ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

আর নয় কোনো পলাশী

মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:৩৬


প্রিন্ট

পলাশীর ঘটনা কেবলই ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের ইতিহাস। নওয়াব আলীবর্দী খানের ইচ্ছানুযায়ী তার মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ এপ্রিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নওয়াবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময়ে বঙ্গদেশে এক চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল। পারিবারিকপর্যায় থেকে শুরু করে রাজ্যময় চক্রান্তকারীরা তৎপর হয়ে উঠেছিল।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণের পর তাকে একসাথে উচ্চাভিলাষী খালা, ঘষেটি বেগম কর্তৃক নিজ পুত্র পুর্নিয়ার শাসক শওকত জঙ্গকে নওয়াবের সিংহাসনে বসানোর দুরভিসন্ধি, অভিজাত ধনাঢ্য হিন্দু অমাত্যবর্গের সুদূরপ্রসারী ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র, প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খানের মসনদ দখলের স্বপ্ন এবং সর্বোপরি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান শক্তি ও ঔদ্ধত্যের মোকাবেলা করতে হয়। কিছুকাল আগে ইংরেজরা কৌশলে বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে নওয়াব সুজাউদ্দীনের কাছ থেকে বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি লাভ করেছিল। শায়েস্তা খানের আমলে ইংরেজদের ব্যবসায় বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও ব্যবসায় খাত হতে সরকারি রাজস্ব না বাড়ায় তিনি ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়ের ওপর শতকরা তিন থেকে সাড়ে তিন শতাংশ হারে শুল্ক ধার্য করেন। ফলে ইংরেজরা ক্ষিপ্ত হয়ে শায়েস্তা খানের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। পরে বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খানের সময় এই দ্বন্দ্ব প্রকট রূপ নেয়। ইংরেজরা আধিপত্য বিস্তারের জন্য কলকাতার চার পাশে ৪৮টি জমিদারি ক্রয়ের এবং নিজস্ব টাকশাল গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করে। কিন্তু দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খান ইংরেজদের এসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। তখন ইংরেজরা প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহের কাছ হতে এসব বিষয়ে সুবিধা লাভের ফরমান সংগ্রহ করে। কিন্তু দেশের স্বার্থে নওয়াব মুর্শিদ কুলি খান ফরমানে উল্লিখিত সুবিধাগুলো দিতে অস্বীকৃতি জানান। দেশের স্বার্থে পরবর্তী নওয়াব সুজাউদ্দীন ও আলীবর্দী খান ইংরেজদের এসব সুবিধা দিতে সম্মত হননি।
নওয়াবের সতর্কবাণী অগ্রাহ্য করে তাদের তৎপরতা চালাতে থাকলে নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা দৃঢ়তার সাথে অভিযান পরিচালনা করে ৪ জুন ১৭৫৬ সালে ওদের কাসিমবাজার কুঠি দখল করেন। এতে বাধ্য হয়ে ইংরেজ কোম্পানি মুচলেকা পত্রে এ মর্মে স্বাক্ষর করে যে ফোর্ট উইলিয়ামের প্রাচীর ভেঙে ফেলবে, দেশীয় শাসকদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করবে এবং বিনাশুল্কে বাণিজ্য করে রাজকোষের যে ক্ষতি করেছে তা পূরণ করবে। মুচলেকা পত্রের শর্ত পালন না করায় ২০ জুন ১৭৫৬ সালে নবাব কলকাতা আক্রমণ করেন। ফোর্ট উইলিয়ামের বেশির ভাগ ইংরেজ সৈন্য নৌকায় পালিয়ে যায় এবং অবশিষ্টরা আত্মসমর্পণ করে। এরপর শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ইংরেজরা নওয়াবের সাথে সন্ধি করতে চাইলে নওয়াব সিরাজউদ্দোলাও শান্তির লক্ষ্যে সন্ধি করতে সম্মত হন এবং ১৭৫৭ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি আলী নগরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। অন্য দিকে, পূর্ণিয়ার পথে মনিহারির যুদ্ধে সিংহাসন অভিলাষী নওয়াবের খালাতো ভাই পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জঙ্গ ১৭৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর নবাবের কাছে পরাজিত ও নিহত হন। তার মাতা ঘষেটি বেগমকে নওয়াবের প্রাসাদে নজরবন্দী করে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও নওয়াবের শত্রুদের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। হিন্দু অমার্ত্য মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, জগৎ শেঠ, রাজ বল্লভ, উমীচাঁদ, মানিকচাঁদ এবং ইংরেজদের মধ্যে অনুষ্ঠিত কলকাতা কাউন্সিলে ২৩ এপ্রিল ১৭৫৭ নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ৪ জুন এ ষড়যন্ত্রের অন্যতম অংশীদার হিসেবে প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খানের সাথে ইংরেজদের চুক্তি হয় যে, নওয়াব সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করে মীরজাফরকে বাংলার মসনদে প্রতিষ্ঠিত করা হবে।
ইতোমধ্যে ইংরেজরা কলকাতা পুনর্দখলের জন্য মাদ্রাজ হতে রবার্ট ক্লাইভকে কলকাতায় আসার নির্দেশ দেয়ায় ক্লাইভ সসৈন্যে কলকাতায় এসে তা পুনরায় দখল করে নেন। তারপর শুরু হয় নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের অভিযান। ক্লাইভ ১৩ জুন ১৭৫৭ তারিখে কলকাতা হতে তিন হাজার ২০০ সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হয়ে ১৯ জুন বর্ধমানের কাটোয়া দখল করেন এবং ২২ জুন গঙ্গা পার হয়ে নদীয়া জেলার পলাশীর আম্রকাননে পৌঁছান। এদিকে নওয়াবের ৫০ হাজার সৈন্য ইংরেজদের প্রতিহত করতে প্রস্তুত এবং নওয়াবের পক্ষে সহায়তা করার জন্য ফরাসি বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন সিনফ্রে। ২৩ জুন ১৭৫৭ পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ শুরু হলো। নওয়াবের বীর সেনাপতি মীরমদন, মোহনলাল আর ফরাসি সেনাধ্যক্ষ সিনফ্রে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন। নওয়াবের জয় যখন অনিবার্য ঠিক তখনই প্রধান সেনাপতি, বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর আলীর নির্দেশে নওয়াব বাহিনী যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। সাথে সাথে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সুচতুর ক্লাইভের নির্দেশে এই বাহিনীর ওপর বেপরোয়া হামলা চালায় ইংরেজ বাহিনী। ইংরেজদের গোলার আঘাতে বীর সেনাপতি মীরমদন মৃত্যুবরণ করেন। অথচ সে সময় যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফর আলী খাঁ, রায়দুর্লভ পুতুলের মতো নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে নবাবের বিশাল বাহিনী ছত্রভঙ্গ ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। নওয়াবের সুনিশ্চিত জয় বিশ্বাসঘাতকতার ফলে পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়। আর যুদ্ধের নামে প্রহসনের মধ্য দিয়ে সেই পলাশীর প্রান্তরেই অস্তমিত হলো বাংলার স্বাধীনতা সূর্য। রচিত হলো ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। নওয়াব তার পত্নী লুৎফুন্নিসা বেগম ও শিশু কন্যাসহ পাটনার পথে পলায়নকালে রাজমহলে মীরকাসিম কর্তৃক ধৃত হন। নামাজরত অবস্থায় এবং মীরজাফরের পুত্র মীরনের প্ররোচনায় মোহাম্মদী বেগ কর্তৃক নিষ্ঠুর নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয় নবাবকে।
এখানে মুর্শিদাবাদ কাহিনীর লেখক নিখিল নাথ বাবুর একটি উক্তি উল্লেখ করা যায়- ‘হতভাগ্য সিরাজ রাজ্যহারা সর্বস্বহারা হইয়া অবশেষে প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে বিলুণ্ঠিত হইয়াছিল। তাহার প্রাণ দানের পরিবর্তে যদি প্রাণনাশের কেহ সম্মতি দিয়া থাকে তাহা হইলে তাহারা ঘৃণিত ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক এবং তাহারা যে সর্বদা নিন্দনীয়, এ কথা মুক্ত কণ্ঠে বলা যাইতে পারে।’
বিদেশী বেনিয়া ইংরেজদের সাথে গোপনে হাত মিলিয়ে জগৎ শেঠ, উমীচাঁদ, রায়দুর্লভ, রাজা রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস, ইয়ার লতিফ, দেওয়ান রামচাঁদ আর সেনাপতি মীরজাফর আলী খান কেবল নওয়াব সিরাজুদ্দৌলাকেই ক্ষমতাচ্যুত করেনি বরং বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিয়েছিল। তাই তো নিরপেক্ষ ইংরেজ ইতিহাসবিদেরা লিখেছেন- প্রথমে বাংলার নওয়াব সিরাজুদ্দৌলার পতন ঘটিয়ে মুসলিম শাসন হতে ক্রমান্বয়ে ভারতকে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরাতে ইংরেজ সেনাপতির তরবারির পাশাপাশি হিন্দু ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের অর্থভাণ্ডার সমভাবে কাজ করেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে আবার আগ্রাসী অপশক্তির হাতছানি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাই দেশের বাংলার ১৬ কোটি মানুষকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, যাতে কোনোভাবেই পলাশীর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। যেমন করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষ আত্মউৎসর্গ করে লড়েছিল, তেমনই আবার স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী দুর্বার শক্তি নিয়ে সব অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে গড়ে তুলবে প্রতিরোধ, এটাই হোক পলাশী দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক : সাবেক ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫