ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

সেই স্মৃতিটুকু

আসমা আব্বাসী

২৪ জুন ২০১৭,শনিবার, ১৪:২০


প্রিন্ট

এ যেন এক রূপকথার দেশ। ছেলেবেলার স্বর্ণময় দিনগুলোতে সোনার হরফে লেখা তিনজনের নাম, তারা আমার তিন মামু। আমরা বাস করি নানার বাড়িতে আম্মার সাথে, বাড়িটি ঘিরে আছে নানা রঙের ফুল ও নানা স্বাদের ফলগাছ। মাঝখানে কালো জলটলমল পুকুর, কলাগাছ ভাসিয়ে সাঁতার কাটি সেখানে, গাছের তেঁতুল, বরই ও বেতফল সংগ্রহও করি অলস দুপুরে।
লতাপাতা বুনোফুল বনজঙ্গলের শ্যামলিমা মনু নদীর ঢেউ তোলা সুরধ্বনির মায়াবী পরিবেশের মৌলভীবাজার, সেখানে শহরের মাঝখানে চওড়া একটি রাস্তা, এক পাশে সাদা পাথরে কালো হরফে লেখা খানবাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলী সড়ক। টিনের চাল ইটের দেয়াল, চার পাশে বেলী জবা টগর স্থলপদ্ম গন্ধরাজ মাধবীলতা শিউলি ফুলের সুবাস মাখা বাড়িটিতে জন্ম আমার হুরুমামু সৈয়দ মুজতবা আলীর। নানা-নানীর প্রথম সন্তান সৈয়দ মোস্তফা আলী ও দ্বিতীয় পুত্র সৈয়দ মর্তুজা আলী পরম কৌতূহলে ছোট ভাইটিকে নিরীক্ষণ করেন। নানী আমাতুল মান্নান স্নেহ ভরে ছেলের চাঁদপানা মুখে চুমু খেয়ে বলেন আমি একে ডাকবো ‘সিতু’। পরে পাঁচটি কন্যা হলো তাদের, আমার আম্মা-খালাম্মারা মুখর করে তুললেন বাড়ি ঘর আঙিনা।
আমরা যখন থাকতে এলাম নানার বাড়িতে, তখন নানা-নানী বেঁচে নেই। মামু ও খালারা বিয়ের পরবর্তী জীবনে নানা শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন। সিলেটের কাজীটুলা থেকে আমাদের আসতে হলো আমার আব্বা মৌলবী হাবিবুর রহমান চৌধুরীর ইন্তেকালে। বয়স বেশি হয়নি তার, পাঁচটি কিশোর ও শিশু সন্তান নিয়ে মা চলে এলেন পিত্রালয়ে। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে কী সুন্দর একটি শহরে চলে এলাম বসবাস করতে। তখনকার মৌলভীবাজার অপূর্ব এক মহকুমা শহর। গাড়ি ঘোড়া রিকশা টেম্পো নেই, নেই বাসের হর্ন, নেই রেলগাড়ির হুইসেল। শুধু শোনা যায় তালগাছ সুপারিগাছের পাতার মর্মর ধ্বনি, শোনা যায় মনু নদীর ঢেউ ভাঙার শব্দ। ভর্তি হলাম ঈশ্বর পাঠশালায়, পড়াতে এলেন মায়াভরা মাসিমা স্নেহমাখা বড় দিদি, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ তারা করে দিলেন নিপুণ হাতে। ক্লাস থ্রিতে এলাম আলী আমজাদ জুবিলি গার্লস হাইস্কুলে। হেড মাস্টার যামিনী বাবু লম্বা ছিপছিপে অবয়ব নিয়ে সারাক্ষণ ঘুরছেন এ ক্লাস থেকে ও ক্লাসে। স্কুলের মাঠ সবুজ ঘাসের ভেলভেটসম, একটি ঝরাপাতাও থাকতে পারে না তার অতন্দ্র প্রহরায়। ক্লাস থেকে দেখা যায় মনু নদীর পাল তোলা নৌকা। আমরা যখন সকালে গরম ভাত ডাল এক চামচ ঘি সহযোগে খেয়ে স্কুলের বই খাতা নিয়ে রাস্তায় নামি, সে পথটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে কালীবাড়ী, পোস্ট অফিস থানার পাশ দিয়ে। পথে পড়ে প্রকাণ্ড এক বটগাছ, তার গোড়াতে সিঁদুরমাখানো, আমাদের সহপাঠী মিনতী পরম শ্রদ্ধায় প্রণাম করে আবার পথ চলে। আমরা একটু থেমে ওর জন্য অপেক্ষা করি। আবার বাকবাকুম পায়রার মতো স্কুলপানে চলা।
তিন মামুই অবসর পেলে দেখতে আসেন তাদের বোন ও তার সন্তানদের, সাথে নানারকম মনোলোভা উপহার। আমরা দূর থেকে তাকিয়ে থাকি, কখন মামু ডাক দেবেন। সবার আগে বেরোয় আমাদের জন্য বিলাতি কোম্পানির বিস্কুটের টিন, ফ্রকের কাপড়, ক্লিপ, ফিতা, জুতো এবং অবশ্যই ছোটদের গল্পের বই। সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’, বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’, রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথ’।
‘ঠাকুরমার ঝুলি’ ‘বীরবলের কাহিনী’ ‘নাসিরউদ্দিন হোজ্জা’ কী রসময় কাহিনী। আমরা কখনো নিজেরা পড়ি কখনো বা মার আঁচল ধরে আবদার করি তুমি একটু পড়ে শোনাও।
হুরুমামু রচনা করছেন ‘দেশে বিদেশে’, বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনী। তার পাণ্ডুলিপি পড়ে শোনাচ্ছেন আম্মা ও বড় ভাই শফিককে, আমরা তেমন খুশি নই, আম্মা কাছে এসে মাথায় বিলি না কাটলে যে ঘুমই আসবে না, এত বিদ্বান হয়েও মামু কেন বোঝেন না ভেবে অবাক হই। মনে হয় বড়দের বুদ্ধিসুদ্ধি সবসময়ই কম, আমরা তো পরামর্শ দিতে সবসময়ই রাজি, শুনবে কে।
‘হাতকরা না হাতকড়া’ তা নিয়ে ভীষণ হইচই।
সাতকরা সিলেটের একটি প্রসিদ্ধ লেবু, আমরা বলি ‘হাতকরা’ যা দিয়ে গরুর গোশতের সালুন হয় ভীষণ মজা। ইচ্ছা করলে রুই মাছ দিয়েও সুরুয়া করা যায়। সাতকরা সিলেটের ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে আজ ঢাকাসহ সব শহরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নিউ ইয়র্ক শিকাগো ফ্লোরিডা প্রভৃতি জায়গায় উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় সাতকরা, যার খবর পেলেই সিলেটিরা ভিড় জমান দলে দলে। আমার তিন মামুতে বড্ড ভাব, বন্ধুর মতো ঠাট্টা রসিকতা করেন। এটা ওটা নিয়ে তুমুল বিতর্ক তোলেন মামুরা।
তারা গল্প করেন সমবয়সী বন্ধুর মতো, আবার মান্য করেন মুরব্বি হিসেবে। বড় মামুর সামনে কখনই সিগারেট ধরান না মেজমামু, তেমনিভাবে হুরুমামুও পাইপ হাতে আসেন না মেজমামুর সামনে।
আপনারে বড় বলে বড় সেই হয়
লোকে যারে বড় বলে বড় সেই নয়
বলতে বলতে সমস্বরে হেসে ওঠেন তিন ভাই। ছোটমামু বলেন ‘ভাইসাব লম্বাচওড়ায় আমাকেই তো বড় দেখায়, কাজেই জ্যেষ্ঠত্বের দাবি অনায়াসেই করতে পারি’।
‘ঠিক আছে ভাই সিতু (মামুর ডাক নাম) তোমার বড়ত্বের দাবি আমি মেনে নিলাম’। কী নির্মল তাদের হাসি কৌতুক। মৌলবীবাজারে বাড়ির টিনের চালে শিশির ঝরে পড়ার শব্দ হয় টুপটুপ, বাগান থেকে ভেসে আসে ভেজা শিউলির সুবাস, পাকঘরে মা আমাতুল মান্নানের পিঠা ভাজার খুশবু, একটু পরই সাদা দস্তরখান বিছিয়ে কাচের সোনালি প্লেট দিয়ে খেতে বসার পালা।

আমার মামুদের গভীর ভালোবাসা পাঁচ বোন সৈয়দা হাবিবুন্নেসা, সৈয়দা হিফজুন্নেসা, সৈয়দা নজিবুন্নেসা, সৈয়দা জেবুন্নেসা, সৈয়দা লুৎফুন্নেসার জন্য। বছরে একবার ঢাকার জয়দেবপুর অথবা শ্রীপুরে বনভোজন হতো, বলা যায় পারিবারিক মিলন উৎসব। অগুনতি বাচ্চাকাচ্চা হইচই করছে, আম্মারা পানের বাটা খুলে বসেছেন, মামুরা বলতেন ‘দেখো দেখো সৈয়দ সিকান্দার আলীর বংশপরম্পরা কত বিস্তৃত হচ্ছে। হয়তো বা গিনিজ বুক অব রেকর্ডে ঠাঁই পাবে এ তালিকা’। অনেকে আছেন সিলেটের বাইরে থেকে আগত, বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে মোটামুটিভাবে সিলেটি ভাষা রপ্ত তাদের। আমার কন্যা সামিরা খুব সুন্দর করে সিলেটিতে তার নানীর সাথে গল্প করে, আম্মা খুব খুশি হন। সামিরার বাবাও সিলেটি বলার চেষ্টা করেন, তবে আমার সাথে নয়, সিলেটে বেড়াতে গিয়ে বক্তৃতা করার ছলে। আমি সেই জগাখিচুড়িতে কখনই বাদ সাধি না, ভাবি আমারও তো এবার কোচবিহারী ভাষা শিখতে হবে, না’হলে মানমর্যাদা থাকবে না যে।
হুরুমামু ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তর। প্রথমে শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য, পরবর্তীতে কাবুল, কান্দাহার, পাঞ্জাব, কটক, গৌহাটি, প্যারিস, রোম সবই যেন তার ঠিকানা। নিজ গৃহে পরবাসী, বাড়ির টান থাকলেও মন পড়ে থাকে বোলপুরের আড্ডায় বা কলকাতার পাঁচ নম্বর পার্লরোডের মজলিসে। আবু সয়ীদ আইয়ুব, গৌরী আইয়ুবের পাশের ফ্ল্যাটে তখনকার বিখ্যাত এমপি ডক্টর গনি ও বেগম গনির স্নেহমাখা বাড়ি তার বাসস্থান। আমরাও বেড়াতে গেলে গৌরী চাচী ও গনি চাচীর স্নেহে ধন্য হই। আইয়ুব চাচা ও গনি চাচার সুমধুর সান্নিধ্য তো উপরি পাওনা। কখনো আসেন কথাসাহিত্যিক মনোজ বসু, যার লেখা পড়ে মুগ্ধতার আবেশ ছড়ানো অগণিত ভক্ত মনে। পশুপতি খানমামা আছেন মামুর সাথে ছায়ার মতো, খুঁটিনাটি চাওয়া না চাওয়া সবই পলকে বুঝে নেন।
মামু ঢাকায় কখনো মিন্টু রোডে মেজমামুর বাড়িতে, কখনো ব্যাংক হাউজে আমার ভাইয়ের ফ্ল্যাটে, মামী রাজশাহী থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় এলেন কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলের হেড মিস্ট্রেস হয়ে, তখন থাকেন, সেগুন বাগিচায় বিরাট একটি বাড়ির দোতালায়। হুরুমামু এত মজলিশি লোক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোশগল্প করে চলেছেন বক্তার হুঁশ নেই, শ্রোতারাও বেহুঁশ। গোসলের সময় বয়ে যায়, খাওয়ার সময় গড়িয়ে যায় থামাবে কে? আপাতদৃষ্টিতে গুরুগম্ভীর, অন্তরে মমতা ও রসের ফল্গুধারা। মামী বাড়ি করলেন ধানমন্ডি লেকের পাশে, শিশুপুত্র ফিরোজ ও কবিরকে খাওয়ানোর সময় মামী ঘুরছেন ভাতের থালা হাতে এ ঘর থেকে ও ঘর, ফিরোজ ট্রাইসাইকেল নিয়ে ভ্রাম্যমাণ পরিব্রাজক, কবির ফুটবল খেলতে গিয়ে পানির মাটির কলসি ভেঙে চুরমার করে হাসছে, হাসছেন স্নেহময়ী মা, স্কুলে আমাদের প্রতাপশালী হেডমিস্ট্রেস, এখানে বাচ্চাদের দুরন্তপনায় যেন ভীরু হরিণী।
হুরুমামু ঢাকায় এলে আমরা নিয়মিত যাই ধানমন্ডি এক নম্বরে তাদের বাড়িতে। কখনো মরণচাঁদের রসগোল্লা, কখনো ঢাকাই বাখরখানি অষ্টগ্রামের পনির, কখনো একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। একবার গেলাম একডজন সুস্বাদু পেস্ট্রি নিয়ে ‘পূর্বাণী’ হোটেল থেকে। চায়ের সাথে সেই পেস্ট্রি খেয়ে তিনি ফিরোজ ও কবীরকে ডাকলেন এসো এসো খেয়ে যাও, বেহেশতি স্বাদ পাবে।
কিছুক্ষণ পর তার সহজাত স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করলেন ‘কত কড়ি খসল হে আব্বাসী’। দাম শুনে আবারো হেসে উঠলেন ‘এর নামতো পূর্বাণী নয়, কুরবাণি হওয়া উচিত’।
আমাদের পরিবারের সবাই কমবেশি লেখেন, কেউ ছাপান কেউ বা খেরোখাতায় রেখে দেন। আম্মার ইন্তেকালের পর দেখা গেল পাঁচটি মোটা ডায়েরিতে মুক্তোর মতো হরফে দিনপঞ্জি লিখেছেন। প্রতিদিন এশার নামাজের পর মা লিখতে বসতেন, আমরা খেয়ালও করিনি। আজ ভাবি, মাগো তুমি এত গুণের আধার হয়েও কস্তুরির মতো লুকিয়ে রাখলে নিজেকে।
আজকাল বেশি করে মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা, কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে পড়ি। সেই যে আমাদের মায়াবী দিনগুলোতে ইসলামি বর্ষের প্রতিটি উৎসব আসত নানা বর্ণের সমারোহ নিয়ে। বিশেষ করে মুহররম, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল ও জিলহজের তুলনা নেই।
‘মুহররমের চাঁদ এল ঐ কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়
ইয়া হোসেনা ইয়া হোসেনা তারই মাতম শোনা যায়।’
জারিগানের করুণ সুর দূর থেকে ভেসে আসতো অশ্রুর বৃষ্টি নিয়ে। আমরা সুন্নি মুসলিম পরিবার শ্রদ্ধার সাথে ইবাদত করে দোয়া করতাম নবীজির নয়নমণি ইমাম হাসান, ইমাম হোসেন ও শাহাদাত বরণকারী বুজুর্গদের জন্য। আমরা দরুদ শরিফ পড়তাম রাসূল সা:-এর কাছে নৈবেদ্য পাঠাবো বলে। মুহররমে শিন্নি রেঁধে দীন-দুঃখীদের খাওয়াতেন আম্মা।
ওদিকে আবার কোর্টের পাশের খোলা মাঠে বসত মুহররমের মেলা। কত যে মনোহারি জিনিস সেখানে, শিশুদের মুগ্ধতা চিনি দিয়ে তৈরি গোলাপি পাখি ফুল হাতি ঘোড়া প্রজাপতির দিকে। নিজের সঞ্চিত ভাণ্ডার থেকে খরচ করে একআনা দু’আনা দিয়ে সেই ফুল পাখির কিনে কি যে মজা লাগত খেতে। লম্বা কাঠিতে সবুজ রঙের আইসক্রিম যখন প্রথম খেলাম, মনে হলো বেহেশতি সুধা। ঠাণ্ডা মিষ্টি টকটক স্বাদ যেন গরমের বিকেলে সব ক্লান্তি জুড়িয়ে দিলো। মায়ের জন্য কিনলাম কাঠের খুনতি, হাতা, মাটির হাঁড়ি ও তালের পাখা। সালমা নাজমা আসমা তিন বোনেরই কন্ট্রিবিউশন এখানে, কে কত পয়সা দিলাম বড় কথা নয়, আসলে তিনি যে আমাদের তিন জনারই মা। ভাইয়ের কথা মনে পড়ত তখন, আহারে বেচারা কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে ইকোনমিক্স পড়তে পড়তে গলদঘর্ম হচ্ছেন নিশ্চয়ই। মায়ের একমাত্র পুত্র হিসেবে কত কিছু যে আম্মার ভাণ্ডারে জমিয়ে রাখা আছে সে খবর ভাইয়ের মনোদর্পণে সব সময়ই ছায়া ফেলছে। ছেলেবেলাতেই পিতাকে হারিয়ে আম্মাময় জীবন আমাদের, আদরে সোহাগে স্নেহমমতায় মা শুধু ত্যাগই করে গেছেন, কখনো বুঝতেও দেননি কোনো অভাব বা কষ্ট।
শাবান মাস ইবাদতের মাস, পনেরো তারিখ রাতে শব-ই-বরাত ভাগ্য নির্ধারণের রাত্রি। সারা রাত যে ইবাদত করবে, এক শ’ রাকাত নফল নামাজ, দুই শত বার দরূদ শরিফ, পাঁচশত বার ‘ইয়া আল্লাহু’ তসবিহ, আমরা জেনেছি হুজুরের কাছে। এখানে আমাদের অলক্ষ্য প্রতিযোগিতা, বোনেদের এবং পাড়ার বন্ধুদের মধ্যে। রাত তো কাটুক সকালে খবর নেয়া যাবে কার খাতায় কত নম্বর পাওয়া গেছে। সুগন্ধি ঘিয়ের তুসা শিন্নি (ময়দা চিনি ও ঘি দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভুনা করে রান্না করা) তার সাথে চালের রুটি ময়দার রুটি এবাড়ি ওবাড়ি পাঠানো হতো। আমরা দুপুর থেকে আরম্ভ করে ঘণ্টায় ঘণ্টায় খেয়েই চলেছি। ওদিকে আম্মা কালোজিরা চালের সুগন্ধি পোলাও ও ঘরের ঢেঁকি মুরগির কোর্মা রেঁধে রেখেছেন।
রমজানের একফালি বাঁকা চাঁদ উঁকি দিলো বাঁশঝাড়ের ফাঁকে। মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি, মাইকে ঘোষণা হচ্ছে তারাবির নামাজের। আমাদের বড় ভাই শফিক গোসল করে সাদা তহবন ও সাদা পাঞ্জাবি পরে টুপি মাথায় রওনা দিলেন মসজিদের দিকে। আম্মা বড় ঘরে শীতল পাটি বিছিয়ে বড় করে জায়গা করলেন ছোটদের জন্য, পাশে রাখা আছে ছোট ছোট বালিশ, যার যতক্ষণ ভালো লাগবে নামাজ পড়বে, বিশ্রাম নেবে, এতে তো কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
মুহররম শিয়া ও সুন্নি দুই সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সুন্নি মুসলমানেরা মুহররমের দশ তারিখে পালন করি আশুরা উৎসব। আমরা জানি এই মাসে আল্লাহতায়ালা অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়েছেন নবীদের জীবনে। তাঁদের কারো গুনাহ মাফ হয়েছে, কারো রোগমুক্তি হয়েছে, কেউ মাছের পেট থেকে উদ্ধার পেয়েছেন এবং এই দিনে মানুষের অন্তরের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন তার নিজ নামের মহিমায়। আমাদের বাড়িতে আশুরার দিনে আম্মা খাওয়ার মেনুতে পরিবর্তন আনতেন ভালো গোশত ও ভালো চালের সমন্বয়ে। কখনো তেহারি, কখনো বা রেজালা ও পোলাও। পরিমাণে বেশি করে রান্না করা হতো, যাতে যেকোনো মেহমান এলে আপ্যায়ন করা যায়। বড়রা অনেক ইবাদত বন্দিগি করতেন, রোজা রাখতেন, আমরা ছোটরা বন্ধুদের সাথে গল্প ও খাওয়া-দাওয়াতেই ব্যস্ত।
রজব মাসের সাতাশে আল্লাহর সাথে তার হাবীব প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদের দর্শন, শবে মেরাজ। আমরা মুগ্ধ হৃদয়ে শুনতাম সেই আসমানি সাক্ষাতের বিবরণ, এই রাতটি আমাদের জীবনে স্থায়ী দাগ কেটে গেছে শৈশব থেকেই। বেহেশত ও দোজখের বর্ণনা শুনে কখনো পুলকিত, কখনো শঙ্কিত, মনে মনে শপথ নিতাম বেহেশতে যাওয়ার সঞ্চয় এখন থেকেই শুরু করতে হবে।
শাবান মাস আসে ভাগ্য রচনার বার্তা নিয়ে। আমাদের ছোট মনে অটুট বিশ্বাস ছিল পনেরই শাবান শবেবরাত ভাগ্য নির্ধারণের রাত। এ রাতে ঘুমুলে চলবে না, চা খেয়ে, শরবত খেয়ে, যেভাবেই হোক জেগে থাকতে হবে। এক শ’ রাকাত নামাজ পড়লে অনেক সওয়াব, তাসবিহ তো পড়তেই হবে আল্লাহর নাম ও রাসূলের জিকির নিয়ে। আমরা গাছের মেহেদি পাতা বেটে হাতে লাগাতাম, রাতে হালুয়া রুটি খেতাম আর কচি মনের সরল বিশ্বাসে আল্লাহর কাছে দুনিয়ার ছোটখাটো অনেক চাওয়ার লিষ্ট পেশ করতাম।
রমজানের দিনগুলো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম নিয়ে আসে। দিনের বেলা পাকঘর বন্ধ, চুলো ধরানো হয় না, রান্নাবাড়ার বালাই নেই, ব্যস্ততা শুরু হয় জোহরের নামাজের পর থেকে। বাড়িতে যারা ছোট তাদের আগের দিনের রান্না করা খাবার দিয়েই চলে যেত, আর নাশতা তো কিছু-না-কিছু থাকতই। ইফতারির আয়োজনে কত ঘটা, ছোলা, কাঁচা ছোলা, আদাকুচি, শশা, খোরমা, খেজুর, পেঁয়াজু, বেগুনি, খিচুড়ি বা জাউ, মুরগিভুনা, চালের রুটি ইত্যাদি। আম্মা পাশের প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিতেন নিয়মিত। সপ্তাহে দু’দিন ভালো কিছু রান্না করে তাদের ইফতারি পাঠাতেন। আর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ষোল ব্যঞ্জনের ইফতার তো মাসে একবার পাঠাতেই হতো। নানা রকম সুস্বাদু খাবার, সাথে মওসুমের সব ফল। যে মেয়ের বিয়ে হয়েছে দূরের শহরে, সেখানে মানিঅর্ডারে টাকা যেত, নিচে দু’লাইন লিখে দিতেন ইফতারির আয়োজনের জন্য।
সবচেয়ে আনন্দ হলো সেবার যখন হঠাৎ করে ঈদের ঠিক দু’দিন আগে আমার তিন মামুই চলে এলেন পরিবার নিয়ে আমাদের সাথে ঈদ করবেন বলে। আম্মার রোজা ও ইবাদতে শীর্ণ মুখখানি আনন্দে হয়ে উঠল যেন পূর্ণিমার চাঁদ। আশেপাশের আত্মীয়স্বজনেরা এলেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। সবাই মিলে কত যে নাশতা, কত যে খাবার তৈরি হতে লাগলো। মামুদের স্যুটকেস থেকে এক এক করে বেরুলো আমাদের তিন বোনের জন্য তিন সেট বাহারি ফ্রক, জুতা, ফিতা, ক্লিপ, মালা। আম্মার জন্য মিহি জমিনের সাদা শাড়ি, যার সরু পাড়ে রয়েছে অনবদ্য নকশা।
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে শোন আসমানি তাগিদ’
আমাদের বাড়িতে এবার ঈদের আনন্দ হাজার রওশনীর আলো ছড়িয়ে দিলো খান বাহাদুর সৈয়দ সিকান্দার আলীর বংশধরদের একত্রিত হয়ে মনের খুশির ফুলঝুরি ছড়িয়ে দেয়ায়। আজো আমার কাছে কল্পনায় ভাবনায় নিদ্রায় ভেসে আসে সেই গত হয়ে যাওয়া দিনটির অমলিন ছবি। হৃদয়ের ক্ষমতা অসামান্য, সেখানে কিছুই হারায় না, পুরনো হয় না, মনে হয় এই তো আমার হাতের কাছেই রয়ে গেছে। চোখ মেললেই দেখতে পাবো প্রিয়জনদের প্রিয়তম মুখচ্ছবি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫