ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

নীল পাঞ্জাবির অতীত

জোবায়ের রাজু

০১ জুলাই ২০১৭,শনিবার, ১৫:৫৬


প্রিন্ট

শিশির ঈদের কেনাকাটা করে বাসায় এসে আনন্দে হইচই কাণ্ড বাধিয়ে দিলো। বাবার জন্য এবার সে ঈদে যে পাঞ্জাবিটা কিনেছে, সেটা নাকি মার্কেটের সবচেয়ে দামি পাঞ্জাবি। আমার কাছে এসে আনন্দ মাখা কণ্ঠে বলল- ‘আব্বু, পাঞ্জাবিটা তোমার পছন্দ হবে। আমার বন্ধুরাও পছন্দ করেছে।’
ছেলের কাণ্ড দেখে আমি নিজে নিজে হাসি। প্রতিবার ছেলেটি আমার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেয় ঈদের কেনাকাটা করবে বলে। একমাত্র ছেলের অনুরোধ ফেলতেও পারি না আমি।
নিজের কেনাকাটা শেষ হলে সে আমার জন্য পাঞ্জাবি কিনবেই। কয়েক বছর ধরে ছেলের এমন পাগলামি স্বভাব দেখে আসছি। পাঞ্জাবির প্রতি সেভাবে আমার কোনো আকর্ষণ না থাকলেও শিশিরের কেনা পাঞ্জাবিগুলোতে সত্যিই আমি মুগ্ধ হই। আমার ছেলের রুচিবোধ বেশ উন্নত।
রাতে শাহানা বলল- ‘ছেলেটা তোমার জন্য পাঞ্জাবি কিনেছে, একটু ধরেও দেখলে না।’ তারপর আমাকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শাহানা একটা ঝকঝকে শপিং ব্যাগ থেকে বের করে আনল দৃষ্টিনন্দন এক নীল পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির নকশী পুঁথি-পাথরের কারুকার্য আর রেশমি সুতার আল্পনায় বোনা আধুনিক মেশিনে সজ্জিত পুরো নীল পাঞ্জাবিটা যে কারোরই চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। কিন্তু এই দামি নীল পাঞ্জাবির মধ্য দিয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি আমার বিগত দিনের এক বেদনাবিদুর দৃশ্য। না, আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে না, বরং চোখ ভিজে উঠছে। শৈশবের বেদনার সেই নীল পাঞ্জাবি আমার চোখে পানি নিয়ে এলো।
সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আজকের এই আমি উঠে এসেছি খুবই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’- দিন পার করেছি আমরা। ঈদে জামা কেনার কথা আমরা ভাবতেই পারতাম না। বলহীন পায়ে রিকশার প্যাডেল চাপানো আমার পুষ্টিহীন বাবার অভাবের সংসারের রোজকার চিত্র ছিল খুবই করুন।
প্রতিবার ঈদ আসত। পুরাতন জামা পরে আমরা পাঁচ ভাই বোন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ঈদ বিকেলে দেখতাম পাশের বাড়ির অর্থশালী আলতাফ মিয়ার ছেলেদের গায়ে জড়ানো মোটা অঙ্কের নজর কাড়া দামি দামি ঈদের জামা। আমার চোখ ভিজে উঠত।
কোনো এক ঈদ। বাজারের চয়েজ ফ্যাশনে ঝুলে আছে একটি নীল পাঞ্জাবি। আমার চোখ আটকে গেল। এমন সুন্দর নীল পাঞ্জাবি আমি জীবনেও দেখিনি। বাবার কাছে বায়না ধরলাম- ‘ওই পাঞ্জাবিটি আমার চাই’। বাবা নিরুত্তর। আমাকে বোঝালেন। কিন্তু কিশোর সেই আমি অবুঝ। ওই নীল পাঞ্জাবি কেনার টাকা আমার বাবার ছেঁড়া পকেটে নেই, এটা আমি কোনোভাবেই বুঝতে নারাজ।
বাবা আমার কচি হাত ধরে নিয়ে গেলেন চয়েজ ফ্যাশনে। দোকানের কর্ণধার নিজাম মিয়া নীল পাঞ্জাবির দাম শোনাতেই বাবা টাশকি খেলেন। এত টাকা! এত টাকা যে তার নেই।
মলিন মুখে বাবা আমাকে নিয়ে চয়েজ ফ্যাশন থেকে বের হলেন। ততক্ষণে নীল পাঞ্জাবির লোভে আমার গলা ফাটানো কান্না সহ্য করতে না পেরে বাবা গায়ের সব শক্তি দিয়ে আমাকে কষে চড় দিলেন। ঘাড় ধরে নিয়ে এলেন আমাদের জীর্ণ বাড়িতে।
চড় খেয়ে টনটন করা গালের ব্যথা নিয়ে সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে দেখলাম বাবা উঠোনের পাশে জামরুল গাছের তলে মন খারাপ করে বসে আছেন। নীল পাঞ্জাবি না পাওয়ার বেদনা নিয়ে বিছানায় গা হেলিয়ে দিতেই ঘুম নেমে এলো চোখে।
ঘুম ভাঙল অনেক রাতে। দেখি বাবা আমার শিয়রে বসে আছেন। হাতে নীল পাঞ্জাবির প্যাকেট।
ওমা! এটা তো চয়েজ ফ্যাশনের সেই নীল পাঞ্জাবি। বাবা আমার জন্য কিনে এনেছেন? কিন্তু টাকা পেলেন কোথায়? মা বিনীত গলায় বললেন- ‘এত দামের পাঞ্জাবি, টাকা পাইছো কই?’ বাবা নিরুত্তর। ভয়ার্ত চোখে দরজার দিয়ে তাকিয়ে বাবা বললেন- ‘দুয়ার ভালোভাবে লাগিয়ে দাও।’ আমার অন্য ভাই বোনেরা কাতর চোখে নীল পাঞ্জাবির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের কারোর জন্য ঈদের জামা কেনা হয়নি।
পরদিন ভোরবেলা। দুয়ারে টোকা পড়ল। বাবা দুয়ার খুলতেই চমকে উঠলেন চয়েজ ফ্যাশনের নিজাম মিয়াকে দেখে। নিজাম মিয়ার তেজী চোখের ঈশারায় বাবা ঠকঠক কাঁপছেন। ঘটনা কী!
নিজাম মিয়া বাবার শার্টের কলার চেপে ধরে ভারি গলায় বললেন- ‘তুই আমার দোকানের পাঞ্জাবি চুরি করছিস?’ তারপর সাত সকালে ঘুম ঘুম চোখে আমরা দেখলাম নিজাম মিয়া বাবাকে এলোপাতাড়ি কিল ঘুষি মেরে সেই নীল পাঞ্জাবির প্যাকেট নিয়ে প্রস্থান করতে বিলম্ব করলেন না।
আতঙ্কে আমরা সব ভাইবোনেরা যখন এই ঘটনায় দিশেহারা, মা তখন চিৎকার করে কেঁদে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- ‘তুমি চুরি করেছো?’
হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো বাবাকে। তিন দিন পর ঈদ। বেসরকারি হাসপাতালের অতি সাধারণ চিকিৎসায় বাবা সুস্থ হলেন না। ঈদের দিনে ভোর বেলায় বাবা হাসপাতালে চুপচাপ মারা গেলেন।
২.
সেই বেদনাবিদুর দিন পার করে আজ আমরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত। গাড়ি বাড়ি সব আছে আমাদের।
আমার স্ত্রী শাহানা বলল- ‘এত গভীর ধ্যানে কী ভাবছো?’ নিরস গলায় বললাম- ‘এক খণ্ড অতীত।’ বিস্মিত কণ্ঠে সে বলল- ‘অতীত?’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম- ‘হ্যাঁ। একটি নীল পাঞ্জাবির অতীত।’
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫