ঢাকা, শুক্রবার,১৮ আগস্ট ২০১৭

গল্প

জবরদখল

আশরাফ উদ্দীন আহমদ

২২ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৩:৪১


প্রিন্ট

বিলমালোয়ের লোকেরা আবার একটা হাঙ্গামা দেখার অপেক্ষা করতে থাকে। খুনোখুনি-রক্তারক্তি এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। কেউ যেন নেই এর বিহিত করার। মানুষ ক্রমেই ভয়াবহ রূপে নিজেকে পরিণত করতে পেরেছে। ভালোবাসা-সম্প্রীতি স্নেহ-মায়া কি তবে শুধুই কথার কথা। যুদ্ধই কি শেষ অস্ত্র, যুদ্ধ দিয়েই কি তবে সমস্ত সমাধান পরিমাপ করা হয়। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, এই যুদ্ধ কোনো দিন শেষ হওয়ার নয়। মানুষ আদিকাল থেকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ করছে, যেন মায়ের গর্ভ থেকে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা রপ্ত করে এসেছে। কিন্তু মাটির জন্য যুদ্ধ অর্থাৎ মায়ের জন্য যুদ্ধের তো শেষ নেই, তারপর কি হবে তাও কেউ জানে না।
বিলমালোয়ের আশপাশে দেওপাড়া-বোয়ালিয়া দামনাশ-এনায়েতপুর এবং শালজোড়ের লোকেরা এই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করে প্রতিনিয়ত। টিকে থাকার এই লড়াই পুরুষানুক্রমে চলছে এ অঞ্চলে। কারণ বিলমালোয়ের শত-সহস্র জমি খাসজমি হয়ে গেছে সেটেলমেন্ট রেকর্ডে। বত্রিশ/সাতচল্লিশ এবং বাষট্টি সালের রেকর্ডে যার নাম লিপিবদ্ধ আছে, তারা কেউই আর বাহাত্তরের রেকর্ডে নেই, অর্থাৎ খাসজমি। আর মালিকানা হারিয়ে মূল মালিক হয়ে যায় ভুঁইফোঁড়, তারপর চলে আরো ফাইল চালাচালি, কিন্তু কিছুই করার থাকে না। মাঝখান থেকে কোর্টকাচারি খেয়ে নেয় যাবতীয় সঞ্চয়, ভূমিহীন এবার হয় দলিত-মথিত। এভাবেই চলে দিনের পর দিন, মাসের পর বছর এবং দশক। সবখানে ক্ষমতার দম্ভ, যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ। তার চেয়ে বড় কথা পেশিশক্তি। যার আছে পেশিশক্তি, সেই হিরো। সমাজ-রাষ্ট্র তাকে কুর্নিশ করে। সে হয় রাজা, তাকে আর দেখে কে। কিন্তু যখন ক্ষমতা চলে যায়, তখন সে আবার ঘরের ছুঁঁচো হয়ে ভাগাড়ে চড়ে বেড়ায়।
সাতচল্লিশের পর ওপার থেকে আসা মানুষগুলোই অংশীদারিত্বের মামলা ঠুকে ভোগদখল করে। কেউ কম নয় কারো চেয়ে। বিলের মালিক সবাই হতে চায়, আর সে কারণে যেকোনো ছুতোয় হাঙ্গামা-ফ্যাসাদ এবং তারপর পুলিশ কেস। বিলের এই অংশ নিয়ে আজ সমাধান হলো তো কাল আরেক অংশ নিয়ে চলতে থাকে নতুন করে হাঙ্গামা। মানুষের তো কোনো কাজ নেই, শুধু ধান্দা আর ফন্দিফিকির, তা চলতে দোষ কোথায়!
দবির মুন্সী আকাশ-পাতাল কত কিছুই ভেবে যায়, তার ভাবনার আর শেষ নেই, জীবনই বুঝি এই। ছেলে, ছেলেবউ, নাতি-নাতনি আর আত্মীয়-অনাত্মীয়তে ভরপুর তার পরিবেশ। চার দিকে চোখ মেলে সে অনেক কিছুই অনুধাবন করে, অনেক দূরের দৃশ্য চোখে না এলেও মনের ভেতরের আরেক লেন্সহীন চশমায় অনেক স্মৃতি- স্মৃতির দৃশ্যাবলি ফুটে ওঠে। তখন তার মন হাহাকার করে ওঠে, জীবন যেন কত জটিল আর কঠিন। এই কঠিনের মধ্যে সে আজ নিঃসঙ্গ পথিক। কোথায় যাবে জানে না, আর তাই দাঁড়িয়ে আছে পুরনো শিরীষ গাছের নিচে। কেউ কি তাকে ডেকে নেবে অথবা কাছে এসে দু’দণ্ড দুটো কথা বলবে। সময় যে কঠিন এবং জটিল। সেই জটিল-কঠিন আর দুঃস্বপ্নময় সময়ের আঙিনায় দাঁড়িয়ে দবির।
সাতচল্লিশে নিজ দেশ- ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসে বাপের হাত ধরে। তারপর এই মাটিই হলো আশ্রয়, জীবনের অনেক খণ্ড খণ্ড গল্প ভেসে ওঠে মনের সরোবরে। মন এখন তো ভোঁতা তরবারি, কোনো কাজের কাজ করে না, শুধুই অদ্ভুত সব স্বপ্ন রচনা করে। কিন্তু ছেলেবউ সেই স্বপ্নকে বলে, বুড়োর সব ঘোড়ারোগ...
ঘোড়ারোগ শোনে দবির মুন্সী চুপসে যায়। সেবার মরণজ্বরে ছেলে-মেয়ে দুটোকে ফেলে রেখে কপিরন চলে গেল না ফেরার দেশে, তারপর থেকে সে নিঃসঙ্গ। কেউ আসেনি কাছে, শুধুই স্মৃতি মন্থন করে পথচলা। কঠিন জীবনের পথে পথে এত কাঁটা, এত অসমতল কেন, বোঝে না। বুকের মধ্যে অন্য রকম এক কষ্ট বেড়ে ওঠে, বিলমালোয়ের মানুষেরা প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধ-যুদ্ধ এই খেলা চলছে, আরো কত কাল বা চলবে, হয়তো চলতেই থাকবে দিনপঞ্জিকা মেনে। খাস জমি, দখলি জমি, পত্তনি জমি, পরিত্যক্ত জমি, শত্র“ সম্পত্তি, এভাবে জমি রয়েছে শত-সহস্র বিঘা-একর। মানুষ জমির অধিকার ছাড়তে চায় না, শুধুই দখল করতে চায়।
দবির মুন্সীরা যখন এই বিলমালোয়ে প্রথম আসে, তখন চার দিকে ছিল জলমগ্ন আর অবাধ জমি, জমি আর জমি। খাড়ি জমি, দু’ফসলি জমি, রবি শস্যের জমি, ফসল যেন বুক উজাড় করে ঢেলে দিত আর পানিতে ছিল নানা মাছের সমারোহ। বড় বড় শোল, মাগুর, রুই, কাতলা ও বোয়ালের মতো মাছগুলো বিলের পানিতে অবাধে সাঁতরে বেড়াত, শুধুই বংশবিস্তার আর বংশবিস্তার।
এখন সবই গল্প, খোলা চোখে তাকিয়ে থাকে বিলের দিকে যেন মহাসমুদ্র, কিন্তু মানুষ কামড়ে খেতে চায়। কেউ কারো চেয়ে কম নয়। দবির মুন্সীর চোখ আদিগন্ত ছুঁতে পারে না, ছেলেদের-নাতিদের শাসন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যার যত শক্তি সেই পায় জমির অধিকার, জমি হলো গিয়ে বেগানা মেয়ে মানুষ। সুন্দরী মেয়ে পরীকে কে না চায় নিজের আয়ত্তে রাখতে। মেয়ে মানুষ হলো গিয়ে পুরুষের সৌর্যবীর্যের অধিকার। তাকে ছিনিয়ে নাও, তার সাথে যা ইচ্ছে করো। মাটিও তেমন, জলভরা বিল হলো গিয়ে মেয়েমানুষের মতো। তাকে ইচ্ছেমতো ছিনিয়ে নাও, কোনো কথা হবে না। নিজের করে রাখো যদি পুরুষ হও। যদি নিজেকে সমাজের ওপরে রাখতে চাও, তাহলে জমি এবং মেয়েমানুষকে ঠিক করে রাখো। যার কোমরে শক্তি-সাহস সেই পারে ধরে রাখতে নিজের বাহুতে। সরকারি মানুষেরা কখনো-সখনো হামলে পড়ে। কিন্তু অধিকার তো কারো চিরকাল থাকে না, চর দখলের মতো আবার দখল হয়ে যায়। তখন যুদ্ধ বাধে, ভয়াবহ যুদ্ধ, জীবন-মরণ যুদ্ধ। বেঁচে থাকা না বেঁচে থাকার যুদ্ধ, তাতে কেউ পরাজিত হবে, কেউ দখল পাবে, খুনোখুনিতে রক্তপাত হবে, থানা-পুলিশ-কোর্টকাচারি হবে, তারপর কিছু দিন সব কেমন থেমে যাবে, যেন বা শান্ত দীঘির পরিষ্কার জল। কাকচক্ষু সেই জলের ভেতর দর্পণের মতো মুখ দেখা যায়, অথচ আবার ঘোলা করে দেয় সময়। সময়ের নদী সাঁতরে আসে হাঙর, সেই হাঙর খেয়ে ফেলে নিস্তব্ধতাকে। নিরন্তর চলা লড়াই মনের নিভৃৃত কোণে ক্যাকটাসের মতো বাড়তে থাকে। দবির মুন্সীরা পলকহীন তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে। নিজেকে কচ্ছপ ভেবে সিঁধিয়ে যায় খোলসের ভেতর। একদিন তারও শক্তি ছিল, হাতের পেশিÑ কোমরে সেই শক্তি আর নেই। সময় তাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চায়। ছেলেরা-নাতিরা লাঠি-রামদা, বৈঠা-সড়কি কাস্তে-বাঁশ নিয়ে ছুটে যায় প্রতিপক্ষের ওপর। গ্রামবাসী যুক্ত হয়, বাইরের মানুষকে অধিকার দেবে না। বিলের মালিকানা হাতছাড়া হওয়ার মানে উদ্বাস্তুর মতো জীবনযাপন। একবার দেশত্যাগী হয়ে এসেছে, মাটি হাতছাড়া করবে না। মাটি যে জীবন, মাটি যদি না থাকে কৃষকের ইজ্জত থাকে কি। জীবন থাকতে কৃষক মাটি হাতছাড়া করতে পারে না। তার জন্য জীবন বাজি লড়ে যুদ্ধ করবে। সে যুদ্ধে জীবন চলে গেলেও ভালো, তবু কোনোভাবে জমি ছাড়া করবে না।
দবির মুন্সী কখনো বা চিৎকার করে বলে, মার-মার শালাদের একেকটাকে জিন্দা গিলে খা... আজকাল তারও কেমন সময় যেন আর কাটে না। সময় আটকে থাকে, কাটতে চায় না। নিজেকে ভারী অসহায় মনে হয়। কোথাও শান্তি নেই, মেয়েদের সংসারে কত দিন বেড়াতে গেছে, আদরযত্ন-ভালোবাসা সেবাতে ভরিয়ে দেয়। ছেলেরাও কম নয়, বাপের প্রতি সবার দৃষ্টি সজাগ। কিন্তু তার আর ভালো লাগে না, জীবনটা কেমন পানসে হয়ে গেছে। ভয়াবহ স্বপ্নগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার হয়ে ছুটে আসে, খালপাড়ের দিকে অনেক রাতে ছুটে যায়, হাসনাহেনার ঘ্রাণে ভরে থাকে চার দিক। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকে, কপিরনের কবরের মাটি হাতে স্পর্শ করে দেখে। বুকে নেয়, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেয়, এখানে কত আপনজন শুয়ে আছে কতকাল ধরে। সকাল-সন্ধ্যা পাখি ডেকে যায় গাছে গাছে। দবির মুন্সী শুধু বিচ্ছিন্ন তাদের থেকে। কবে বা ওপারের ডাক আসবে, মন অস্থির তার। কপিরন যেন এক সময় কথা বলে ওঠে, এখানে কেন, বাড়ি ফিরে যান, অনেক রাত্রি এখন...
দবির মুন্সী এলোপাতাড়ি খুঁজে যায় নিজের ছায়ার ভেতর আরেক ছায়াকে। কে কথা বলে, কপিরন আমাকে তাড়িয়ে দিয়ো না...
রাত্রি বাড়তে থাকে, দূরে শিয়ালের চিৎকার, নানান কীটপতঙ্গের কলরবের মধ্যে দবির মুন্সী হারিয়ে ফেলে নিজেকে। রাতের আকাশে তারাদের খেলা চলে, সোনার থালার মতো চাঁদ আলো ঢেলে যায়। বাতাসে মিষ্টি কোনো ফুলের ঘ্রাণ, মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ, পাতার গন্ধ। জোনাকি মেয়েদের বিন্দু বিন্দু আলোয় ভেসে যায় দিগন্ত। বিলমালোয় যেন কথা বলে ওঠে প্রবীণ এ মানুষটির সাথে। কী কথা বলে কেউ জানে না, কেউ কখনো জানতে পারবে না। চাঁদ আলোর লুকোচুরি খেলা চলে শুধু নিরন্তর।

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫