ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

মাহে রমজান

কুরআন নাজিলের মাস

আসাদুজ্জামান আসাদ

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৬:৪৪


প্রিন্ট

রমজান মাস। তাকওয়ার মাস। আত্মশুদ্ধির মাস, লাইলাতুল কদরের মাস। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস। কুরআন নাজিলের মাস। এ মাসে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর রোজা পালন করা ফরজ। ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা খোদাভীরু ও সংযমী হও।’ আল্লাহর এ বাণী থেকে বোঝা যায়, সিয়াম বা রোজা কেবল আমাদের ওপরই পালন করা ফরজ নয়, বরং পূর্ববর্তী সব নবী ও রাসূল সা:-এর ওপরও সিয়াম বা রোজা পালন করা ফরজ ছিল। ‘যারা তোমাদের পূর্বে ছিল’ এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এ শব্দ দ্বারা হজরত আদম আ: থেকে শুরু করে হজরত ঈসা আ: পর্যন্ত সব নবীর উম্মত এবং শরিয়তকেই বোঝানো হয়েছে।
মহান আল্লাহ তায়ালার কথা অনুযায়ী, এক মাস রোজা পালন করলেই মুত্তাকি বা তাকওয়াবান মানুষ হওয়া যাবে বলা হয়েছে। তাকওয়া অর্থ হচ্ছে- খোদাভীতি, আল্লাহকে ভয় করা। তাকওয়ার অর্থ- বাঁচা, আত্মরক্ষা করা, নিষ্কৃতি পাওয়া ইত্যাদি। পরিভাষায় তাকওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর ভয় ও তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় অপরাধ, অন্যায় ও অপছন্দনীয় চিন্তা, কথা ও কাজকর্ম থেকে আত্মরক্ষার মনোভাবকে তাকওয়া বলে। হজরত উমর রা: একদিন কাব আল আহবাররাকে জিজ্ঞেস করলেন, তাকওয়া কী? উত্তরে কাব রা: জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি কখনো কণ্টকাকীর্ণ পথে চলেছেন? তখন আপনি কী পন্থা অবলম্বন করেন? হজরত উমর রা: বলেন, সতর্ক হয়ে কাপড় গুটিয়ে চলেছি। কাব রা: বলেন, ‘এটাই তাকওয়া’। পৃথিবীর বুকে কাঁটা ছাড়ানো পথ রয়েছে, তা থেকে সতর্কভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার নামই হলো তাকওয়া।
সর্বশেষ আসমানি কিতাব আল কুরআন রমজান মাসে নাজিল হয়েছে। এ মাসে অন্যান্য আসমানি কিতাব ও সহিফা আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেছেন। হজরত আবুজর গিফারি রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হজরত রাসূল সা: বলেছেন, হজরত ইব্রাহিম আ:-এর ওপর সহিফা ৩ রমজানে, হজরত মুসা আ:-এর ওপর তাওরাত ৬ রমজানে, হজরত ঈসা আ:-এর ওপর ইঞ্জিল ১৩ রমজানে এবং হজরত দাউদ আ:-এর ওপর জবুর ১৮ রমজানে অবতীর্ণ হয়েছে। আসমানি কিতাব মহাগ্রন্থ আল কুরআন রমজান মাসের ২৪ তারিখে বায়তুল ইজ্জতে একসাথে নাজিল হয়েছে (মাজহারি)। ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে।’ (কদর)। তিনি আরো বলেন, ‘আমি তো এ কুরআন অবতীর্ণ করেছি এক মোবারক রাতে।’ (দুখান)। ‘রমজান মাসই হলো সে মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য রয়েছে।’
রমজান শব্দটি ‘রমজ’ ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ দহন বা পোড়ানো। আবার রোজার আরবি শব্দ ‘সাওম’। সাওমের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার এবং স্ত্রীসহবাস থেকে বিরত থাকার নাম সাওম। রমজান মাসের প্রথম ১০ দিন রহমতের, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাতের এবং শেষের ১০ দিন দোজখ থেকে মুক্তি লাভের জন্য নির্ধারিত। রমজান মাসে সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, চুরি, ডাকাতি, জিনা, ব্যভিচার, হিংসাবিদ্বেষ, হানাহানি, মারামারি, আত্ম অহঙ্কারসহ সব কিছু ভুলে সুখী সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। প্রত্যেক মুমিন বান্দার জন্য আনন্দ হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আনন্দ লাভের রাস্তা হলো রমজান মাসে রোজা পালন করা। এ মাসে ৩০টি রোজা পালন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। বিশ্বনবী সা: বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দদায়ক সময়, একটি ইফতারের সময় এবং অন্যটি আল্লাহর দিদারের সময়।” হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আল্লাহ বলেন- রোজা আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেবো’।
রমজান মাসের সম্মান ও মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে বিশ্বনবী হজরত রাসূল সা: বলেন, ‘যখন রমজান মাস আগমন করে তখন জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে শিকল পরানো হয়।’ ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে একনিষ্ঠ সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে তার পেছনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে’। ‘রোজা ঢালস্বরূপ। যদি তোমাকে কেউ গালি দেয় অথবা আঘাত করে, তবে বলবে ভাই আমি রোজা রেখেছি’। ‘দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে আরেক জুমা, এক রমজান থেকে আরেক রমজান এদের মধ্যকার সব গুনাহ মুছে ফেলে। যদি কোনো ব্যক্তি কবিরাহ গুনাহ থেকে বিরত থাকে তার জীবনের সব গুনাহ ক্ষমাহ করা হবে।’ হজরত সালমান ফারসি রা: থেকে বণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন- ‘হে লোক সকল, তোমাদেরকে ছায়া দান করতে যাচ্ছে একটি মহান মাস, একটি মোবারক মাস। এ মাসে এমন একটি মহান রাত রয়েছে, যে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ এ মাসের সিয়ামকে ফরজ এবং কিয়ামকে নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল কাজ করবে সে অন্য মাসে একটি ফরজ কাজ করার সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ কাজ করবে সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ কাজের সওয়াব পাবে। মাসটি হলো ধৈর্যের মাস, যার পরিণতি হলো জান্নাত। এ মাস হলো সহমর্মিতার। এ মাস এমন মাস- যাতে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীনস্থদের বোঝা হালকা করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দেবেন। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন- আমার উম্মতকে রমজান মাসে পাঁচটি বিশেষ গুণ দান করা হয়েছে, যা তাদের আগে কাউকে দেয়া হয়নি। যথা : ১. রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের চেয়ে উত্তম। ২. ইফতার না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাদের জন্য দোয়া করতে থাকবেন। ৩. রোজাদারের জন্য প্রতিদিন আল্লাহ জান্নাতকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন এবং বলেন, আমার নেক বান্দারা দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে অচিরেই এখানে পৌঁছবে। ৪. অবাধ্য শয়তানকে এ মাসে বন্দী করে রাখা হয় বলে অন্য মাসের মতো এ মাসে তারা পাপকাজ করতে পরে না। ৫. রমজান মাসের শেষ রজনীতে তাদের ক্ষমা করে দেয়া হয়। রাসূল সা:কে বলা হলো, তা কি লায়লাতুল কদর? জবাবে তিনি বলেন- না, বরং শ্রমিক তার কাজ পূর্ণ করলেই তাকে পারিশ্রমিক দেয়া হয়। ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কেউ একটি রোজা রাখবে, তিনি তাকে দোজখের অগ্নি থেকে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন।’ ‘রোজাদার পরনিন্দা থেকে বিরত থাকলে সমস্ত দিবসই তার ইবাদত রূপে গণ্য হবে। হালাল বস্তুর দ্বারা ইফতার করে ওই সময় দোয়া করলে রোজাদারের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। যে রোজাদার মিথ্যা কথা পরিত্যাগ করতে পারেনি, খোদা তার রোজার প্রতি রাজি নন।’
রমজান মাসে ব্যবসায়ীরা অধিক লাভের আশায় ওজনে কম, দামে বেশি পাওয়ার জন্য নানা রকম চালাকি করে থাকে। অনেক রোজাদার ভালো জিনিসের সাথে খারাপ জিনিস মিশিয়ে রোজাদারকেু ঠকানোর চেষ্টা করে থাকেন। পার্থিব জীবনে প্রত্যেক মানুষ সুখ-শান্তি, মান-সম্মান, রিজিক ও সম্মান বৃদ্ধির কামনা করেন। প্রত্যেকেই নিজের যোগ্যতা মোতাবেক মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। অথচ পরকালের অসীম জীবনের প্রয়োজনে আমরা কতটুকু সময় ও শ্রম ব্যয় করি। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো যেমন ভয় করা উচিত এবং আত্মসমর্পণকারী হওয়া ছাড়া মৃত্যু বরণ করো না।’ আল্লাহকে ভয় করা ছাড়া পরকালের সফলতা লাভ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ইরশাদ হচ্ছে- ‘আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের মনের সব বিষয় সম্পর্কে খবর রাখেন।’ অন্য জায়গায় বলেছেন- ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়েই জানেন।’ ‘যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা জাতি হিসেবে সৃষ্টি করে দিয়েছেন পূর্ণ স্বাধীনতা। মানুষের সব চাওয়া-পাওয়া পূরণের জন্য প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। কোনো মানুষের পক্ষে সব কর্ম চাহিদা পালন করা সম্ভব নয়। কিন্তু যাদের মাঝে খোদাভীতি বা তাকওয়া রয়েছে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি কাজ করা খুবই সহজ করে দেবেন। ইরশাদ হচ্ছে- ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার কাজ সহজ করে দেন’। রমজান মাস রোজা পালনের মাস। দীর্ঘ এক মাস রোজা পালনের মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জন করি। রোজার শিক্ষা, নৈতিকতা ‘প্রশিক্ষণ’ বাস্তব জীবনের পাশাপাশি সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করি। রোজা পালনের মাধ্যমে ধনী-গরিবের পার্থক্য ভুলি। দুঃখ-কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি। রমজান মাসে দিনে রোজা পালন এবং রাত জেগে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করি। ঈমানের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আল্লাহর আনুগত্য করা- এই হোক সবার জীবনের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫