ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

মাহে রমজান

সাদাকাতুল ফিতরের গুরুত্ব

আলহাজ শাহ দিলাওয়ার হোসাইন

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:০০


প্রিন্ট

আরবি বছরের নবম মাসের নাম রমজান। রমজান মাসের গুরুত্ব, মর্যাদা এবং সম্মান অনেক বেশি। সাবালক ও সুস্থ নর-নারীর জন্য রোজা ফরজ। অন্য দিকে, ধনী-গরিব, ছোট-বড়, সুস্থ-অসুস্থ মুসলিম নর-নারীর ফিতরা প্রদান করা অবশ্যই কর্তব্য। এমনকি ঈদের নামাজের আগে সন্তান ভূমিষ্ট হলেও তার ফিতরা প্রদান করতে হবে। রোজা ও শরীরের জাকাত হিসেবে ফিতরা দিতে হয়। রোজার শেষে ঈদ উৎসব পালনে ধনীদের সাথে গরিবেরাও আনন্দ উপভোগ করতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রেখেই শ্রেষ্ঠ নবী ফিতরার ব্যবস্থা করেছেন।
দ্বীন ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে রোজা একটি। হিজরি দ্বিতীয় বছরে রমজান মাসে রোজা পালনের আদেশ হয়। এর উদ্দেশ্য হলো- কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার মাধ্যমে নিজের আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। এই সময়ে অন্তঃকরণ থেকে ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-মোহ, কাম-ক্রোধ সবকিছুই দূর করতে হবে। আগুনে পুড়ে সোনা যেমন খাঁটি হয়, তেমনিভাবে মহব্বতের সাথে একাগ্র চিত্তে রোজা পালনে অন্তঃকরণ পবিত্র হয়।
রোজার মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে। রোজার ও জীবনের পরিশুদ্ধি এবং গরিবের অভাব দূরীকরণের জন্য রোজার শেষে ঈদকে সামনে রেখে গরিবকে আনন্দ দেয়ার নিমিত্তে যে সাহায্য দেয়া হয় তাকে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। সারা মাস পানাহার ত্যাগ করা, শাখাওয়াত বর্জন করা এবং পাপাচার পরিহার করার শুকরিয়া আদায় করা হলো সাদাকাতুল ফিতর। রোজা পালনের সময় অহমিকা, গরিমা, রাগ, ঝগড়া ফ্যাসাদ, হিংসা ইত্যাদি ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্তি লাভের জন্য ফিতরা আদায় করা উচিত। ফিতরা দিতে হয় নিকটাত্মীয় গরিবকে, পরে দূর আত্মীয় প্রতিবেশী গরিবকে, নিঃস্ব, ইয়াতিম, অসহায় শিক্ষার্থী, মিসকিন, ঋণে জর্জড়িত ব্যক্তিকে এবং নওমুসলিম ব্যক্তিকে যে অসহায় অবস্থায় আছে।
প্রধান খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দেয়ার নিয়ম। আমাদের দেশে প্রধান খাদ্যদ্রব্য হলো চাল। তখন আরব দেশে চালের প্রচলন ছিল না বলে আটা, যব, খেজুর, কিশমিশ এবং পনির দিয়ে ফিতরা দেয়ার প্রচলন হয়। আটাকে দুই স্তরে ভাগ করা হয়। ১. সর্বনিম্ন স্তর হলো- অর্ধ সা আটা যা আমাদের মাপে এক কেজি ৬৫০ গ্রাম।
২. একটু ওপরে দ্বিতীয় স্তর এক সা আটা যা আমাদের মাপে তিন কেজি ৩০০ গ্রাম। অথবা যব এক সা অথবা খেজুর এক সা অথবা কিশমিশ এক সা অথবা পনির এক সা অর্থাৎ যা আমাদের মাপে তিন কেজি ৩০০ গ্রাম। পাঁচটি খাদ্যদ্রব্যের যেকোনো একটি খাদ্যদ্রব্য ফিতরা প্রদান করতে হবে। যদি কেউ খাদ্যদ্রব্যের বদলে মূল্য দিতে চান, তাহলে বর্তমান বাজার দরের স্থানীয় খুচরা মূল্য দেয়া উচিত। উল্লেখ্য, উন্নতমানের খাদ্যদ্রব্য অথবা তার মূল্য ফিতরা দেয়া কর্তব্য। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা কখনো পরিপূর্ণ ছওয়াব পাবে না, যে পর্যন্ত না নিজেদের প্রিয় বস্তু খরচ করবে। যা কিছু ব্যয় করো না কেন, আল্লাহ পাক তা খুব ভালো ভাবেই জানেন।’ (আল-কুরআন, চতুর্থ পারা, আয়াত-৯২)
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধনী-গরিব সবাইকে উপদেশ দিয়েছেন ফিতরা প্রদান করার জন্য। কেননা আল্লাহ পাক তাদেরকে বহুগুণ বেশি দান করবেন। আল্লাহ তায়ালা যাকে যেরূপ আর্থিক সুবিধা করে দিয়েছেন, সেই অনুপাতে তার দান করা কর্তব্য। কেননা একজন গরিব লোক সর্বনি¤œ হারে ফিতরা প্রদান করল। তার মিল রেখে যদি একজন ধনী লোক সেই পরিমাণ টাকা ফিতরা দেন তাহলে সঠিকভাবে বা ইনসাফপূর্ণ দান করা হলো না। আল্লাহ বলেন- ‘তোমাদের সামর্থ্য অনুসারে অন্যকে সাহায্য করো। কোনো প্রকার কৃপণতা করো না।’ সাদাকাতুল ফিতর খাদ্যদ্রব্যের বদলে মূল্য দান করলে গ্রহণকারীরা অনেক আনন্দ লাভ করেন। কেননা নগদ অর্থ পেলে নিজের প্রয়োজন তারা সহজেই মেটাতে পারেন। ঈদের আগে যাতে গরিবরা আনন্দ উপভোগ করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সহজেই করতে পারেন সেদিকে লক্ষ্য রেখে সাহায্য করা উচিত। যদি না পারা যায়, তাহলে ঈদের পরও দেয়া যায়। তবে ঈদের আগে দান করলে সত্তর গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে, আর ঈদের পর দান করলে এক গুণ সওয়াব পাওয়া যাবে। তাই তো জাকাত প্রদানকারীরা রমজান মাসেই জাকাত দিয়ে থাকেন। রমজানের রোজা এবং ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পার্থিব জগতের লোভলালসা কমে যায় এবং আখিরাতের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাও তাই। তখন সে পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে যায়।
রোজার মাসে যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগি করার অর্থ হলো-
মনের সব কালিমা দূর করা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া, মান অভিমান ভুলে যাওয়া, সবাই হাতে হাত, বুকে বুক মিলানো, সবার দেহ মন অভিন্ন থাকা, নিজের মনের হিংসা, ঘৃণা, লোভ, অহঙ্কার, অহমিকা, রাগ, ক্রোধ এবং বিদ্বেষসহ যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত করা। নবী করিম সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
‘রোজাদারদের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে। একটি হলো, সে যখন ইফতার করে এবং অন্যটি হলো, আল্লাহর সাথে সে যখন সাক্ষাৎ লাভ করবে। ঈদুল ফিতর হলো রোজাদার মুমিন মুসলমানদের জন্য পরম আনন্দ। ঈদের আনন্দ শুধু ধনীরা উপভোগ করবেন তা হয় না, বরং গরিব অসহায়রাও ঈদের আনন্দ ভোগ করবেন। তাই সাদাকাতুল ফিতর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদি কেউ ইচ্ছা করে উপরি উক্ত হিসেবের চেয়ে বেশি ফিতরা প্রদান করেন তাহলে অনেক উত্তম হবে, কিন্তু কম দেয়া যাবে না।
লেখক : প্রবন্ধকার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫