ঢাকা, সোমবার,২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প

মেঘের পরে বৃষ্টি

ফজলে রাব্বী

১৩ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:১৪


প্রিন্ট

বাইরে প্রচণ্ড ঝড়। সাধের আমগাছ দুটা ঝড়ের কবলে পড়ে একেবারে ভেঙে পড়েছে উঠোনের সামনে। এবার আর নুন, মরিচ দিয়ে আম ভর্তা খাওয়া লাগবে না। গাছের পাতা চিবিয়ে খেলেই তৃপ্তি মিটবে। ছোট বোনটার কথা শুনে হাসি কান্না দুটোই একসাথে যেন এলো। পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদীর দিন দিন ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই নদী চর ফের চর নদী হয়ে ওঠে। তার বহমান ধারা কিভাবে আর কখন যে গ্রাস করে ফেলে শত শত পাড়ের বাড়িঘর আর দিয়ে যায় অসহায় মানুষের চোখে নোনা জলপ্রপাত সে খবর কি সাদা নগরের নয়া বিল্ডিং জানে? জৈষ্ঠ্যের আনন্দ হাসির মাঝেই লুকিয়ে থাকে আসল হিংস্রতা। বিজলি চমকানোর সাথে সাথে বুকের ভেতর ধুপ করে একটা শব্দ হলো। কে যেন বাইরে থেকে ডাকছে, ‘ভেতরে কি কেউ আছেন?’ এই অসময়ে বাইরে থেকে কারো গলা পেয়ে লাফ দিয়ে উঠলাম। বোনের হাতে লুড়– খেলার ছকটা দিয়ে দরজা খুলে দেখি একটা মেয়ে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে দাঁতে দাঁত লেগে থরথর করে কাঁপছে। বাকি কথাগুলো খুলে আর বলতে পারছে না। গৃহের ভেতর আমন্ত্রণ জানালাম। কিন্তু মেয়েটা ওখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে হাত উঁচু করে দূরে অবস্থানরত একজন পাগলের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তারপর সোজা অজ্ঞান। পাগলটা রীতিমতো মাথায় দামি একটা ছাতা ঝুলিয়ে খিলখিল করে হাসছে। নিশ্চয় ওই ছাতাটা এই শহুরে মেয়েটারই। ব্যাপারটাকে যতটা কঠিন ভেবেছিলাম ততটা আসলে কঠিন নয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পাগলের প্রলাপ বেশ কিছু গ্রামের মানুষ সহ্য করে আসছে। সবাই চিনে এক নামে, ‘ছাতা পাগল’। রোদের দিনে বা বর্ষার সময় এই ছাতার জন্য পাগলটা হন্য হয়ে ঘুরে বেড়ায়। যেখানে যার ঘরে বা হাতে যেভাবেই পায় সেখান থেকেই ছাতা সংগ্রহ করে নিজের ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখে। এভাবে অনবরত নির্ধারিত কার্য সম্পাদন করতে করতে একসময় দেখা যায় পাগলের ঘরে ছাতা ছাড়া অন্য কিছুই আর চোখে পড়ে না। ঘরভর্তি ছাতাগুলো সে সারারাত বসে বসে পাহারা দেয়। কখনো যেন ঘুমিয়ে না পড়ে সেই চিন্তায় দিনের শুরুতেই এক চোট ঘুমিয়ে নেয়। আর অচেনা মানুষ পেলে তো কোনো কথাই নেই। তবে টাকা-কড়ি, ব্যাগভর্তি মালামাল ইত্যাদির প্রতি তার কোনো লোভ নেই। প্রয়োজনে রাস্তায় এসব কুড়িয়ে পেলে কাক্সিক্ষত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে সদা সে প্রস্তুত। শুধু লোভ সামলাতে পারে না ছাতার। ভয়ঙ্কর নেশার মতো এই ছাতা তাকে টানে। এই ছাতার জন্যই কষ্ট দুঃখে জর্জরিত হয়েছিল পাগলের মন। জন্মের পর থেকেই তার আদরের মেয়েটার ভীষণ অসুখের সীমা ছিল না। ওষুধের বাক্স হয়ে গিয়েছিল তুলতুলে ছোট পেটটা। তবুও আম কুড়ানোর দিনে টোনাভর্তি পাকা পাকা আম যখন কুড়িয়ে কুড়িয়ে ঘরে আনত আবার টসটসে মিষ্টি আমের রসে সবার সামনে মুখটিকে হাসতে হাসতে রাঙ্গাত; পাগল তখন নতুন এক বাঁচার সুখ আবিষ্কার করত। কুঁড়েঘরের শীতল ছায়ে মেয়েটার অবাধ বিচরণ সারা দিনের ক্লান্ততাকে বিনাশ করে দিত। বয়সে অল্প হলেও মেয়েটার বুদ্ধিতে আটকাত অনেক কিছু। বুঝতে পারত সুন্দর পৃথিবীটার আলো দেখার ভাগ্য নিয়ে জন্মায়নি সে। তাই তো বাবার উপহার দেয়া ছোট্ট ছাতাটা মাথায় নিয়ে বৃষ্টিতে বসে বসে বুড়ো মানুষের মতো চিন্তা করত। ঝড়ের দিনে মেঘ আকাশে বিজলি যখন পুরু পৃথিবীটাকে দুই ফালি করে চিৎকার দিয়ে ওঠে মেয়েটা তখন তার বাবার গলা জাপটে ধরে হাউমাউ করে কাঁদে। ঘনিয়ে আসার সময়টাকে কিছুতেই মানতে পারে না বাপ। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অবশিষ্ট বাড়ির ভিটাটুকু বিক্রি করে দিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে শহরের ভালো কোনো ডাক্তারের শরণাপন্ন হবে। যদি কোনোভাবে বাঁচানো যায়! কিন্তু যার ঘরে অমন বুদ্ধিমতি মেয়ে রয়েছে, যে বেঁচে থাকতেই বুঝতে পারে আমার সময় এই আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো, বিজলি তাকে একদিন তার দেশে নিয়ে যাবে তবে কী কোনো প্রতিউত্তরের জায়গা থাকে? কোনো এক আষাঢ়ে আদরের এই ময়না পাখি তার বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ছাতা মাথায় ঘরছুট হয়েছিল আর ফিরে আসেনি। সেদিন বৃষ্টিরা অঝরে কেঁদেছিল, বাবার আর ভিটেটুকু বিক্রি করতে হয়নি। সেখানে এখন বাস করে হারিয়ে যাওয়া ময়না পাখির নরম দু’টি পায়ের চকচকে সেন্ডেল, একটা জামা আর অজস্র ভালোবাসার সেই উঠোন, নরম হাতের ছোঁয়া দিয়ে বড় করা ডালিম গাছ আর দুটো হলুদ পাখি। এখন আর পাখি দুটো নেই। কেবল আছে আষাঢ়ের সেই দিন আর বিজলি চমকালে হারিয়ে যাবার স্মৃতি। শুধু নিজের নামটা বদলে গেছে। তোফাজ্জল থেকে ছাতা পাগল। বর্ষা গেলেই যার তার ছাতা আবার ঠিকমতো যার তার বাড়িতেই ফিরিয়ে দিয়ে আসে। জীবনে আরেকটিবার তার মেয়েটা এমন এক ঝড়-বাদলার দিনেই ফিরে আসবে। এমনটাই প্রবল আত্মবিশ্বাস। তারপর তার বাবার কাছে এসে বলবে, ‘বাবা, সুন্দর দেখে একটা ছাতা দাও। আমি তো হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। কখন জানি বিজলি আমায় ডেকে বসে। তখন ছাতা মাথায় দিয়ে টুকটুক করে এই বৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে বর্ষার দেশে চলে যাব। তুমি আমায় দেখতে যেয়ো। তোমার মেয়েটাকে দেখতে যাবে না বাবা? জানো, বর্ষা দিদিমা না খুব ভালো। আমায় একটুও সর্দি লাগতে দেয় না। মাথার ওপর সবসময় মেঘের ছাউনি দিয়ে ঢেকে রাখে। তারপরও ফুটো দিয়ে আমি তোমায় দেখতে পাই। তুমি ব্যাঙের ছাতা নিয়ে যখন ব্যাঙের ছানার হাতে দাও তখন আমি ওপর থেকে মিটমিট করে হাসি। আমার হাসিতেই তো নতুন করে রোদ জ্বলে ওঠে। তুমি কি দেখতে পাও না বাবা? নাকি তোমার কাছে রোদ এসে পৌঁছায় না?’
২ .
বাইরে বৃষ্টি কমে গেছে। অজ্ঞান হওয়া মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। সেবার জন্য মা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই পাগলের বর্ণনায় মেয়েটার ভয় এখন নেই বললেই চলে। মা হঠাৎ মেয়েটার ঠিকানা সম্পর্কে জিজ্ঞাস করল। মেয়েটা জানাল, তার নাম প্রীতি। ছোট থেকেই শহরে বড় হয়েছে। কখনো গ্রামে আসেনি। শুধু তার দাদা-দাদীর মৃত্যুর সময় একবার এসেছিল। তাই এইবার গ্রামকে দেখার জন্য একা একাই চলে এসেছে। অনেকদিন আগে এসেছিল বলে গ্রামের পুরুটাই নাকি অচেনা লাগছে। আবার অনেক কিছুই খেয়ালে নেই। বদলে যাওয়ার গল্প বলার মাঝে মা হঠাৎ জিজ্ঞাস করল, ‘যার কাছে এসেছ তার নাম কী’?
‘রত্না বেগম। আমার কাকিমা, যিনি আমার আরেক মা। আমার জন্ম আর মায়ের মৃত্যু একসাথে হওয়ায় নিজের মাকে কোনো দিন স্পর্শ করতেও পারিনি। তবে আমার কাকিমা আমাকে মা ডাকা শিখিয়েছে।’
মায়ের চোখে হঠাৎ টলমল করে জল নড়ে উঠল। ব্যাপারখানা কোত্থেকে থেকে কোথায় গড়াচ্ছে বুঝতে কষ্ট হলো। এমন সময় মা উল্টো আরেকটা প্রশ্ন করার বদলে প্রশ্নোত্তরের সাথে বলল, ‘তোর বাবার নাম সুরুজ আর মায়ের নাম আয়েশা, তোর দাদার নাম আন্তাজ আর দিদির নাম জরিনা।’ মেয়েটা অবাক হয়ে যখন মাথা নাড়ল তখন মা জোরে আওয়াজ করে বলল, ‘ওরে পাগলী, এতদিন পর তোর কাকিমার কথা মনে পড়ল? তোকে দেখার জন্য মনটা বড় আকুল হয়ে থাকত রে! যে লক্ষ্মীরে দুধ খাওয়ায়ে কোলে পিঠে করে হাঁটা শিখাইছি তারে আজ আমি চিনতে পারলাম না! এমন চক্ষুভোলা হয়ে গেছি রে!’
মায়ের চোখে হঠাতই ঝিলমিলি তারাদের ঝকমকানি আলো জ্বলছে। আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আর আনমনা হয়ে মাথা চুলকিয়ে যাই। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে অতীতকে মনে করার মতো সাধ্যি নেই। তবে মনে পড়ে খুব ছোটবেলায় ‘প্রীতি’ নামের একটা মেয়ের সাথে খেলা করতাম, পুতুল বিয়ে দিতাম, ধুলো-বালিতে মাখামাখি করে কাটিয়ে দিতাম সারাদিন, যে আজ আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জ্বায় দেখি মুখটা লাল হয়ে গেছে। মা আমাকে বললেন- এক্ষুণি বাজারে যা। যা পাবি সব নিয়ে আয়। মা-রে আর যাইতে দিমু না। মায়ের আদেশ উপদেশ সব একসাথে কানে বাজা শুরু করল। কোনটা ছেড়ে কোনটা করব বুঝতে পারা মুশকিল।
‘কিন্তু মা বাইরে তো টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। তা ছাড়া ছাতাটাও ছিঁড়ে গেছে। কি নিয়ে যাব?’
না চাওয়া জিনিসগুলো চাওয়া হতে বেশি সময় লাগে না। মায়ের উত্তর দেয়ার আগেই দেখি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ছাতা পাগল। একবার দরজার ভেতর দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে দাঁত বের করে দিয়ে বলল, ‘কী! এই যে ছাতি নিয়া যাও। বাইরে তো মেঘ নাই। বৃষ্টি আইলে আবার নিয়া যামু।’

 

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
সকল সংবাদ

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫