি খুলতে হয়েছিল। এই বিভাগের প্রথম এবং একক ছাত্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১২ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এমএ পাস করেন। যদিও তিনি সংস্কৃতে এমএ পড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন সংস্কৃতে উচ্চ শিক্ষালাভ করবেন। তিনি এই উপমহাদেশের সংস্কৃত ভাষার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের একজন ছিলেন। সংস্কৃতে এমএ পড়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে নতুন নতুন ভাষা শিক্ষার এক সম্ভাবনার দ্বার তার সামনে খুলে গিয়েছিল।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশক্রমে ও বগুড়ার নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীর বদান্যতায় তিনি জার্মানিতে সংস্কৃতে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় বৃত্তি পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি ভালো মেডিক্যাল সার্টিফিকেট পাননি, তাই তাঁর আর জার্মানি যাওয়া হয়নি। কিন্তু এতেও তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। প্রাচ্যের জ্ঞানভাণ্ডার তাঁকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। সে ডাকে তিনি সাড়া দিলেন ১৯২৬ সালে। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে অধ্যাপনা করছিলেন। দু’বছরের ছুটি নিয়ে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন নিজের খরচে। সেখানে তিনি বৈদিক, বৌদ্ধ, সংস্কৃত, তিব্বতি এবং প্রাচীন পারসি ভাষা সম্বন্ধে গবেষণা শুরু করলেন। এর ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্যারিসের ‘আর্কিভ ডি লা প্যারোল’ নাম ধ্বনিতত্ত্ব শিক্ষায়তনে ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে লাগলেন। সেখানে তিনি ‘লেস সনস ডু বেঙ্গলি’ নামে একটি গবেষণাপত্রের জন্য উক্ত শিক্ষায়তনের মানপত্র লাভ করেছিলেন। এদিকে সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘লেশাঁ মিস্ত্রিক’ নামক তাঁর গবেষণা কর্মটি জমা দিয়ে জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় আসেন বৈদিক সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের জন্য। কিন্তু ছুটি ফুরিয়ে এলো। সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীর ডক্টরেট অব লিটারেচার ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।
অনুকূল স্বাস্থ্যবিষয়ক সার্টিফিকেট না পাওয়ায় ১৯১৩ সালে তাঁর জার্মানিতে যাওয়া না হলে তিনি আইন বিভাগে ভর্তি হয়। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএএলএলবি পাস করেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি বশিরহাটে ওকালতিও করেছিলেন। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে যিনি এমএ পাস তিনি হঠাৎ করে কেন আইন শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েন তা বলা মুশকিল। তবে এর পেছনে সম্ভবত এটাই প্রধান কারণ ছিল যে, ‘তিনি চাইতেন জ্ঞানরাজ্যের সর্বত্র ভ্রমণ করতে।’ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের ভাষায় ‘হি ইজ এ ওয়াকিং ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ওরিয়েন্টাল লোর’।
তাঁর এরূপ ভাষাজ্ঞান ঐতিহাসিক তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব চর্চা, ভাষার ইতিহাস রচনা, অনুবাদকর্ম, ব্যাকরণ ও অভিধান প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বাঙ্গালা ব্যাকরণ (১৯৩৬), বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৫৯) এবং পূর্ব পাকিস্তানী আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (২ খণ্ড, ১৯৬৩-৬৫) বিশেষ কৃতিত্বের দাবি করে। তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণের রীতি-পদ্ধতি পরিহার করে বাংলা ভাষার আলোকে প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণ রচনায় প্রয়াসী হন। বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দুহিতা নয়, গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব- বাংলা ভাষার ইতিহাস রচনায় এরূপ নতুন মত দেন। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, উর্দু ভাষাজ্ঞান থেকে তিনি কয়েকটি অনুবাদগ্রন্থ প্রণয়ন করেন, যেমন দীওয়ান-ই-হাফিজ (১৯৩৮), শিকওয়াহ ও জওয়াব-ই-শিকওয়াহ (১০৪২), রুবাইয়াত-ই-ওমর খয়্যাম (১৯৪২), বিদ্যাপতি শতক (১৯৫৪), অমরকাব্য (১৯৬৩) ইত্যাদি। তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও ফরাসি ভাষায় অবলীলাক্রমে বলতে ও লিখতে পারতেন। এই চার ভাষায় তাঁর মননশীল রচনার নিদর্শন আছে।
জ্ঞান আহরণের প্রচণ্ড তৃষ্ণা-ক্ষুদা তাঁকে এক মুহূর্তও স্বস্তি দেয়নি। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে পড়াটা তাঁর চিরন্তন অভ্যাস ছিল। এমনকি বৃদ্ধ বয়সেও তিনি তা ত্যাগ করতে পারেননি। প্রতিদিন ভোরে কুরআন তেলওয়াত ও চর্চা থেকে শুরু করে দিনের অধিকাংশ সময় তিনি পড়াশোনায় লিপ্ত থাকতেন। তিনি যেখানেই যেতেন সাথে তাঁর বই থাকত। তিনি বলতেন, বউ-এর চেয়ে বই আমার সবচেয়ে প্রিয়। সেটা সব সময় আমাকে আনন্দ দেয়, আমাকে সঙ্গ দেয়। এমনকি বৃদ্ধ বয়সেও। অন্যত্র তিনি বলেছেন, জেলে পুরে রাখলেও আমার বিশেষ কষ্ট হবে না, যদি সেখানে পড়ার পুঁথি ও লেখার কাগজ-কলম পাওয়া যায়।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি দেখলে বিস্ময়াভিভূত হতে হয়। এটা অন্যান্য পারিবারিক লাইব্রেরির মতো গৃহের শোভাবর্ধনের জন্য ছিল না, ছিল আত্মিক ক্ষুধা মেটানোর প্রধান সম্বল। কেউ তাঁর বই ধার নিতে এলে তাঁকে নিরাশ করে নিচের সংস্কৃত বচনটি আওড়াতে ভুলতেন না :
লেখনী পুস্তিকা জায়া পরহস্তং / গতা গতা /
যদি সা পুনরায়াতি ভ্রষ্টা নষ্টা / চ মতিদা।
অর্থাৎ লেখনী পুস্তক ও স্ত্রী যদি পরের হস্তগত হয় তবে তা একেবারে গিয়েছে মনে করতে হবে। যদিও তা কখনো ফিরে পাওয়া যায় তবে আগের অবস্থায় নয়, নষ্ট ভ্রষ্ট ও মদিত অবস্থায়।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অত্যধিক পুস্তক প্রীতির জন্য পুস্তক হস্তান্তরের ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫