ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

রকমারি

সফল পাখি পালক দিনার

০৮ জুলাই ২০১৭,শনিবার, ১৫:৩৯


প্রিন্ট

সবচেয়ে ছোট খাচার পাখি হলো ফিঞ্চ। এই ফিঞ্চের অনেক নতুন এবং বিরল প্রজাতি ব্রিডিং করাতে সক্ষম হয়েছেন ফিঞ্চ সোসাইটি অব বাংলাদেশের হেড অব এডমিন মানিকগঞ্জের আবদুল হান্নান দিনার এবং পাখি নিয়ে এ প্রতিবেদনটি লিখেছেন আব্দুর রাজ্জাক

ইটকাঠের এই শহরে পাখির ডাক শুনে ঘুম থেকে জাগার সৌভাগ্য আমাদের অনেকেরই হয় না। আজকাল শহরে তেমন একটা পাখি দেখাই যায় না। গ্রামাঞ্চলের ঘরের কোনায় যে কয়টা দেশীয় পাখি দেখা যেত তাও আজ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। আমরা সবাই পাখির এই অভাবটা বেশ অনুভব করি। পাখির গুনগুনিয়ে গান করা কিংবা ওড়াউড়ির দৃশ্য আমাদের মনকে যেন প্রকৃতির আরো কাছে নিয়ে যায়। ষড়ঋতুর এই দেশে ঋতুর পরিবর্তনের সংবাদ এই পাখিই আমাদের প্রথম জানান দেয়।
পাখির প্রতি ভালোবাসা আর মমত্ববোধের টানে আমাদের দেশে শৌখিন পাখি পালকরা অনেক প্রজাতির পাখি পালন করে থাকেন। যেমন বাজরিগার, ডাভ, জাভা, লাভ বার্ড, ফিঞ্চ ইত্যাদি। এদের মধ্যে ফিঞ্চ প্রজাতি হিসেবে পাখিপ্রেমীদের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয়। রং-বেরঙের এবং বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের খাঁচার পাখি মানুষের শখ পূরণের পাশাপাশি হয়ে উঠছে বিনোদন, মানসিক প্রশান্তি লাভ আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম একটি উৎস। বর্তমানে শুধু পাখি পালনই নয়, বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উৎপাদন করছেন এ দেশের ব্রিডাররা। বিগত কয়েক বছরে এই সেক্টর অনেকটাই এগিয়ে গেছে দেশ। খাঁচার পাখি হিসেবে বাজেরিগার, ফিঞ্চ, থেকে শুরু করে লাভবার্ড, ককাটিল, জাভা, টারকুইজিন, রোজেলা, কনিউর, ইন্ডিয়ান রিংনেক প্যারোট, লরি ও লরিকিট, বিভিন্ন রকমের ঘুঘু, আফ্রিকান গ্রে প্যারোট, কাকাতুয়া, ম্যাকাও পর্যন্ত বহু প্রজাতির পাখি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
পাখিভিত্তিক বিভিন্ন জার্নালের তথ্য-উপাত্তে জানা গেছে, এদের মূল আবাসস্থল দক্ষিণ গোলার্ধ। দক্ষিণ গোলার্ধের সব স্থানেই হয়তো এদের দেখা যায়, তবে কিছু উপ-পরিবার সব স্থানে পাওয়া যায় না। যেমন একটি উপ-পরিবার কেবল নিওট্রপিক অঞ্চলে দেখা যায়, একটি দেখা যায় শুধু হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে এবং আরেকটি উপ-পরিবার শুধুই প্যালিআর্কটিক অঞ্চলে পাওয়া যায়। অবশ্য ফ্রিঞ্জিলিডি পরিবারের বাইরেও কিছু প্রজাতিকে সাধারণভাবে ফিঞ্চ নামে ডাকা হয়।
এত পাখির ভিড়ে সবচেয়ে ছোট যেটি সেটি হলো ফিঞ্চ, পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট খাঁচার পাখি। এই ফিঞ্চের অনেক নতুন এবং বিরল প্রজাতি ব্রিডিং করাতে সক্ষম হয়েছেন ফিঞ্চ সোসাইটি অব বাংলাদেশের হেড অব এডমিন মানিকগঞ্জের আবদুল হান্নান দিনার (ইউবি দিনার)।
শুরুর কথা
দিনারের পাখি পোষার হাতেখড়ি হয়েছিল তার বাবা আবদুর রউফের হাতে। ছোটবেলা থেকেই তারও শখ হয় নতুন পাখি পালন করবেন। পাখি পালার প্রতি তার আগ্রহ দেখে তার বাবা তাকে যথেষ্ট সুযোগ করে দেন। তবে দিনারের ফিঞ্চ বিপ্লবের কাহিনী বেশি দিনের নয়। এই তো বছর পাঁচেক আগের কথা। এর আগেও তিনি যথেষ্ট পাখি পুষেছেন কিন্ত ব্যাপক আকারে ফিঞ্চের ব্রিডিং শুরু করেছেন ওই পাঁচ বছর আগে থেকেই। তার বর্তমান ফিঞ্চের কালেকশন দেখলে যে কারোরই চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকে ইম্পোর্ট করা বেশ কিছু ফিঞ্চও আছে তার কাছে। সেই শখ থেকে দিনার মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করে ২০১২ সাল থেকে শখের বসে পাখি পালন শুরু করেন।
আবদুল হান্নান দিনার জানান, বাংলাদেশের পরিবেশ ফিঞ্চ পাখি উৎপাদনের জন্য খুবই ভালো। শুধু দরকার যথেষ্ট ধৈর্য, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং পাখির প্রতি ভালোবাসা। সেই সাথে প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্রের দাম কমানো, অ্যাভিয়ান সাপ্লিমেন্টের সরবরাহ, পাখির এবং পাখির খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্থিতিশীল রাখা।
ঢাকায় কাটাবনের মতো প্রায় সব বিভাগীয় শহরেই পাখির বাজার গড়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও পাখির হাট বসে। পাড়া-মহল্লায় পাখির দোকান চোখে পড়ে। বিভিন্ন বয়সের লক্ষাধিক মানুষ পাখি পালনের সাথে জড়িত। ছোট ছোট শিশুদের থেকে শুরু করে কিশোর, যুবক বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা এমনকি অবসরপ্রাপ্তরাও বাদ যাননি এই নেশা থেকে। গৃহবধূরা ঘর সামলান, আবার পাখিও পালন করেন। এ ছাড়া অনলাইনেও চলে পাখিসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান এবং বেচাকেনাসহ যাবতীয় কিছু। সঠিক পদ্ধতিতে ধৈর্যসহকারে ফিঞ্চ পালন করে উন্নত দেশগুলোর মতো সুষ্ঠুভাবে সবরকম ফিঞ্চের ব্রিডিংয়ে সফল হয়ে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে পরিচিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন আবদুল হান্নান দিনার।
বিরল প্রজাতির পাখির সংগ্রহশালার বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে তার কাছে প্রায় ২৫ প্রজাতির ফিঞ্চ রয়েছে, যেগুলো সংখ্যা শতাধিক। এদের মধ্যে রয়েছে করডোন ব্লিউ, পার্পল গ্রেনাডিয়াার, ওয়াক্সবিল, প্যারাডাইজ ওয়াইডাহ, মাস্কড গ্রাস ফিঞ্চ, বিভিন্ন ধগ্রণর জেব্রা, গোল্ডিয়ান, আউল, স্টার, প্যারোট, বেঙ্গলীজ ফিঞ্চ ইত্যাদি। এদের মধ্যে বেশ কিছু বাংলাদেশে একমাত্র দিনারই ব্রিডিং করাতে সক্ষম হয়েছেন, যেমন- ST Helena Waxbill/ Orange Cheeked Waxbill/ Purple Grenadier/ Crested Pearl Begolis Finch/ Chestnut Bengolis Finch/ Strawberry Finch.

ব্যবসায়িক দিক
পৃথিবীর ছোট্ট পাখিদের মধ্যে অন্যতম ফিঞ্চ। ঋরহপয শব্দটির অর্থ ছোট আকারের গানের পাখি। এ পাখি খুব অল্প জায়গায় স্বল্প খরচে পালন করা যায়। এই পাখির খাবার ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও তুলনামূলক খুব কম। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করলে প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতি জোড়া পাখি থেকে তিন থেকে ছয়টি বাচ্চা পাওয়া যাবে। প্রতি বছর এই পাখিবিষয়ক অনলাইনকেন্দ্রিক বিভিন্ন গ্রুপ সারা দেশে কম করে হলেও ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার ফিঞ্চ পাখি দেশের বিভিন্ন ফিঞ্চ পালকের কাছে বিক্রি করেন। পাখির জন্য প্রতি মাসে গড়ে খরচ হয় তাদের পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার মতো। প্রজাতিভেদে একেকটি ফিঞ্চ পাখির দাম ৫০০ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্তও আছে।
কোথায় পালন করবেন
প্রকৃতিতে ফিঞ্চ তিন-চার বছর বাঁচলেও খাঁচায় পর্যাপ্ত যত্ন নিয়ে এদের সাত থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব। এদের দৈহিক গঠন অনেকটা আমাদের চড়ুই পাখির মতো, প্রজাতিভেদে বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। দিনারের মতে, আকারে খুব ছোট হওয়ায় বাসার এক কোণে, সিঁড়িঘরে, বাড়ির ছাদে অথবা বারান্দায় ছোট্ট পরিসরে অনায়াসেই এই পাখি পালন করা যায়। উন্নত জাতের বা মিউটেশনের পাখি পালনের মাধ্যমে ভালো কোয়ালিটি সম্পন্ন বাচ্চা পাওয়ার কথা জানালেন তিনি। পাখির খাবারসহ পাখিসংক্রান্ত নানা জিনিসের চাহিদার তাগিদে রাজধানীর কাপ্তান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে পাখির মার্কেট। অনলাইনের পাশাপাশি এসব মার্কেটেও চলে বেচাকেনা। নতুন বা পুরাতন সব ধরনের ফিঞ্চ পালকদের তথ্যগত সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে ফিঞ্চ সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
দি ফিঞ্চ সোসাইটি অব বাংলাদেশ
অনলাইনে ফিঞ্চ কম্পিটিশন আয়োজনের পাশাপাশি ফিঞ্চ পালকদের যথাযথ দিকনির্দেশনা দিয়ে অনেক দিন ধরেই সাহায্য করে আসছে ‘দি ফিঞ্চ সোসাইটি অব বাংলাদেশ’ নামক ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপটি। এর হেড অব এডমিন আবদুল হান্নান দিনারের পাশাপাশি জুনায়েদ ইসলাম, চিন্ময় সেন, সানজীদ ইসলাম, মাসরিকুল ইসলাম সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন ফিঞ্চ সেক্টরকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং মানুষকে বন্য পাখি পালনে নিরুৎসাহিত করে খাঁচার পাখির প্রতি আগ্রহী করতে।
পাখির প্রতি ভালোবাসা খারাপ নেশা থেকে দূরে রাখতে পারে তরুণ প্রজন্মকে
‘দি ফিঞ্চ সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এর প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়- পাখির প্রতি ভালোবাসা খারাপ নেশা থেকে দূরে রাখতে পারে তরুণ প্রজন্মকে। তাই আপনার সন্তানকে একজোড়া পাখি কিনে দিন। এটি তাকে মানসিক প্রশান্তি দেয়ার পাশাপাশি অন্যান্য খারাপ নেশা থেকেও দূরে রাখবে। পাখির ওড়াউড়ি, ডাকাডাকি, খাওয়া-দাওয়া, ডিম পাড়া, ডিম ফোটানো, বাচ্চাকে খাইয়ে বড় করে তোলা এসবই খুব উপভোগ্য হবে আপনার সন্তানের সুস্থ বিনোদনের জন্য।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫