ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

লেখক ও তার দায়বদ্ধতা

ফাতিমা আলী

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৬


প্রিন্ট

লেখকের দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনার আগে জেনে নেয়া প্রয়োজন একজন লেখকের সংজ্ঞা কী। সাধারণভাবে বলতে গেলে লেখক হচ্ছেন তিনি যিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন। লেখক মানেই কি সাহিত্যিক? সব সাহিত্যিকই লেখক, তবে সব লেখকই সাহিত্যিক নন। যখন একজন লেখক তার লেখার মাধ্যমে নাটককে আলোড়িত করেন এবং যিনি পাঠক ও সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সিদ্ধহস্ত, তাকেই আমরা সাহিত্যিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে থাকি। তিনি সমাজকে যেমন উজ্জীবিত করতে সক্ষম আবার অগ্রসর করতেও পারঙ্গম। কাজী নজরুল ইসলাম এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আবার সমাজে কোনো উপেক্ষিত বিষয়কে উপস্থাপন করে আলোড়ন সৃষ্টি করার সক্ষমতাও তার রয়েছে। তবে লেখক হচ্ছেন যেকোনো সৃষ্টিশীল রচনার পশ্চাতের মানুষটি। এ ক্ষেত্রে লেখার পরিসর কিন্তু বিবেচ্য বিষয় নয়। লেখার গুণগত মানকেই প্রাসঙ্গিক ভাবা হয়ে থাকে। তাই কম লিখেও কোনো কোনো লেখক কালজয়ী হতে সক্ষম হয়েছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, কবি জীবনানন্দ দাশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ও তদ্রুপ সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সংবর্তিকা। রচয়িতা তার একটি সৃষ্টির মাধ্যমে লেখক থেকে সাহিত্যিকের পদমর্যাদায় উন্নীত হতে পেরেছেন। তাই সাহিত্যিক সর্বদাই কালজয়ী ও সার্বজনীন।
লেখক বা সাহিত্যিকদের শ্রেণিবিভাগ আছে। লেখার মৌলিকত্ব, ভিন্ন স্বাদ ও সার্বজনীনতা তাদের শ্রেণিবিন্যস্ত করে। লেখার প্যাটার্ন বা প্রকৃতি অনুযায়ী একজন সাহিত্যিক বা লেখক কখনো প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক, কীব, গীতিকার বা গবেষক ইত্যাদি শ্রেণীভুক্ত হয়ে থাকেন। কোনো কোনো লেখক একাধিক বিষয়ে পারঙ্গম হন। লেখক বা সাহিত্যিক সর্বদাই সভ্যতার চলমান সাক্ষী ও সমাজের দর্পণ। তাই সমাজের ব্যানারে তাদের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বা কর্তব্যের অধীন হতে হয়। এ প্রসঙ্গে আবুল ফজল বলেছেন, লেখকের জন্য লেখার শাসন ছাড়া অন্য কোনো শাসন নেই। লেখককে আমরা শিল্পী হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পারি। শিল্পের শাসনে তিনি যুগপৎ বন্দী আবার স্বাধীনও। এই শিল্পের শাসন বলতে আমরা বুঝি ক্যানভাসে রঙ যেন শুধু আঁচড় না হয়ে তা যেন বিষয় বা বর্ণনা হয়ে ওঠে। তাই লেখা যেন শুধু শব্দগুচ্ছ নয়, তা যেন বক্তব্য হয়ে ওঠে। পাঠক যেন লেখার মধ্যে তার চিন্তার স্ফুরণ খুঁজে পায়। লেখকের চিন্তা ও চেতনার সাথে পাঠকের রুচি ও পছন্দের এক সেতুবন্ধ রচিত হয়। লেখক তার অভিজ্ঞতার আলোয় এক নিগূঢ় ক্ষমতাবলে তা সুসংগঠিত করে থাকেন। কোনো বিষয় সম্পর্কে অনুধাবন করা আর তাকে পাঠকমহলে বুদ্ধিগ্রাহ্য বা মনোগ্রাহী করে তোলা এক বিষয় নয়। পাঠকের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্যতার কলাকৌশল আয়ত্ত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সাদাত হাসান মিন্টো বলেছেন, ‘সাহিত্যের প্রদীপ লেখকের মগজের তেল দিয়ে জ্বলে। তাই লেখক একজন সাধারণ মানুষ নন। তারা হন প্রচণ্ড অনুভূতিপ্রবণ।’ তাই একজন সাধারণ মানুষ যখন নদীর পানিতে ভেসে যাওয়া নৌকা অবলোকন করেন তখন একজন লেখক নদীর তরঙ্গে আকাশের নীল, মেঘের লালিত্য কিংবা সূর্যের সোনালি বিভা দেখতে পান। দুই তীরের জনপদকে মনে হয় শিল্পীর তুলিতে আঁকা প্রকৃতির প্রতিচ্ছবি। কোনো টিনের চালে বসে থাকা কোনো পাখি তাকে আনমনা করতে পারে। কিশোরীর পায়ের নূপুরকে মনে হতে পারে শ্রেষ্ঠাভরণ। একটি সাধারণ দৃশ্য লেখকের দৃষ্টিতে অসাধারণ হয়ে উঠতে সক্ষম। তাই সার্থক লেখকের লেখা শুধু লেখা নয় তাকে মনে হবে ‘সৃষ্টি’।
লেখক সহজ বা দার্ঢ্য যেভাবেই লিখন, তাত্ত্বিক বা রম্য যা-ই রচনা করেন তার প্রধান লক্ষ্য হবে নাটকপ্রিয়তা অর্জন করা। একটি লেখা পাঠককে করতে পারে আত্মসচেতন। ভুল ও সঠিকের প্রার্থক্য অনুধাবন করানো। পাঠক কোনটি বেছে নেবে এটি তার নিজস্ব ব্যাপার। তাই সমাজের কাছে তার দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। লেখকের উদ্দেশ্য সমাজের কল্যাণ সাধন, লেখক পাঠকের উপকার করতে সক্ষম নাও হতে পারেন, কিন্তু কোনো প্রকার ক্ষতি করতে পারেন না। লেখকের প্ররোচনা বা ভুলে সমাজ মারাত্মক ক্ষতি করে ফেলতে পারে। যেমন পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল লেখা যুবসমাজকে বিপথে তাড়িত করতে পারে। একজন ডাক্তার শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কাছে মানবশরীরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিলেও তাকে অশ্লীলতাদুষ্ট বলা যাবে না। কিন্তু একজন লেখক এসব নিয়ে কিছু রচনা করতে পারেন না। কারণ এটি মানুষকে রিপুতাড়িত করতে পারে, অপ্রাপ্ত বয়সের ছেলেমেয়েদের অপরিমেয় ক্ষতি করতে পারে। তাহলে সাহিত্যে কি যৌনতার কোনো স্থান নেই? সাহিত্যে অবশ্যই যৌনতার স্থান আছে। তবে তা যেন অনাবশ্যক বা অহেতুক না হয়ে ওঠে। এর ব্যবহার যেন অপরিহার্য এবং শৈল্পিক হয়ে ওঠে। তাই সাহিত্যে যৌনতা ও ভায়োলেন্স ইত্যাদি যথাযথ, পরিমিত ও অত্যাবশ্যক হওয়া জরুরি। লেখা যখন সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে ওঠে তখন তাকে সমাজের প্রতিবিম্ব বলা হয়। মানুষ যেন লেখার মধ্যে খুঁজে পায় অনুপ্রেরণা, দুঃখ-যন্ত্রণা, সান্ত্বনা ও হাসি-কান্নার উপকরণ। মনুষের মনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করার এমন বিশাল মাধ্যম আর দ্বিতীয়টি নেই। সিনেমা, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের চেয়েও সাহিত্য অনেক বেশি শক্তিশালী।
লেখক সর্বদাই অনুভূতিপ্রবণ ও আবেগপ্রবণ। তবে তাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ পরিশীলিত না হলে সেই লেখা পাঠকপ্রিয়তা অর্জিত হওয়া দুঃসাধ্য, লেখাটি তার গাম্ভীর্য বা পাঠ্যতা হারিয়ে খুব সাধারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই লেখাটির অবয়ব খুব সুচারু হওয়া উচিত। বর্ণনা যেন সাধারণ এবং সুলভ মনে না হয়। একজন লেখক পারেন পাঠকের নির্ভুল বা সাব-কনসাস মনে চেতনার ঝড় তুলতে। একজন লেখক বা কবি যখন বলেন, ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার’ তখন লেখাটি হয়ে ওঠে পরিপুষ্ট, বলিষ্ঠ ও সার্বজনীন। এর চেয়ে সঠিক ও সৎ আর কী বা হতে পারে। তাই কবি যখন মানচিত্র চিবিয়ে খেতে চান তখন তারুণ্যের দ্রোহ বা বিক্ষোভ প্রচণ্ড হয়ে ওঠে।
প্রাপ্য যখন অনাদায়ী থাকে তখন মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়তে পারে। তাই ক্ষোভ বা দ্রোহ সমাজকে ভেঙে তছনছ করে দিতে পারে। একজন অত্যাচারী শাসককেও সবলে ছুড়ে ফেলতে পারে। এ শক্তি অপরিমেয়- অফুরান।
লেখা সর্বদাই সময়ের প্রতিভূ। এখনকার লেখা ভবিষ্যতে সময়ের চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা হয়। ভাব, ভাষা, সমাজব্যবস্থাসহ সর্ববিষয় পরিজ্ঞাত করে। তাই লেখার মূল্য অপরিসীম। লেখা শুধু সে সময়ের ভাষাকেই আলোকপাত করে না- লেখা বর্তমান সমাজ বা মানুষের প্রতিটি বিষয়কেই প্রতিফলিত করে। তাই লেখককে সর্বদাই দূরদর্শী, স্বতন্ত্র, সত্যসন্ধানী ও প্রাঞ্জল হওয়া জরুরি। লেখার পরিসর যত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়- ভাষার পরিকাঠামোগত পরিবর্তনও ক্রমেই সম্প্রসারিত ও বিবর্তিত হয়। তাই রাবীন্দ্রিক ভাষা এখনকার ভাষার সমতুল্য নয়। তখন চলিত ভাষার ব্যবহার কদাচিত হতো। বক্তব্য সহজ ও প্রাঞ্জল ছিল। কিন্তু আজকের ভাষা কথ্যভাষা কিন্তু সহজ-সাধারণ নয়, বরং রূপকধর্মী। ভাষা শাণিত ও অনেক বেশি দার্ঢ্য। বক্তব্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিষয়ানুগ। সময় তার ভাষাকে পরিস্ফুট করে আর লেখককর্তৃক তা সংরক্ষিত হয়ে থাকে।
এখন একটি প্রশ্নের অবতারণা হতে পারে যে, লেখক ভাষাকে অনুসরণ করে নাকি ভাষা লেখককে অবলম্বন করে। মূলত মানুষের ভাষাকে পরিমার্জিত, পরিবর্তিত ও আধুনিক করে তোলার দায় সবচেয়ে লেখকের বেশি। যে কারণে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের ভাষা দুই ধরনের এবং দুটোই গ্রহণযোগ্য। এঁদের ভাষা থেকে জীবনানন্দ দাশ, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ভাষা ভিন্ন আঙ্গিকের। আবার কবি আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের লৈখিক শৈলী বা স্টাইলও ভিন্নতর। যে যার স্বমহিমায় স্বতন্ত্র, নন্দিত— গৃহীত। তাই লেখা শুধু সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিতই হয় না, একই সময় একাধিক স্টাইলকে গ্রহণ ও ধারণ করে। এখানে একটি বিষয় পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে- তা হলো লেখকদের মধ্যে পৃথক পৃথক স্টাইল বা ঘরানা থাকা প্রয়োজন। এটাই একজন লেখককে স্বমহিমায় প্রোজ্জ্বল করে এবং নন্দিত হন। এটি যারা পেরেছেন তারা সাহিত্যের একেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
একসময় সাহিত্যের ভাষা ছিল দুর্বোধ্য, দার্ঢ্য ও পুস্তকের। অর্থাৎ এসব কখনো সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল না। সাধারণ মানুষের পক্ষে বোধগম্যও ছিল না। কালক্রমে ভাষা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। পুস্তকের সাধু ভাষার পরিবর্তে শিক্ষিত মানুষের কথ্য ভাষা বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। একসময় ভাষা মূলত বর্ণনামূলক ছিল। কিন্তু এখনকার ভাষা অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও রূপকধর্মী। ভাষা তার গুরুগম্ভীরতা হারিয়ে অনেক বেশি সহজ হয়ে উঠেছে। ভাষার চেয়ে বিষয়ের গুরুত্ব বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এখনকার লেখা পরিমিত ও নাতিদীর্ঘ। কিন্তু এর ব্যাপ্তি অনেক বেশি। কবিতার একটি চরণ শুধু স্লোগানই নয়- কবিতাও হয়ে উঠছে। তাই আধুনিক লেখা এখন অনেক বেশি নিপুণ, প্রাজ্ঞ ও কৌশলী।
পরিশেষে এ কথা বলতেই হবে যে, এখনকার লেখার ব্যাপ্তি যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, লেখকের দায়বদ্ধতাও ততোধিক বেড়ে গেছে, মধ্যযুগের লেখকেরা রাজা-বাদশাদের কাহিনী, অমর প্রেমগাথা, নানা ধরনের উপকথা, ধর্মীয় পুস্তকের বঙ্গানুবাদ ইত্যাদি লিখতেন। এগুলোর বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা খুব বেশি ভিন্নতর হতো না। কিন্তু এখন রবীন্দ্রনাথ মাত্র একজনই, কাজী নজরুল কিংবা জীবনানন্দ দাশও এক ও অদ্বিতীয়। যেসব লেখক তাদের নিজস্ব ঘরানা তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা উপগ্রহের মতো সন্নিকটে থেকে আলো বিতরণ করেছেন বা করছেন। তারা শুধু উপগ্রহ, যার কোনো নিজস্ব আলো নেই। অন্যের আলো ধার করে চলাই তাদের কাজ। প্রকৃত লেখক বা সাহিত্যিক হবেন নক্ষত্রের মতো জ্যোতির্ময়। এর কোনো বিকল্প ভাবার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫