ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

নারী

গীতা এখন ডাক্তার দিদি

০২ জুলাই ২০১৭,রবিবার, ১৮:৩০


প্রিন্ট

গীতার মতো দুর্ভাগ্যের শিকার হন আমাদের সমাজের অনেক নারী, কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে পারেন না। সারা জীবন কাটে কষ্ট ও যন্ত্রণায়। গীতা রানী ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। পরিশ্রম আর চেষ্টায় নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই তৈরি করেছেন। তাই গীতা রানী হতে পারেন সমাজের অবহেলিত অনেক নারীর প্রেরণা। এসব নিয়ে লেখাটি তৈরি করেছেন আব্দুর রাজ্জাক

আমাদের সমাজে এমন অনেক মেয়ে আছেন, যারা শ্বশুরবাড়ি থেকে বিভিন্ন প্রতারণা আর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসেন। মানুষের নানা কথার জন্য তাদের বেঁচে থাকাই দুরূহ হয়ে ওঠে, তেমনি একজন মানিকগঞ্জের বেতিলা ইউনিয়নের মিতরা গ্রামের মেয়ে গীতা রানী (২২)। নবম শ্রেণীর ছাত্রী গীতাকে বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে চলে যেতে হয় শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু বিধিবাম, হাতের মেহেদির রঙ শুকাতে না শুকাতেই শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে আসতে হয় স্বামী-শাশুড়ির মারধর, অন্যায় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে।
এর পরের গল্প তার মুখেই শোনা যাক, ‘বাবা-মায়ের সাথে বাঁশ-বেতের কাজ করতাম। কৃষি কাজ করতে গিয়ে কৃষকেরা যে মাথাল ব্যবহার করেন সেগুলো বানাতাম। ছোটবোন পুষ্পর সাথে প্রতিযোগিতা করে কাজ শিখতাম। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর মা বাঁশের কাজ ছেড়ে দিলেন। কিছু দিন পর মিতরা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে জালিব্যাগ সেলাই কাজে গেলাম, সেখানে পরিশ্রম অনুযায়ী বেতন নেই।’ গীতা আরো বলে, ‘আমার বড় দাদার বন্ধুর মা একজন ভালো দাঁতের ডাক্তার। তার কাছে আমাকে কাজ শিখতে দিলেন। প্রথমে খুব কষ্ট হতো। তবে আমার মনে একটাই প্রতিজ্ঞাÑ এখানে যখন এসেছি কাজ শিখে বের হবো। যতই কষ্ট হোক না কেন! খাওয়াদাওয়ার কষ্ট তো ছিলই, সাথে বাড়ির সব কাজ করতে হতো। তার মধ্যে বকা আর গালাগালি তো উপরি পাওনা। কখনো মনে হতো বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু হাল ছাড়েননি গীতা। তিন বছরের ডেন্টাল কোর্স সমাপ্ত করে সফল হন তিনি।
গীতার পড়াশোনার চেয়ে হাতের কাজের দিকে ঝোঁক বেশি ছিল। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিকের নারী উন্নয়ন দিদি, বড়দা, মা বলত বিয়ের কথা ভাবতে হবে না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাদের কথায় কিছুটা সাহস পেতাম। আমিও মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিলাম যতই কষ্ট হোক আমাকে নিজের চেষ্টায় একটা কিছু হতে হবে। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর পাড়া-পড়শি, আত্মীয়স্বজন বলাবলি করত জামাই বাড়ির ভাত জোটেনি, সন্তানের মুখ দেখিসনি, অলক্ষ্মী, অপয়া। তোকে আর কে বিয়ে করবে? চিরদিন বাপ-ভাইয়ের ঘারে বসে খাবি। আরো অনেক বাজে কথা। তাদের কথা চিন্তা করলে রাতে ঘুম আসত না। এসব চিন্তা করে আবার ফিরে যেতাম সেই ম্যাডামের বাড়ি। সেখানে কাজ শিখতে তিন বছর লাগে। এরপর শুরু হলো গীতার নতুন জীবন। ডাক্তার গীতা রানী দাস।
গীতা এখন পরিবার ও সমাজের গর্ব : আজ তার পারিবারকে সমাজ আলাদাভাবে সম্মান দেয়। গীতা রানী বলেন, ‘এখন পাড়া-পড়শিরা আর কানাকানি করে না। সবাই দাঁতের ডাক্তার বলে। নিজের ফার্মেসিতে বসি। দাঁতের চিকিৎসাও করি। যেমনÑ দাঁত তোলা, ফিলিং করা, দাঁত বাঁধানো, কোন সময় কী ওষুধ খেতে হবে ইত্যাদি। সিঙ্গাইর বাসস্ট্যান্ডে আমার চেম্বার ও ওষুধের দোকান। দোকানে বসলে দু-তিন হাজার টাকা আয় হয়।’ অভিভাবকেরাও এখন ভালোভাবে কথা বলেন। পাড়া-পড়শি, আত্মীয়স্বজনের দাঁতের কোনো সমস্যা হলে আমার কাছে আসেন পরামর্শ নিতে। এখন আর কেউ আমাকে অপয়া বলে না। যারা আমাকে দেখে একদিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারাই আসে নানা বিষয়ে পরামর্শ নিতে। আমাদের পাড়া থেকে দু’জন বৌদি এসেছিলেন জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পরামর্শ নিতে। তাদের বললাম পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে যাওয়ার জন্য। সমাজের লোকজন আমাকে মূল্য দিচ্ছেÑ তাতেই আমি খুশি।
স্বপ্ন এখন আকাশসম। গীতা দাস একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বামীর সংসার করবেন, সংসারী হবেন; কিন্তু এখন তার স্বপ্ন হলোÑ তিনি আর সমাজ সংসারে অবহেলার পাত্র হবেন না। বোঝা হয়ে থাকবেন না কারো। গীতা বলেন, ‘আমি আর বিয়ে করতে চাই না। ইতোমধ্যে কয়েকটি সম্বন্ধ এসেছে। আমি না করে দিয়েছি। পুরনো কথাগুলো এখনো মনে দাগ কেটে আছে। গীতা এখন স্বপ্ন দেখেন তার পরিবার ও সম্প্রদায়কে নিয়ে। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি একজন আত্মনির্ভরশীল নারী হয়ে বাঁচতে চান। গীতা ভবিষ্যতে এ পেশাকে আরো বড় করতে চান। আপ্রাণ চেষ্টায় স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে চান। তিনি তার স্বপ্ন আরো বিস্তৃত করেছেনÑ ‘আমাদের মনিদাস সম্প্রদায়ে যেসব নারী, কিশোরী অবহেলিত ও নির্যাতিত; তাদের এগিয়ে নিতে পারলে আমাদের জনগোষ্ঠী আর পিছিয়ে থাকবে না। তারা সমাজে নিজের ও পরিবারের অধিকার আদায় করতে পারবে।’ গীতার চাওয়া হচ্ছে প্রতিটি পরিবার থেকে যেন তার মতো মেয়েরা ঘরে না বসে নিজের পায়ে দাঁড়ায়। গীতা নিজের মেধা, উদ্যোগ আর আগ্রহ দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সেসব নারীকে দেখিয়ে দিয়েছেন আমরাও পারি নিজের পরিবার, দেশ ও জাতির জন্য কিছু করতে। ছেলেদের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫