ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

বিবিধ

সুফিয়া কামাল-এর কবিতাদর্শন

ড. ফজলুল হক সৈকত

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:৪৪


প্রিন্ট

বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যকর্মী এবং সমাজসেবক কবি সুফিয়া কামালের (জন্ম : ২০ জুন : ১৯১১; মৃত্যু : ২০ নভেম্বর ১৯৯৯) জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রায়-প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে আমরা। কবির জন্ম বরিশালের শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারে। তার মায়ের নাম নবাবজাদী সৈয়দা সাবেয়া খাতুন। বাবা সৈয়দ আবদুল বারি। পৈতৃক নিবাস বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। শৈশবে নানার বাড়িতে থাকাকালে বহুভাষায় পণ্ডিত বড় মামার সান্নিধ্য এবং তার সমৃদ্ধ লাইব্রেরির সংস্পর্শে সুফিয়া জ্ঞানচর্চার প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। আগ্রহ আর প্রচেষ্টার ফলে তিনি ক্রমান্বয়ে নিজেকে স্বশিক্ষিত করে তোলেন। মায়ের সহযোগিতায় বাংলা ভাষাও ভালোভাবে রপ্ত করেন তিনি। আর তখন থেকেই গ্রন্থ-পত্রিকা পড়তে পড়তে সাহিত্যচর্চায়ও অনুপ্রাণিত হন। পারিবারিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা, রক্ষণশীলতার কঠোর-কঠিন বেড়াজাল আর সামাজিক সংস্কার ভাঙার চিন্তা হয়তো তিনি শৈশবের পাঠনিবিড় পরিবেশেই আত্মস্থ করেছিলেন।
সমাজলগ্ন এবং রাষ্ট্রচিন্তক সুফিয়া কামালের ভাবনা-পরিসর মানবকল্যাণের মহাপথে প্রসারিত ছিল। মসৃণ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। ব্যক্তিস্বাধীনতাবোধ আর জ্ঞানী-গুণীদের সঙ্গে পরিচয়ের আকাক্সক্ষা ও আনন্দ তার উপলব্ধির প্রখরতা নির্মাণে সহায়ক শক্তি হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন; মর্যাদার দৃষ্টিতে মূল্যায়নও করতেন। তার সৃষ্টিশীল কর্মরাজি বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে। রবীন্দ্র-নজরুল যুগের এই নরমকণ্ঠ কবি তিরিশোত্তর ধারায় কবিতা না লিখেও আপন আসন স্থিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সৃজনশীলতা আর চিন্তা-সামর্থ্যরে কারণে। সমাজ-সম্পৃক্ততা তার চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য। কবি ছাড়াও তিনি ছিলেন সমকালের প্রশংসনীয় সমাজসেবক-সমাজসংস্কারক। ‘সাঁঝের মায়া’ (১৯৩৭) তার সর্বাধিক প্রচারিত ও পরিচিত কবিতাগ্রন্থ। তার অন্যান্য কাব্যগুলো হলো : ’মায়া কাজল’ (১৯৫১), ’মন ও জীবন’ (১৯৫৭), ’উদাত্ত পৃথিবী’ (১৯৬৪), ’দীওয়ান’ (১৯৬৬), ’প্রশান্তি ও প্রার্থনা’ (১৯৬৮), ’অভিযাত্রিক’ (১৯৬৯), ’মৃত্তিকার ঘ্রাণ’ (১৯৭০), ’মোর যাদুদের সমাধি ’পরে’ (১৯৭২)। প্রকৃতি-রোমান্টিকতা-প্রেমবোধ, সংসার-বিরহ-যন্ত্রণা, সমাজের অগ্রগমন-ভাবনা তার কবিতাভুবনের প্রধান প্রধান উপাদান। উপন্যাস, নাটক, শিশুতোষ রচনা, দিনলিপি, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী তার সৃজনঝাঁপির ওজন ও মূল্য বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। এ ছাড়া ইংরেজি-রুশ-জার্মান-ইতালীয়-পোলিশ-চীনা-ভিয়েতনামী-হিন্দি-উর্দু প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদের মধ্য দিয়ে তার কবিতা বিশ্বসাহিত্য-পরিমণ্ডলে বাঙালির সৃজনশীলতার ঐতিহ্য বিস্তারধারাকে সম্প্রসারিত করেছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের যাতনা-গ্লানি তার কবিতা যাপনের প্রথমপর্বের আশ্রয়ভূমি হলেও পরবর্তীকালে তিনি জাতীয় জীবন এবং রাষ্ট্রের বহুবিধ অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম-অর্জনকে আত্মস্থ করেন সাফল্যের সাথে। আর সম্ভবত ’সাঁঝের মায়া’ কবিতায় রোপিত হয়েছিল সে বীজ। তিনি লিখেছেন : ’মুক্তি লভে বন্দী আত্মা-সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে,/ নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক, পুষ্প-বিকাশের প্রয়োজনে।’
সাত বছর বয়সে সুফিয়ার কবিতা রচনার আরম্ভ। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রথম লেখাটি ছিল একটি ছোটগল্প। যখন তার বয়স মাত্র বারো বছর, তখন বরিশাল থেকে প্রকাশিত ‘তরুণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার ‘সৈনিক বধূ’ গল্পটি। তার প্রায় তিন বছর পর ‘সওগাত’ পত্রিকায় ছাপা হয় তার ‘বাসন্তী’ নামক কবিতা। সেই থেকে শুরু। তারপর কত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে- শিল্পের পথ, কবিতার পথ, সৃজনের পথ, প্রতিবাদের পথ। সাথে পাথেয় হিশেবে রেখেছেন অনুভব-জ্ঞান; তার ভাষায়-
প্রিয় বিরহের নিশি হয়ে আসে মিলন স্বপ্নে ভোর,
আর খেদ নাই, এই মুছিলাম দু’নয়ন হতে লোর।
নব প্রভাতের রবিকরে জাগা এ জীবন ওঠে জেগে,
পৃথিবীর পথে কত যে বিথার, কাল চলে কত বেগে!
আমিও তো আছি বিপুল ভুবনে, বিশাল কর্ম পথে
চলিতে হইবে, কত দিন রাত শেষ নাহি হতে হতে- (প্রিয় বিরহের নিশি)
সময় যেন তার প্রবল প্রতিপক্ষ; শেষ করতে হবে কাজ। তাই নেই কোনো অবসর। সত্যিই, সুফিয়া কামাল যেন অবসরযাপন একরকম ভুলেই থেকেছেন সারাটি জীবন। তার কর্মময়-বর্ণাঢ্য জীবন আমাদেরকে তো সেরকমই ভাবতে বাধ্য করে।
প্রশাসনিক প্রতিকূলতা আর সামাজিক কূপমণ্ডুকতার আবর্তে বাঙালি জনজীবন যে ক্রমান্বয়ে হিমশীতল অন্ধকারের গভীরে নিপতিত হচ্ছে, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রাগ্রসর চিন্তার ধারক ও লালনকারী কবিতাকর্মী সুফিয়া কামাল। তিনি দেখতে পেয়েছেন আমাদের চার পাশের পরিচিত অধ্যায়গুলো দিন দিন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে; যেন ধরা যাচ্ছে না কিছুতেই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর ঐতিহাসিক-ঐতিহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির এই অভিব্যক্তি তার কবিতায় আমরা প্রকাশ পেতে দেখি :
এখানে অনেক মেঘ-
ঢাকার আকাশে এখন অনেক মেঘ-
এ মেঘ এসেছে দখিন সাগর হতে,
সেখানে তোমার অনেক দীর্ঘশ্বাস
দিনে দিনে জমে মেদুর করেছে
ছেয়েছে এই আকাশ। (অকাল মেঘ)
দেশীয় পরিমণ্ডল পেরিয়ে সুফিয়ার কবিদৃষ্টি আন্তর্জাতিক পরিসীমায়ও প্রসারিত ছিল। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি এবং সভ্যতার ক্রমাগ্রগতি ও অনিবার্য আঘাতের চিহ্ন তার কবিতায় বুলিয়েছে চিন্তার প্রলেপ; অভিশাপ আর অবদমনের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি থেকে মানবতার মুক্তির আনন্দ আশাবাদের প্রেরণা হিসেবে হাজির হয়েছে তার কবিতা-পরিসরে। দূর আফ্রিকার মানুষের কষ্ট আর প্রাপ্তির প্রসন্নতাকে তিনি তুলে আনছেন এভাবে-
আফ্রিকার কালো বুকে জ্বলিয়াছে আলো, রাত্রি শেষ
মুমূর্ষু সিংহের চক্ষে মৃত্যুর আবেশ।
সে আবেশ ক্লান্তি নয়, জীবনের অদম্য ইশারা
আফ্রিকার ঘনারণ্যে জাগাইয়া তুলিয়াছে সাড়া। (লুমুম্বার আফ্রিকা)
জাতি-রাষ্ট্রের পরাধীনতা-শোষণের পথ-পরিক্রমায় সুফিয়া ছিলেন শান্তি-অন্বেষার প্রতীক।
ব্রিটিশ কবলিত সামাজিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দেশভাগ-পরবর্তীকালে শাসক-শোষকের হাতবদলে পাকিস্তানের অবদমননীতি এবং পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক আচরণের দিন-সমাপ্তির আবাহন-ইঙ্গিত দাগ কাটে তার কবিতা-কাঁথায়। ভারত-পাকিস্তান বৈরি-সম্পর্কেও কালে তিনি অনুভব করেন আসন্ন গণ-জাগরণ এবং মুক্তির সুবাতাস। কবি লিখছেন- ‘আর নাই দেরি,/ গভীর রাত্রি শেষ হয়ে এলো, এবার প্রভাত ফেরী/ শোনা যায় ওই। পূর্ব অচলে প্রভাত রবির কর/ দিগন্তব্যাপি আঁধার নাশিয়া আসিছে তিমিরহর।’ (কারান্তরালে জমীলা) অতঃপর ‘ঊনসত্তুরের এই দিনে’ কবিতায় তিনি গণ-অভ্যুত্থানের জন-আবেগ সম্বন্ধে জানাচ্ছেন- ‘শুনি সেই অবিনাশী বাণী/ অন্তর উদ্বেল হয়ে প্রাণাবেগ করে কানাকানি,/ জনতা সমুদ্রে জাগে ঢেউ,/ দিতে এ পাথার পাড়ি পশ্চাতে রবে না আর কেউ’।
‘বাতাসে বারুদ’, ‘ধূলায় রক্ত’ মায়েদের খালি কোল, প্রার্থনার ভঙ্গি, অশ্রু-অবিনাশী, ভেসে-বেড়ানো অফুরন্ত সঙ্গীত, উত্তাল রাজপথ আর নদীর প্রবাহধারা দেখতে দেখতে; ’বাংলা অমর মহান’ খুঁজতে খুঁজতে কবি সুফিয়া কামাল সমাজের কল্যাণমালা গলায় পড়ে পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ। ঘরে-ঘরে, দ্বোরে-দ্বোরে জয়টীকা অর্পণের আশা-যাপনের মাহাত্ম্যে আর ’মাটির দেনা’ শোধ করার প্রত্যয়ে তাঁর কবিতা কাল ও কালোত্তরে বহন করবে অশেষ শক্তি; ’দানবের অস্ত্রের আঘাতে অঙ্গহীন, সঙ্গীহীন, সহায়-সম্বলহারা’ অগণন যুদ্ধাহতের এই দেশে গৌরবের উদ্বিগ্ন ব্যথায়-আনন্দে নতুন প্রজন্মকে জানাবে উদার আহ্বান। কেননা, তাঁর বিশ্বাস-
একদা অরণ্য কন্যা জাগিয়া জ্বালিবে দাবানল
দলিতা নাগিনী তার নিঃশ্বাসে ছড়াবে হলাহল।
যত দীর্ঘ হোক দিন, একদিন হবে অবসান
রুদ্ধ হবে মূঢ়তার আত্মম্ভরিতার জয় গান!
(অরণ্য কন্যারা জাগে)
অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র, যোগ্যব্যক্তির মূল্যায়ন, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা প্রবর্তন-প্রচেষ্টার এই মহাকালে তার এই অনুভব এক অসামান্য ভবিষ্যৎবাণী।
রাষ্ট্রীয় গণ-আন্দোলনে নেতৃত্বদানের স্বীকৃতি হিশেবে কবি সুফিয়া কামাল পেয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্মান; সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে ‘লেনিন পুরস্কার’ প্রদান করে। এই বিরল সম্মানের পুরস্কার বাংলাদেশের আর কেউ লাভ করেননি। জাতীয় জীবনে চলার পথে তিনি মাতৃহৃদয়ের কোমলতা আর অপরিসীম সাহস নিয়ে সর্বদা অগ্রগামী থেকেছেন; ক্রমাগত নির্মাণ করেছেন ভূমিকাবহুল বৈচিত্র্যঘন যাপিত-জীবন।
দুর্দিনে এবং সঙ্কটকালে সুফিয়া কামাল জাতিকে অন্ধকারের বিভীষিকা থেকে মুক্ত করে আলোর পথে দাঁড় করানোর জন্য যে পরামর্শ ও নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা নিশ্চয়ই প্রজন্মান্তরে অনুকরণীয়-অনুস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শোষণ-বৈষম্যহীন এবং মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষা-পদ্ধতি প্রবর্তন, নারী-পুরুষের সমান মর্যাদাপূর্ণ সমাজ-কাঠামো নির্মাণ, আইনের শাসন নিশ্চিকরণসহ সমকালীন যাবতীয় প্রগতিশীল চিন্তাধারায় সুফিয়া কামালের জীবনাদর্শ আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫