ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

গল্প

আরণ্যক সুরভী

ইদ্রিস মেহেদী

০৬ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৫:৫৫


প্রিন্ট

ইদানীং কথাগুলো ছোট্ট শহরের অলিগলিতে মুখরোচক বিষয় এবং আলোচিত হচ্ছে ঢের। কেই বলে ম্যাড, কেই বলে পাগল, কেউ বলে হাফ-ম্যাড। কেউ বলে ভূত, কেউবা বলে অশরীরী আত্মা। আবার কেউ কোনোরূপ মন্তব্য করতে উদাসীন।
অনেকেই বলে বেড়ায় ঘোর সন্ধ্যায় তারা ছোট পানসী করে আবছা আলোতে এক নারী মূর্তিকে নদী পেরিয়ে জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখেছে। অনেকেই নাকি দূর থেকে সাঁতরিয়ে নদী পার হওয়ার অস্পষ্ট শব্দ শুনেছে।
নানা মুনীর নানা মত। বিক্ষিপ্ত কথামালা নানামুখী হয়ে নানা বাঁক ও পথ ধরেছে। মন্তব্যগুলোর প্রায় সবটা এক বেকার যুবকের কানে পৌঁছতেই সে কৌতূহল বোধ করে। ভূত-প্রেত, দেও-দানব, অতি কথা কিংবা কোনো পৌরাণিক কাহিনীকে সে অর্থহীন ও অবান্তর মনে করে। তার বদ্ধমূল ধারণা আগুন মানেই আগুন। পানি মানেই পানি। আগুনের দাহ্যতাকে অস্বীকার কিংবা পানির তৃষ্ণা নিবারণ ক্ষমতাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অন্তত এই বিজ্ঞানের যুগে। তবুও বিজ্ঞান মানুষের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারেনি। সীমাবদ্ধতার অনিরুদ্ধ বেড়াজাল মানুষকে অবনত করতে বাধ্য করেছে স্রষ্টার নিগুঢ়তত্ত্বে এবং অনিবার্য অস্তিত্বে। এই সত্যাতিসত্য সূত্রকে মস্তক-কোষে ঢেলে বেকার যুবকের অনুসন্ধিৎসু মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে বহুল আলোচিত নারী কিংবা ছায়ামূর্তি।
দৃঢ়তার সুকঠিন ব্রতে দীক্ষিত হয়ে রহস্যের দ্বারোদঘাটনে নিজকে ব্যাপৃত করে। জীর্ণশীর্ণ বস্ত্র পরিহিত যুবক সন্ধ্যা নামার প্রাক্কালে বস্তি থেকে বের হয়ে পড়ে পুরনো এক টর্চ নিয়ে। কিছু জং ধরা তাতে। একটু জোরেসোরে চাপ লাগলেই উই আক্রান্ত ঢিবির মতো খান খান হয়ে ভেঙে পড়বে। ব্যাটারিও প্রায় শেষ। কিন্তু এটাই যুবকের অন্ধকারের সম্বল। পথ চলার অতি প্রিয় বস্তু।
শহর থেকে পাহাড় অভিমুখী নির্গমনের চিকন পথটিতে কয়েকদিন চক্কর দিয়েও কোনো আলামত পায়নি সে। তাহলে কি সবই গুজব। না তা কী করে হয়। সে-তো লজিক পড়েছে। কোথাও ধোঁয়া আছে মানেই সেখানে আগুনের উৎস বর্তমান। শুধু মূলের গভীরে যাওয়া চাই। কারণটাকে সম্মুখে রেখেই যুবকটি হাল ছাড়েনি।

শেষাবধি, নির্দিষ্ট ঐ পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাওয়ার জন্যে একদিন সে সাহসী এক বৃদ্ধ পানসী চালকের সাথে কথা বলে। চাচা মিয়া ঐ-যে দূরের পাহাড়টা দেখতে পাচ্ছেন, আমি ওখানে যেতে চাই। কত দিতে হবে? কেন বাবা, ওহানে যা-বা ক্যান? ওহানে মাইনষে যায় না। ম্যালা গুজব আছে কালিন্দা পাহাড় নিয়া। আপদ বালাই আইতে পারে। তয় আমার কোনো ডর-বয় নাই। পঞ্চাশ ট্যাহা দিলে যাইবার পারি।
আমি বেকার মানুষ। তিরিশ টাকার বেশি দিতে পারব না। বৃদ্ধ কী ভেবে রাজি হলো। বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকায় যুবক। তার বুকের ক্যানভাসে যেনো কোনো গুপ্ত কথা আর ছবি আঁকা আছে। সেসবের নিগুঢ়ার্থ উদঘাটন করতে করতে যুবকের মনে রাশি রাশি কথার ঢেউ ভেসে বেড়াচ্ছে। আর ভাবছে অ-নে-ক।
কালিন্দা পাহাড় অভিমান করে যেন শহরের অনতিদূরে। অথচ শাহুরিক সব খবরাখবর নদীর টলমল পানির সাথে মিশে আছে। আধুনিক জীবনের কৃত্তিম ঠাটবাট এখানে অনুপস্থিত। ধূসর জীবন বিধান এখানে শূন্যের কোঠায়। ওপরের নীলাকাশ আবরণে সবুজের বিস্তর প্রাচুর্য্যতা নিয়ে পাহাড়টি স্বাধীন ও স্বকীয়তার আনন্দে বিভোর। ছোট ছোট গাছ, গুল্ম, লতা-পাতা, নাম না জানা পাখ-পাখালির মিষ্টি মধুর কলতান নির্মল বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
এখানে ওজোন স্তরের বালাই নেই। নন্দন কাননের সুশীতল ছায়া না থাকলেও দূর থেকে সূর্য কখনো সেটা ফেলতে ভুল করে না। চাঁদ ও তার কোমল মমতা ঢালে না চাইতেই। এমন নিবাসে আদিবাসীরা হয়তো তাই পুণ্য শিশু ছিল।
সভ্যতার বিচিত্র বর্ণিল সম্ভার তখনো তাদের মনে ঘুণাক্ষরে স্থান পায়নি। পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালানোর পর্বটাও পরিপূর্ণভাবে রপ্ত হয়ে ওঠেনি। হয়তো তবুও তারা সভ্য ছিল। ছিল সুন্দরের মূর্ত প্রতীক। ক্ষুধা নিবারণের বাইরে চাহিদার অবান্তর পাখাগুলো ডানা মেলানোর সময় মেলেনি তখনো। এই নিভৃতালয়, ভোগ বিলাস অভিমুখী মানুষ স্বেচ্ছায় মেনে না নিলেও এক উম্মত্তা নারী এ যুগে কেন মেনে নিলো?
সহসাই যুবকের ভাবান্তর ঘটল বয়সী কাশে। আমরা আইসা গেছি। এখানে কোনো পথঘাট নেই। নাইমা পড়েন। কাল সকালে সূর্য ওঠার পরপর ঠিক এখান থেকে আমাকে নিয়ে যাবেন। বৃদ্ধ ঘাড় ডান দিকে একটু কাত করে সম্মতি জানাল।
যুবক পানসী থেকে জঙ্গলাবৃত পাহাড়ের এক কিনারে নেমে পড়ল। পৃথিবীতে এখনি সন্ধ্যার আগমন ঘটবে। চার দিকে নীরবতা তাকে দোলাতে থাকে। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভয় তাকে কিঞ্চিত নাড়া দিলেও সে অনড়। কিন্তু কোন দিকে এগোবে? অচেনা ঘন ঘাস। অদূরে ঝোপঝাড়ের পর কিছুটা ফাঁকা দেখা পেলেও এগোতে পারছে না।
হঠাৎ অপরিচিত জীবজন্তুর ডাকের মতো মনে হলো। তার কাছে মুহূর্তেই অনুভূত হলো এই মাত্র সে অজানা গ্রহে অবতরণ করেছে। টর্চের মৃদু আলোয় বিলি কেটে অতি সস্তপর্ণে সামনে এগোচ্ছে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে রাতের গভীরতার দিকে তার যাত্রা।
সামনেই জোনাকির আলোর মতো তার চোখে আছড়ে পড়ছে। থমকে দাঁড়াতেই পায়ের উপরিভাগে একটা চাপ অনুভব করে যুবক। বড় ধরনের কেঁচো মতো এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে পায়ের আঙুল পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। জোর করে সেগুলোর অপসারণ করতে লাগল। আর অস্ফুট বলল ভাগ্যিস কোনো সাপ বিছুতে কামড়ায়নি।
এ পাহাড়ের গভীরে কি কোনো বাঘ, সিংহ কিংবা মানুষ খেকো অজগর আছে? ভাবতেই তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
কিন্তু এ-কি! রাত্রির নীরবতা ফুঁড়ে ফুঁড়ে বহুদূর থেকে বাতাসে ভেসে আসছে কার করুন বিলাপ। তবে কি সেই নারী? অন্য কিছু তার মগজে ধরে না। উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকে বিলাপ উত্থিত স্থানে।
পাহাড়ের উঁচুতে উঠতেই বিশাল একটা ঝোপের সাথে ধাক্কা লেগে জীর্ণ টর্চটা হাত থেকে ছিটকে পড়ে। যুবক গড়াতে গড়াতে পড়ে গেল পাহাড়ের একেবারে নিচু এলাকায়।
সীমাহীন ক্লান্তি, কষ্ট আর দুর্ভোগের কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে এক সময় গভীর ঘুম তাকে নিয়ে গেল স্বপ্নের মায়াবী রাজ্যে।
নারী মূতির্টি তার নাক ছুঁই ছুঁই কাছে। মাথায় চম্পক আঙুলগুলো বোলাতে বোলাতে বলছেÑ তুমি এত অবুঝ কেন? মিছেমিছি শুধু আমার পশ্চাদনুসরণ করছ। আমি তো স্বেচ্ছায় নির্বাসিতা। শহরের কৃত্তিম পরিবেশ আমার ভালো লাগে না। এই দ্যাখো না, তুমি বেকার। তোমার পাশে দাঁড়ানোর কেউ ্েনই। কত মানবতাবর্জিত এই সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। মানবিক চেতনা ও দায়িত্ববোধ রহিত পারিপার্শ্বিকতা ভালে লাগে না বলেই আমি একা।
নীরবতায় কাটে কিছুটা সময়। স্বপঘোরেও বিরক্তির প্রকাশ থামলে কেন? বলো। খু-উ-ব ভালো লাগছে তোমার কথাগুলো।
নারীটি আবার কিছু বলার প্রয়াস নেয়। দেখো না, মানুষ মুখে ধর্মের কথা, রাজনীতির কথা, সমাজ বদলের কথা বলে। কিন্তু কার্যত কতটুকু তার প্রতিফলন ঘটে?
ধর্মের কথা বলতে বলতে বেহেশতি সুখে হাসে আবার দোজখের কষ্ট কল্পনা করে অশ্র“বির্জন দেয়। মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে হরহর করে বেরিয়ে আসে। অথচ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধ মানুষ, ক্ষুধার্ত শিশু আর বস্ত্রহীন নারীর প্রতি সামর্থ্যবান লোকদের দৃষ্টি পড়ে না।
রাজনীতিবিদদের চোখ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্ত্রাস লালন আর ভোটের তাঁবেদারিতে ব্যস্ত থাকে। বর্তমান যুগে সমাজ পরিবর্তনের কথা যারা বলে লোক দেখানো এবং পক্ষপাতিত্বের পাল্লাটাই তাদের বেশি ভারী।
নারীর কথাগুলো শুনতে শুনতে তন্ময় হতে থাকে যুবক। তার জ্ঞান ভাণ্ডারেও সঞ্চিত আছে এসবের কিছু কিছু। তবুও এ মুহূর্তে নারীর ললিত কণ্ঠনিঃসৃত বক্তব্যগুলো অশ্রুত মনে হ্েচ্ছ। এক ধরনের বিভোরতায় সে আচ্ছন্ন।
যুবকের ধুলা-ঝড় আক্রান্ত অসহায় জীবনে যেন এক রোদ্রকরোজ্জ্বল বসন্তের সকালে মুদুমন্দ বাতাস বইছে। সে দেখছে সুবিশাল বাগানের ঠিক মধ্যখানে বসে আছে। আর নাম না জানা অসংখ্য ফুল মাতাল গন্ধ ছড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে দুলছে।
যুবকটি ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, ছড়ানো সুগন্ধির উৎসমূল কোথায়? এ-কি নারীর শরীর থেকে নির্গত? পরখ করার জন্য অপেক্ষাকৃত কাছের একটি ফুল ছিঁড়ে নাকের কাছে নেয়।
কিন্তু কেমন অবাক কাণ্ড! ফুলে মোটেও গন্ধ নেই। এবার সে নিশ্চিত গুপ্তধন নারীতেই লুকিয়ে।
সবকিছু ভুলে যুবক অস্থির চিত্তে চেঁচিয়ে উঠে কে তুমি? তুমি কি স্বর্গ থেকে... আর বলা হয়ে ওঠে না।
জাগতিক চৈতন্য তাকে নাড়া দিয়েছে। মাথা ও বুকের সবটুকু স্থানজুড়ে এখন সে অনুভব করছে প্রচণ্ড ব্যথার যন্ত্রণা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫