ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

ঐতিহ্যের কারুশিল্প

শওকত আলী রতন

০৩ জুলাই ২০১৭,সোমবার, ১৭:৩৬


প্রিন্ট

আমাদের কারুশিল্পের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে কারুশিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্র্ণ। কারুশিল্পের কল্যাণেই বিদেশে একসময় বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল সেরা মানের শিল্পের দেশ হিসেবে। এজন্য আমাদের এক গৌরবময় অতীত ছিল।
এ শিল্পের ভাণ্ডারও ছিল অনেক সমৃদ্ধশালী। কারুশিল্পের বিশাল ভাণ্ডারে রয়েছে জামদানি, বেনারসি, কাতান, খদ্দর কাপড়, ঢাকাই শাড়ি, রেশমের তৈরি কাপড়, নকশি কাঁথা, কম্বল, শতরঞ্জি, অলঙ্কার, ধাতব শিল্প, সুতি শিল্প, রঞ্জন শিল্প, শঙ্খ শিল্প, মৃৎ শিল্প, চামড়া শিল্প, ঝিনুক শিল্প, পিতল-কাঁসা শিল্প, বাঁশ-বেত শিল্প, শোলা শিল্প, বিয়ের সাজ ইত্যাদি। বেঁচে থাকার তাগিদে যুগ যুগ ধরে এর শিল্পীরা বুননশৈলীর মাধ্যমে এসব শিল্প-সম্পদ তৈরি করেছে কারুশিল্পীরা। আমাদের দেশে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলাকে কেন্দ্র এক সময় এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে সারা দেশে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঘরের শোভাবর্ধনের জন্য এসব পণ্য সংগ্রহ করতে গ্রামীণ মেলার অপেক্ষায় থাকত ক্রেতারা সাধারণ। একটা সময় প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে আধুনিক জিনিসপত্র ব্যবহারের কারণে কদর কমে যায় এসব। তারপরও নানা প্রতিকূলতাকে উপক্ষো ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন এর সাথে জড়িত শিল্পীরা।
এ দেশীয় সংস্কৃতির শিল্পের প্রসারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন বছরের বিভিন্ন সময়ে আয়োাজন করে থাকে গ্রামীণ মেলার। এ গ্রামীণ মেলাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে সারা দেশ দেশ থেকে বিভিন্ন কারুশিল্পীরা। দেশের প্রতিষ্ঠিত সব কারু শিল্পীদের তৈরি জিনিসপত্র স্থান পায় এসব মেলায়।

মৃৎশিল্প
মাটির তৈরি রাজশাহীর শখের হাঁড়ি একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দিন ধরে শৌখিন মানুষের চাহিদা অনুযায়ী রঙ-বেরঙের রকমারি জিনিসপত্র সরবরাহ করছে। কারিগরদের নিপুণ হাতের কারুকার্যে ও রঙতুলির ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ জিনিসপত্র হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। মাটির তৈরি পাখি, কলস, হাঁড়ি, ঘোড়া, হাতি, বাঘ ও ঘর সাজানোর নান্দনিক সব জিনিসের সমাহার এখানে। তাই শৌখিন মানুষের কাছে অনেক আগে থেকেই বেশ জনপ্রিয় একটি নাম। শৌখিন মানুষজন মাটি দিয়ে তৈরি এসব পণ্যের ওপর রঙ ও কারুকার্যের মাধ্যমে ক্রেতাদের নজর কাড়ে। এখানে ঘর সাজানোর বিভিন্ন উপকরণ ও ছোটদের খেলনাসামগ্রীর সমাহার রয়েছে। কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সুশান্ত কুমার পালের সাথে। তিনি জানান, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুরই। মৃৎশিল্পের ব্যবহার নেই বললেই চলে, তবে আমরা শৌখিন জিনিসপত্র তৈরি করায় এর চাহিদা একেবারে ফুরিয়ে যায়নি।
হয়ত এগুলোর চাহিদার যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে থেকে যাবে। তিনি জানান, এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। তা না হলে অন্যান্য শিল্পের মতো হারিয়ে যাবে এ শিল্পটি।

শোলা শিল্প
শোলা বাংলাদেশের অন্যতম লোকজ শিল্প। শোলার তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে অনেকের চলছে জীবন-জীবিকা। মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার শতপাড়া গ্রামে ৮-১০টি পরিবার এ শিল্পের সাথে জড়িত। আগে এ গ্রামের ১৫-২০টি এ কাজ করত। এ সম্প্রদায়ের লোকজন সবাই কমবেশি শোলার কাজের সাথে সম্পৃক্ত। বংশগত ঐতিহ্যের কারণে অন্যরা এ পেশা ছাড়তে পারছেন না। শোলা দিয়ে তৈরি করেন ফুল, পাখি, মালা, তাজমহল, মুকুট ও টুপিসহ বাহারি রঙের নানা খেলনা, পূজা এবং বিয়ের সরঞ্জাম। বিয়ে, পূজা ও মেলার সাথে মালাকারদের জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক।
তারা এগুলো সোনারগাঁও, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় মেলায় নিয়ে বিক্রি করেন। আবার অনেকেই এসব উপকরণ পাওয়ার জন্য অগ্রিম ফরমায়েশ দেয়। মাগুরার নিমাই মালাকার শোলার শিল্পকর্ম নিয়ে জানান, বাপ-দাদার পেশা হিসেবে এ শিল্পের সাথে জড়িত। নিজস্ব সংস্কৃতিতে বাঁচিয়ে রাখতে অনেকে অনেক বড় বড় আশ্বাস দেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এ পেশার মানুষজনের দিন কাটে অনেক কষ্ট করে। এ পেশা থেকে সামান্য যা আয় হয় তা দিয়ে চলে সংসার। পাশাপাশি আমাদের কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করতে হয়। সরকার আমাদের কোনো ধরনের সুযোগ সুধিবা দেয় না। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে এক সময় আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাবে এ শিল্পও।

কাঠের শিল্প
কুষ্টিয়ার এতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান লালন নগর কুটির শিল্প তাদের নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করছে বিভিন্ন শৌখিন সামগ্রী। কাঠের ওপর শৈল্পিক কারুকার্যে ও রঙের ব্যবহারে এ শিল্পটি হয়ে ওঠে ছোট-বড় সবার কাছে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। গ্রামীণ মেলাগুলোতে এ ধরনের পণ্যের চাহিদা থাকায় দেশের প্রসিদ্ধ গ্রামীণ মেলাগুলোতে প্রতিষ্ঠানটি অংশগ্রহণ করে থাকে। লালন নগর কুটির শিল্প এ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ দিন নিখুঁতভাবে তৈরি নানা ধরনের পাখি, মাছ, সাপ, কুমির, শেয়াল, বাঘ, হাতি, ঘোড়া ও গরুসহ অর্ডারে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি করে থাকে। কুমারখালী কুষ্টিয়ায় রয়েছে তাদের নিজস্ব দোকান। সারা দেশের লালন ভক্তদের জন্য তৈরি করে থাকে ঢোল, বাঁশি, খঞ্জনি, একতারা, দোতারাসহ আরো নানা পণ্যসামগ্রী। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আলাউদ্দিন আলমিন বলেন, শৌখিন মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই কাজ করতে লালন নগর কুটির শিল্প। একশ্রেণীর মানুষের কাছে এ শিল্পের কদর আজীবন থেকে যাবে।
কাঁচামালের সল্পতা, চাহিদা কমে যাওয়া, প্রয়োজনীয় উপাদানের মূল্যবৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের বিভিন্ন হস্তশিল্প। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। একই সাথে সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে এই সমৃদ্ধ শিল্পগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য। যুগ যুগ ধরে আমাদের ঐতিহ্য হিসাবে টিকে থাকা এসব শিল্প ও এর সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষদের কথা চিন্তা করে আমাদের সবারই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। কারণ ঐতিহ্যের মাঝেই টিকে থাকে কোন জাতির সমৃদ্ধির ইতিহাস।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫