ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

রকমারি

প্রতিষ্ঠার ৯৭ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সুমনা শারমিন

০৩ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৮:৪৪ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৮:৫৪


প্রিন্ট

প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষা, গবেষণা ও জাতীয়ভাবে অবদানের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান শীর্ষে ধরে রেখেছে। দেশের বহু জ্ঞানীগুণী, পণ্ডিত, শিল্পী-সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদের জন্ম হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এ ছাড়া এ দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে স্বাধীন জাতিসত্তা বিকাশের লক্ষ্যে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ব্রিটিশ ভারতে তৎকালীন শাসকদের অন্যায্য সিদ্ধান্তে পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতিবাদের ফসল হচ্ছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ববঙ্গ শিক্ষাদীক্ষা, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর এ অবস্থার খানিকটা পরিবর্তন হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকার স্থানীয় মুসলিম নেতারা বিশেষ করে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ।

=================

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস

১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত শনিবার ৯৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। পতাকা উত্তোলন, পায়রা উড়ানো, কেক কাটা, সঙ্গীত, শোভাযাত্রা, গবেষণা ও আবিষ্কার-বিষয়ক প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে উদযাপিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০১৭। প্রতিষ্ঠার ৯৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ক্যাম্পাসকে সাজানো হয় মনোরম সাজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও হল আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। সকাল সোয়া ১০টায় প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন চত্বরে জাতীয় পতাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোর পতাকা উত্তোলন এবং উদ্বোধনী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়।
এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘উদ্ভাবন ও উন্নয়নে উচ্চশিক্ষা’। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। আরেফিন সিদ্দিক সবাইকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় সময়ের চাহিদা পূরণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠন বর্তমান সময়ের একটি চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

=====================

১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট এবং ওই বছরের ডিসেম্বর মাসেই সেটি অনুমোদিত হয়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভা পাস করে দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০। সৃষ্টির শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। কলকাতার তৎকালীন একটি শিক্ষিত মহল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। এ ছাড়া ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ হতাশা প্রকাশ করে।
১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানান। ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এ বিলে সম্মতি দেন। এ আইনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। এ আইন বাস্তবায়নের ফলাফল হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয় ১৯২১ সালের ১ জুলাই।
ওই সময়ে ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর পূর্ববঙ্গ, আসাম প্রদেশের পরিত্যক্ত ভবনাদি এবং ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনগুলোর সমন্বয়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার এই দিনটি প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
শুরুতে তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারসি ও উর্দু, দর্শন, অর্থনীতি ও রাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও আইন।
প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষকসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অস্থিরতা ও ভারত বিভক্তি আন্দোলনের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা কিছুটা ব্যাহত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়Ñ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের আশা উজ্জীবিত হয়। তৎকালীন পূর্ববাংলার ৫৫টি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৪৭ থেকে ’৭১ সময়ের মধ্যে পাঁচটি নতুন অনুষদ, ১৬টি নতুন বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা।
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্যার পি জে হার্ট। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ২০০৯ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ২৭তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৩টি অনুষদ, ৮৩টি বিভাগ, ১২ ইনস্টিটিউট, ৫৬টি গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র, ২০টি আবাসিক হল ও তিনটি হোস্টেল রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩৭ হাজার ১৮ জন। পক্ষান্তরে শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন এক হাজার ৯৯২ জন। কর্মকর্তা আছেন এক হাজার ৩০ জন। এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আছেন যথাক্রমে এক হাজার ১৩৭ ও দ্ইু হাজার ২৫০ জন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫