ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

শৈশবের ঈদ

ছাবিকুন নাহার

০১ জুলাই ২০১৭,শনিবার, ১৫:৫৩


প্রিন্ট

যখন ছোট ছিলাম, তখন রমজানের চাঁদকেই ঈদের চাঁদ মনে হতো। কারণ একটা মাসই তো ভাবতাম দেখতে দেখতেই কেঁটে যাবে। সত্যিই তখন কে কয়টা সিয়াম রেখেছে, কে কত পারা কুরআন পড়েছে এই হিসাব করতে করতেই রমজানের প্রায় শেষ চলে আসত। সবার কাছেই রমজানের শেষ দশ দিন স্বাভাবিকভাবে কেটে গেলেও আমার ছিল ভিন্নতা। কারণ, সারা বছর তো কোনো মেহমান আসতই না! তবে রমজানের শেষ দশ দিনের যেকোনো দিন ছোট মামা আসবে। এই খুশি কি আর মনে রাখার মতো? সারাটা দিন অপেক্ষা করতাম কখন মামার মোটরসাইকেলের শব্দশোনা যাবে! মামা আসবে... খেজুর আনবে, মিষ্টি আনবে, আমার জন্য দামি একটা কাপড় আনবে, সবই যেন স্বপ্ন হয়েই থাকত। কেনা জামা আমার খুব পছন্দ ছিল! কিন্তু, এতগুলো ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ বহন করতেই আব্বা হিমশিম খেতেন, তাতে আমার নতুন জামা....!!
মাঝে মাঝে মনে হতো, মামা যদি কাপড় না এনে আমার জন্য একটা জামা কিনে আনত...! কিন্তু, প্রতি বছরের ব্যতিক্রম কিছুই হতো না। মামা আসতেন যা কামনা করতাম তা নিয়েই। তবুও ভালো, আমাদেরও মামা আসে সবার মতোই! তারপর একে একে রমজানের সব সিয়াম কেটে যেত। তখন থেকেই ঈদের একটা অংশ মেহেদিপাতা খোঁজা শুরু করতাম। এ-বাড়ি ও-বাড়ি কত বাড়িই না গিয়েছি মেহেদি পাতার জন্য। কখনো কেউ দয়া করে দিয়েছে, আবার কখনো খালি হাতেই বাড়ি ফিরেছি। ঈদের আগের রাতটা যেন পোহাতেই চাইত না। হাতে বাটা মেহেদি দিয়ে ঘুমিয়ে পরি পরি ভাব হলেও ঘুম আসত না! কারণ আব্বা ‘ঈদের বাজার’ থেকে লাল কাচের চুড়ি, নেলপালিশ, আপুর জন্য ফিতা, কাজল আর দর্জির দোকান থেকে গজ কাপড়ে বানানো জামাটা নিয়ে আসবেন। কত খুশি... কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা না দেখেই ঘুমাতে হতো। আব্বা অনেক দেরি করে বাজার থেকে ফিরতেন। সকালবেলা যখন ঘুম থেকে উঠতাম আম্মা কুরআন পড়ছেন। লাফ দিয়ে উঠে হাতের মেহেদির কার কত রং হয়েছে দেখেই সোজা আলমারির সামনে। আমাদের ঘরে দাদার আমলের পুরনো একটা বড় আলমারি ছিল। আর ওইখানেই আব্বা ঈদের বাজার রাখতেন। সব দেখে আবার লুকিয়ে রাখতাম। যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে তো ঈদ চলে যাবে। তারপর সেমাই খেয়ে বরাবরের মতোই কসকো সাবান দিয়ে গোছল। দাদু (মেঝো ভাইয়া) ঈদে সবসময় কসকো সাবান আনত। এটা যেন ছোটখাটো একটা নিয়মই হয়ে গয়েছিল। এভাবেই কেটে যেত ঈদের সকালটা। দুপুরে সিনেমার আড্ডা। ঈদের দিন থেকে পরবর্তী সাত দিন পর্যন্ত বিটিভিতে একনাগারে ছায়াছবি দিত। আর ঈদের দিন টিভি দেখলে কেউ কিছু বলত না বলে সারা দিন টিভির সামনেই কেটে যেত। কারেন্টও থাকত বেশ। রাতে একটু ঘোরাঘুরি দৌড়াদৌড়ি দিয়েই ঈদের আমেজটা শেষ করতাম।
আর এখন....
আমরা বেঁচে আছি! আর বললেও হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না যেই মেয়েটা কেনা জামার জন্য এত পাগল ছিল সেই মেয়েটার কেনা জামায় এখন ওয়ারড্রপ ভরা! এখন আর এসব ভালো লাগে না তার। যেই জিনিসটা এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে সেটা হলো- ঢাকা থেকে কেউ আসার আনন্দটা। সত্যিই ভাবতেই যেন কেমন লাগে ঢাকা থেকে মেঝো ভাইয়া আসবে, নোয়াখালী থেকে ছোট ভাইয়া আসবে...! অনেক পরিবর্তন ঘটেছে আমাদের। আর মেহেদি পাতা? সে তো তার ফুলের গন্ধে এখন আমাকে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে। জানালার পাশের বড় মেহেদি গাছে সে কী পাতা... ভারে যেন নুয়ে পড়েছে গাছটা! কিন্তু দিতে ইচ্ছে করে না। গাছের পাতা মেহেদি বেটে দেয়া তো দূরের কথা প্রত্যেক ভাইয়া একেকটা টিউব মেহেদি এনে হালিতে পরিণত করে ফেলে, তবুও আল্পনা ওঠে না হাতে। এখন আর বাবার চুরি, ফিতা আনার প্রশ্নই আসে না! কারণ, বাবা আমাদের মাঝে নেই। আল্লাহর ডাকে চলে গেছেন অনেক দূরে।
নতুন সব আসবাবের ভিড়ে আলমারিটারও আর ঠাঁই হয়নি ঘরে! হবেইবা কেন?
ঈদগুলো আর আগের মতো হয় না! সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে গেছে আমাদের সমাজ। আরো পরিবর্তিত হয়ে গেছে আমার মনটা।
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫