ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

চালের বাজার : শুল্ক কমেছে ছয় টাকা, দাম কমেছে এক টাকা!

মীর আব্দুল আলীম

১০ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৪:৫৫


প্রিন্ট

৮ জুলাই প্রথম শ্রেণীর একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম ছিল এরূপ : ‘চালের আমদানি শুল্ক কমানোর প্রভাব : শুল্ক কমেছে ছয় টাকা, দাম কমেছে এক টাকা’। সিন্ডিকেট ওয়ালাদের পকেটে আরো বাড়তি যাবে ৬ টাকা। তারা পুরস্কৃত হলেন বটে! জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি এ দেশে এমনই হয়। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজি আর নানা কারণে চালের দাম বেড়ে আকাশ ছুঁয়েছে। টিসিবির তথ্যমতে, গত এক বছরে দেশের বাজারে মোটা চালের দাম বেড়েছে ৪২.১৯ শতাংশ। মোটা চালের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সরু চালের দামও।
চালের বাজার বলতে গেলে বেসামাল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোটা চালের দাম বেশি বেড়েছে। সরু চালের দাম বাড়লে উচ্চবিত্তের তেমন সমস্যা হয় না, যত আপদ বিত্তহীনদের ওপর। এ দিকে দেশে চালের দাম অব্যাহত বেড়ে যাওয়ার কারণ স্পষ্ট করতে পারেননি খাদ্যমন্ত্রী। তবে চাল মিল মালিক সমিতির দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, মিলারদের চালের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং চাল বিতরণ দফায় দফায় বাড়ছে চালের মূল্য। চালের দাম সাধারণ মানুষের মধ্যে রাখার জন্য খোলাবাজার সরকারি উদ্যোগে চাল নিয়ে কর্মসূচি বন্ধ থাকার কারণে চালের বাজারে বিরাজ করছে অস্থিতিশীলতা। হাওর অঞ্চলের দুর্যোগকেও চালের দাম বেড়ে চলার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ চালের বাজারে এর প্রভাব পড়ার কোনোই কারণ নেই বলেই মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বাজারে নতুন ধানও এসেছে। এ সময় চালের দাম নেমে আসে। এরপরও দাম কেন বাড়ছে? অনেকটা রহস্যজনকভাবে চালের দাম বেড়েছে। সরকার তাতে বিব্রত হয়েছে। চালের দাম কমানোর জন্য সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে। এর অংশ হিসাবে চালের আমদানি শুল্ক ১৮ শতাংশ কমানো হয়। ফলে প্রতি কেজি চালের আমদানি খরচ ছয় টাকা কমেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে চালের আমদানি শুল্ক কমানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, আমদানি শুল্ক কমালে চালের দাম কমবে। শুল্ক কমানোর সুবিধা নিয়ে সম্প্রতি দেশে প্রায় ৬০ হাজার টন চালও আমদানি হয়েছে বলে আমরা পত্রিকান্তে জেনেছি। কিন্তু খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণেই দেশের বেশির ভাগ এলাকায় পাইকারি ও খুচরা বাজারে চালের দাম কেজিতে মাত্র এক টাকা কমেছে। প্রশ্ন হলো ছয় টাকা শুল্ক সুবিধা নিয়ে চালের দাম এক টাকা কমায় কি করে? গত ৬ জুলাই খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতি-বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে চালের দাম কেজিতে এক টাকা কমে ৪৫ থেকে ৪৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য বলেন, মোটা চালের দর ৪০ টাকার ওপরে গেলেই সাধারণত গরিব মানুষের কষ্ট বেড়ে যায়। গরিব মানুষের এমন কষ্ট লাঘব করা দরকার। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, হাওরে বোরো ধানের আবাদ নষ্ট হয়েছে। এ কারণে চালের দাম বেড়েছে। সরকারের তরফ থেকে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার খবরকে অস্বীকার করা হয়নি। তবে আমরা মনে করি, যথেষ্ট পরিমাণ চাল মজুদ থাকলে হাওরের দুর্যোগের প্রভাব মোকাবেলা করা সরকারের পক্ষে কঠিন হতো না। চালের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকার জন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। নতুন চালেও সরকারের আশা পূরণ হয়নি। এখন সরকার আশা করছে, চাল আমদানি করা হলে এর দাম কমবে। এ ক্ষেত্রেও হতাশার খবর মিলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়ছে। সরকার চাল আমদানি করতে করতে এর দাম আরো বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আসলে সবার আগে সিন্ডিকেটওয়ালাদের চালবাজি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চালের দাম বেড়ে ওঠার বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্টদের নজরদারি কম বলেই মনে হচ্ছে। বাজারে মোটা চালই এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজিতে। সরু চালের কেজি ৬০ টাকা ছাড়িয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে মোটা চালের দাম রেকর্ড ভাঙায় নি¤œ আয়ের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোটা চালের কেজি ৪০ টাকা এবং সরু চাল ৫৬ টাকায় উঠেছিল।
এ দিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চাল-গমের দাম বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোটা চালের দাম বিশ্বে এখন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে মোটা চালের দাম নি¤œ আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু চাল নয় যে কোনো উসিলায় অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো একটি দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতায় তৈরি হয়েছে দেশে। এখনো বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থায় গড়ে উঠেনি দেশে। তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’র ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড়ে খাদ্যশক্তির (ক্যালরি) ৬৫ শতাংশ আসে চাল বা ভাত থেকে। আর প্রতিদিন তারা খাবারের পেছনে যে অর্থ ব্যয় করে, তার ২৭ শতাংশ যায় চাল কিনতে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দাম বাড়লে গরিব মানুষ ভাত খাওয়া কমিয়ে দিতে হয়। ইফপ্রির জরিপে এর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে প্রতি কেজি চালের দাম ৩৮ টাকায় উঠেছিল। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রতি কেজি চাল ছিল ৩৬ টাকা। এরপর ২০০৯ সালে ধানের বাম্পার ফলনের পর দেশে চালের দাম কমতে থাকে। ২০১২ সালে প্রতি কেজি চাল ২৬ টাকায় নেমে আসে। ২০১৪ সালের পর চালের দাম আবারো বাড়তে থাকে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫