ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

ঈদ ও উপোসভীতি

মো: মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া

০১ জুলাই ২০১৭,শনিবার, ১৫:৩৩


প্রিন্ট

কৈশোরে আটপৌরে গতানুগতিক ঈদ উৎযাপন ভালো লাগছিল না। পাঁচ ভাই দুই বোনের বড় সংসারে কেরানি বাবার সৎ আয়ে সব স্কুল, কলেজগামী সন্তানদের বড় সংসারটি তখন বাবা কায়ক্লেশে টেনে নিচ্ছিলেন। পুরনো জামা ও লুঙ্গি ধুয়ে বালিশের নিচে ইস্ত্রি হওয়ার জন্য রেখে দেয়া, মায়ের পোষা দু-তিনটি মোরগ জবাই করে গোশত রাঁধা আর খিচুড়ি, রাতে নানান সেমাই রান্না হতো ৮-৯টার মধ্যে ঈদের জামায়াতের জন্য বর্ণিল পোশাক পরে ঈদগাহে সব ভাই ও বাবা নামাজ আদায় করতাম। ছোটদের পরিচিত বিশেষ কেউ থাকত না, বড়রা কোলাকুলি করতেন। আমরা কেমন জানি লাজুক অভিব্যক্তিতে তাকিয়ে থাকতাম। বাসায় এসে খিচুড়ি খেতাম মুরগির গোশত দিয়ে। ধনী পড়শিদের ছেলেমেয়েরা রমজান মাস আসতেই দরজিপাড়ায় ছোটাছুটি করত। তাদের কাপড় পছন্দ হয় অনেক খোঁজাখুঁজির পর, এরপরে দর্জির কাছে দৌড়াদৌড়ি- কাপড় আজ দেবে কাল দেবে করতে করতে একদিন সত্যিই তৈরি করে দেয়। আমাদের নতুন জামাকাপড় আনার কথা বলে কিন্তু দেখায় না, দেখালে এই নতুন পোশাকে ঈদ হবে না। অব্যক্ত অভিমান বাবার ওপর হয়। কেন তিনি আমাদের নতুন জামা, স্যান্ডেল কিনে দেন না। সেই বয়সে বুঝতাম না, বাবার হৃদয়ে এই অক্ষমতার জন্য কত লজ্জা বা অব্যক্ত যন্ত্রণা ভর করে আছে। বাবা ম্রিয়মাণ কণ্ঠে আনত মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বলতেন- বাবা, মানুষ হলে ঈদে এ রকম কত কিছু কিনতে পারবি।
ক্লাস সেভেনের মাঝামাঝি বছর বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠতে রমজান শুরু হলো। সাত-আট দিন থেমে থেমে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। পাড়ার পুকুর-ডোবা প্রায় টইটম্বুর। নিচু পথঘাট তলিয়ে গেছে বৃষ্টির পানিতে, বন্যার অবস্থা।
ঈদের ১০-১২ দিন সময় আছে। বড় মামা আমাদের বাড়িতে এলেন। মামাবাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানায় বর্তমানে উপজেলা গোমতি নদীর তীরে। মা মামাকে দেখেই বলে উঠলেন- ‘ভাইসাব, গোমতির ভাঙন লাগছেনি?’ মামা ভীতবিহ্বল অবনত চাহনি, নির্বাক। যেন গোমতির বাঁধ ভাঙার দায় তার। হাতের ১০-১২ সের পোলাওয়ের চাল ঘরের মাটির মেঝেতে রেখে পাশের চৌকিতে বসলেন। ছোট শান্ত গোমতি নদী অতি বর্ষণে পাহাড় থেকে ঢল নেমে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে শৈশব থেকেই দেখেছেন মা।
মামা এসেছেন বাবার কাছ থেকে শ’ দেড়েক টাকা ধার নিতে। কারণ ফসল মার যাওয়া জমি পানি সরামাত্র ধানের চারা জোগাড় করে চাষ করা না গেলে তিন-চার মাস অর্ধাহারে বা অনাহারে কাটাতে হবে। বাবা মামার আগমনের কারণ জেনে একটু ভেবে বললেন- ঈদ উপলক্ষে বেতনের অগ্রিম পেলে ঈদ না করে সে টাকা দিতে হবে। তখনো উৎসবভাতা চালু হয়নি। অগ্রিম পেতে আরো দু-তিন দিন লাগবে। মামা দু-তিন দিন থেকে সেই টাকা নিয়ে বাড়ি যাবেন। আমার মনে উঁকি দেয়া সুপ্ত বাসনা- অন্যখানের ঈদ জানি কেমন? বায়না ধরলাম মামা বাড়িতে ঈদ করব এবার। মা-বাবা নিষেধ করলেন, কিন্তু মামা আমার আকুতি ও আগ্রহের আতিশয্যের কাছে হেরে নিজ থেকে আমাকে দেয়ার জন্য বাবা-মাকে অনুরোধ করলেন।
ঈদের ছয়-সাত দিন আগে ২২ রমজানে মামাবাড়ি এলাম। মামাতো ভাই-বোনেরা কেমন নিষ্প্রণ, বিষণ্ন-বিহবল। মামী হয়তো এই দুর্যোগে ভাগিনাকে বাড়ি আনা মামার নির্বুদ্ধিতা ভেবেছিলেন। মামা বাড়ি এলেই গোমতিপাড়ের বিস্তীর্ণ সবুজ শ্যামল ফসল বা কখনো পাকা ধানের সোঁধা গন্ধ পোলাওয়ের ধানের মিষ্টি ম ম গন্ধের লোভে হাঁটতাম জমির পর জমি। গোমতির বাঁধে বসে মামাতো ভাইদের সাথে ধীরে চলা স্ফটিক স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে কৈশোরের ভাবলেশহীন কথা বলতাম। দুই জায়গায় বসবাসের মিল-অমিল খুঁজে ফিরতাম। বাড়ি এসে নারিকেল, চিঁড়া ও মুড়ি খেতাম। ঘরের মুরগির সাথে ক্ষেতের পোলাওয়ের চালের পোলাও অমৃতসম মনে হতো খেতে। ভাইদের সাথে বাড়ি থেকে সামান্য দূর এগোতেই দেখলাম সেই চিরচেনা সবুজ বা ধানের সোঁধা গন্ধের আকর্ষণের স্থলে স্রোতের তীব্র পানির দাপাদাপি, যার সাথে ভেসে গেছে বা তলিয়ে গেছে ফসলাদি আর ঈদ আনন্দ।
মামা রমজানেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ধানের চারা আনতে ফজরান্তে গিয়ে গভীর রাতে ফিরলেন। চারাগুলো পুকুরের পানির চাতালে সামান্য পানিতে ডুবিয়ে রাখেন আর স্বপ্ন দেখেন এগুলো যত তাড়াতাড়ি লাগিয়ে আসন্ন উপোসের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার।
ঈদের তিন-চার দিন বাকি, মামা তিন-চারটি পোষা মোরগ ও ৪-৫ সের পোলাওয়ের চাল নিয়ে আমাকে নিয়ে দেবিদ্বার বাজারে যাবেন। কারণ বুঝলাম না। বিক্রি করে পরিচিত দর্জি দোকানে আমার শার্টের কাপড়ের পরিমাণ জেনে কাপড় কিনলেন, আমি বারবার না করলেও কর্ণপাত করার গরজ করলেন না। কোনো দর্জি তৈরি করতে রাজি হয় না। ঈদের দিন খুব ভোরে যদি সম্ভব হয় দেবেন বলে একজন রাজি হলেন। খুব ভোরে মামা জামা আনতে গেলেন, দেখি লজ্জাবনত হয়ে কাপড়ের টুকরা নিয়েই ফিরেছেন- শার্ট বানানো সম্ভব হয়নি বলে।
মামাতো ভাইয়েরা ও মামাসহ আমরা ঈদগাহে যাচ্ছি যার যার পুরান জামা পরেই। মামী এসে পুরান জামার ওপর নতুন জামার কাপড়টি বেঁধে দিলেন। এভাবে ঈদগাহে গেলাম সঙ্কোচ আনন্দমিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে। পথে এ রকম আরো কিছু নতুন জামার কাপড় বাঁধা দেখে সঙ্কোচ চলে গেল। নামাজান্তে বাড়ি এসে গুড়ের পায়েস, মুরগি পোলাও তৃপ্তি করে খেলাম। ইতোমধ্যে জমির পানি সরে গেছে। মামা হালের বলদ, জোয়াল নিয়ে জমিমুখী আসন্ন উপোসভীতি দূর করতে ঈদের দিনেই।
দেওভোগ, মুন্সীগঞ্জ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫