ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

ইতিহাস-ঐতিহ্য

জাতীয় চেতনায় নবাব সিরাজ

মোহাম্মদ আলী আজম খান

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:১৭


প্রিন্ট

বর্তমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ একদা অবিভক্ত ভারতের সুবা বাংলার (ইঊঘইঅখ) একটি অংশ ছিল। ব্রিটিশশাসিত ভারতে সুবা বাংলাকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি নামে অভিহিত করা হতো। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের মানচিত্রে স্বাধীন ভারত ও স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রদ্বয়ের জন্ম হয়। তখন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে সুবা বাংলার পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রদেশ হিসেবে এর নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান। অপর দিকে পশ্চিমাংশ হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে অঙ্গরাজ্য হিসেবে এর নামকরণ হয় পশ্চিম বঙ্গ।
মোগল শাসনামলে ১৭০০ শতাব্দীতে বাংলার প্রথম সুবেদার শেখ আলাউদ্দিন চিশতি, প্রকাশ ইসলাম খান, ঢাকাকে বাংলার রাজধানীতে পরিণত করে এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। ১৭০৪ সালে বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তর করেন। ১৭১৭ সালে তিনি নবাব উপাধি গ্রহণ করে বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। তারপর চারজন স্বাধীন নবাব বাংলা শাসন করেন। নবাব আলীবর্দী খানের আমলে ১৭৪০ সালে বিহার এবং ১৭৪১ সালে উড়িষ্যা তার অধিকারে আসে। নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিংহাসনে আরোহণ করেন তার দৌহিত্র মীর্জা মুহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা। তিনি ছিলেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সময়ে তার কিছু অমাত্যের সাথে ইংরেজদের গোপন ষড়যন্ত্রের পরিণতিতে, এবং অবশেষে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সংঘটিত প্রহসনতুল্য পলাশী যুদ্ধে নবাবের সিপাহসালার মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ইংরেজ বাহিনীর কাছে নবাব বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। এর ফলে বাংলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকারে আসে এবং ক্রমান্বয়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
এটা সুবিদিত, বাঙালি জাতির একটি গৌরবের সুদীর্ঘ অতীত রয়েছে। এই ইতিহাস যেন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের প্রায় ২১৩ বছর আগে বাঙালি জাতি ভারতবর্ষের প্রায় সার্বভৌম সুবা বাংলায় কার্যত স্বাধীন জাতি হিসেবেই বসবাস করত। তাদের শাসক ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তার পূর্বসূরি নবাব আলীবর্দী খান, নবাব মুর্শিদকুলি খান প্রমুখ। বংশ পরম্পরায় তারা ছিলেন যোদ্ধা ও ন্যায়পরায়ণ শাসক। দৃশ্যত মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও তারা নিজস্ব যোগ্যতায় ও বিচক্ষণতায় বাংলায় স্বশাসন কায়েম করেছিলেন।
অতএব, বাঙালি জাতির গৌরবমণ্ডিত ইতিহাস সুদূর অতীতের গর্ভে নিভৃতে কথা কয়। অতীতের সেই অধ্যায় অন্তত নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামল (১৭১৭-২৭) পর্যন্ত যদি যথাযথভাবে বাংলাদেশে সংরক্ষিত হয় তাহলে জাতির ঐতিহ্য ও মর্যাদা অনেক দীর্ঘ পরিমণ্ডলে মূল্যায়ন করা যায়। সুবা বাংলার নবাবরা রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে প্রাক্তন রাজধানী ঢাকার সাথে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করতেন। নবাব মুর্শিদকুলি খান, প্রকাশ করতলব খান ১৭০১-০৪ সালে পুরান ঢাকার বেগমবাজারে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা তার নামানুসারে করতলব খান মসজিদ নামে পরিচিত। নবাব আলীবর্দী খানের জীবদ্দশায় সিরাজউদ্দৌলা এক সময় ঢাকায় নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পলাশী যুদ্ধশেষে ইংরেজরা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করলে, তার স্ত্রী লুৎফুন্নেছা ও একমাত্র শিশুকন্যাকে বন্দী অবস্থায় ঢাকায় প্রেরণ করে জিঞ্জিরা প্রাসাদে আটক করে রাখা হয়। এই নবাবের অষ্টম ও নবম বংশধররা বর্তমানে ঢাকার খিলক্ষেতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে রয়েছে পলাশী যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পলাশী মনুমেন্ট, যুদ্ধে ব্যবহৃত কামান, নবাব সিরাজউদ্দৌলার আবক্ষ ভাস্কর্য ও কবর এবং মীরজাফরের বাড়ি ও কবর। এ ছাড়া রয়েছে হাজারদুয়ারী প্রাসাদ, ইমামবাড়ী, কাটরা মসজিদ ও তদসংলগ্ন নবাব মুর্শিদকুলি খানের সমাধি, নবাব আলীবর্দী খানের কবর, নবাব ওয়াসিফ আলী মনজিল, নবাব সিরাজউদ্দৌলা নির্মিত মসজিদ ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান। মুর্শিদাবাদকে এখন বলা হয় বাংলার হারিয়ে যাওয়া রাজধানী। ওই সব স্মৃতিনিদর্শনের আকর্ষণে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখনো মুর্শিদাবাদে ভিড় জমান।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান কখনো বাংলার নবাবদের শাসনাধীনে ছিল না। সেখানেও করাচিতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার নামে একটি সরকারি কলেজ রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, নবাব সিরাজউদ্দৌলা বা তার পূর্বসূরি নবাবদের স্মরণীয় করে রাখার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন এ দেশে নেই। যতদূর জানা যায়, নাটোর জেলায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার নামে একটি মাঝারি মানের সরকারি কলেজ আছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম শহরে একটি সড়ক নবাবের নামে নামকরণ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের মানুষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে শ্রদ্ধা ও মমতায় স্মরণ করে আসছে মূলত দীর্ঘকাল ধরে শহরে ও গ্রামে মঞ্চস্থ অসংখ্য যাত্রা-নাটকের মাধ্যমে। ১৯৬৭ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রটি সারা পাকিস্তানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সরকারের সদিচ্ছা হলে, বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবনিতার হৃদয়ে যার স্থান, শহীদ নবাব সিরাজউদ্দৌলার অমর স্মৃতি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এই লক্ষ্যে নবাবি আমলের কিছু স্মৃতিবিজড়িত, পুরান ঢাকার কোনো সুবিধাজনক স্থানে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নির্মিত হতে পারে। কমপ্লেক্সে নির্মিত হতে পারে মুর্শিদাবাদে নির্মিত ‘পলাশী মনুমেন্ট’-এর আদলে পলাশী স্মারকস্তম্ভ। সিরাজউদ্দৌলা এবং তার পূর্ববর্তী নবাবদের স্মৃতিফলক ও দেয়ালচিত্র থাকতে পারে এই কমপ্লেক্সে। এখানে একটি অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে বিশেষত বাংলার নবাবদের কীর্তি এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ ও সংগ্রামের বই-পুস্তক, অডিও-ভিডিও, সিডি ইত্যাদি সংরক্ষণের ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা থাকবে। বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে অন্তত একটি বিশ্ববিদ্যালয় নবাব সিরাজউদ্দৌলার নামে হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। এ ছাড়া কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু, সামরিক স্থাপনা ও রণতরী নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তার পূর্বসূরি নবাবদের নামে নামকরণ করা যেতে পারে। এই নামকরণ ও স্মৃতিকমপ্লেক্স জাতি হিসেবে বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করবে।
এ দেশে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মহান স্মৃতিনিদর্শনগুলোর পাশাপাশি নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও তার পূর্বসূরিদের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে আলোচ্য সব পদক্ষেপ জনগণের চেতনায় দেশপ্রেমের উদ্দীপনা জাগাবে। এটা এ দেশে কোনো দখলদার বাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটলে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সেই অশুভ শক্তিকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য জনগণকে অনুপ্রাণিত করবে।
লেখক : সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও সাবেক অধ্যক্ষ, মেরিন ফিশারিজ অ্যাকাডেমি, চট্টগ্রাম
maakbd@gmail.com

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫