ঢাকা, শনিবার,২২ জুলাই ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

বাজেট ভাবনা

কাজী আশরাফ আলী

২১ জুন ২০১৭,বুধবার, ১৮:১০


প্রিন্ট

মাসের শুরুতেই আগামী অর্থবছর ২০১৭-২০১৮ সালের জন্য সম্পদ আহরণ ও ব্যয়ের খাত সুনির্দিষ্ট করে জাতীয় বাজেট ঘোষিত হয়েছে। বাজেট-পূর্ব আলোচনা ও পরে সমালোচনার সুযোগ থাকার কারণে সংশোধনের সুযোগ থাকে। ষোল কোটির ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা অধ্যুষিত অধিক জন ঘনত্বের রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবকাঠামো উন্নয়ন, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, রফতানি সুবিধাসহ সামাজিক কল্যাণ ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি অতিগুরুত্ব দিয়ে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার মেগা বাজেট প্রণীত হয়েছে। বাজেটে অনেক ক্ষেত্রে অব্যাহতি ও কর প্রত্যাহারের সুবিধা রয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে সম্পদ আহরণের জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ, আবগারি শুল্ক বৃদ্ধিও সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোর বিষয়গুলো বেশ আলোচিত হচ্ছে। ভ্যাট ধারণাটা পুরোনো, ’৯১ সালের। মূলত ভ্যাট দিতে হবে ভোক্তাদের। ভ্যাটের কারণে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও জ্বালানির দাম বাড়বে। পণ্যের উৎপাদন, বিপণন, সেবা ও সরবরাহ সব পর্যায়ে মূল্য পুনর্নির্ধারণ করে ১ জুলাই’ ১৭ থেকে ১৫ শতাংশ একই হারে ভ্যাট প্রদান করতে হবে। এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে মূল্যস্ফীতি হবে এবং পণ্য ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে থাকবে। বিত্তহীন, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে। ব্যক্তির ব্যয়ের ক্ষেত্রে শতকরা বর্ধিত হার বিরূপ প্রভাব ফেলে। উল্লেখ্য ব্যক্তির ব্যয় বৃদ্ধি তার আয় বা সামর্থ্যরে মধ্যে থাকতে হয়। স্থির আয়, আয়হীনদের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ধার বা ঋণের আশ্রয় ছাড়া উপায় থাকে না। তাই সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য শতকরা হারের অতি লিখন যেমন ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ দ্বিগুণ, তিনগুণ ইত্যাদি করা হয় যা কাক্সিক্ষত নয় ও ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ-বোঝা সৃষ্টি করে বিধায় সংশোধন করে কর হার হ্রাস করা প্রয়োজন যাতে জনগণ স্বস্তিতে থাকে। আবগারি শুল্ক ব্যাংকে আগে হতে চালু ছিল। এ নিয়ে এত বেশি আলোচনা ইতঃপূর্বে হয়নি। পানীয়, বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি ক্ষতিকারক পণ্য বা দ্রব্যের ব্যবহার প্রতিহত, প্রতিরোধ বা নিরোৎসাহিত করতে এ শুল্ক ধার্য করা হয়। নামটি পরিবর্তন যোগ্য।
আমানতের সুদ আয়ের ওপর যেহেতু ১০%-১৫% উৎস কর, ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ কর্তন করা হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাংকে সঞ্চয় বা আমানত শুল্ক মুক্ত রাখা প্রয়োজন। বর্তমানে গড় মুদ্রাস্ফীতি ৫.৩৯ আমানতের সুদের হার গড়ে প্রায় ৫ শতাংশ যা অতি নিম্নে। আমানতকারীরা বিরূপ মনোভাবের জন্য ব্যাংক বিমুখ হলে আমানত অন্য পথে ধাবিত হবে।
সঞ্চয় প্রকল্প সরকারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সরকার প্রয়োজনে এ প্রকল্প হতে ঋণ গ্রহণ করে অন্যত্র বিনিয়োগ করে, জনগণের সেবা বৃদ্ধি ও আয় করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার বেশি বলে হ্রাসের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যা সরকারের পেনশন সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। বিষয়টি যদি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো বিবেচনা করা যায় তা হলে দেখা যায়- সরকার ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ শতকরা ১১ শতাংশ মুনাফা দেয়, যারা বিনিয়োগ করে তাদের। সরকার এর থেকে কি বেশি উপকৃত হয় না বা বিনিয়োগ করে লাভবান হয় না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদ হার ১২-১৪ শতাংশেরও বেশি। পেনশনার ও পারিবারিক সঞ্চয়পত্রগুলোর উদ্দেশ্য এক। পেনশনার সঞ্চয়পত্র সরকার বিশেষভাবে সরকারি কর্মচারীদের সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রবর্তন করে। সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পেনশনার ও পারিবারিক সঞ্চয়পত্রগুলো পাঁচ বছর মেয়াদি এবং প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা প্রদান করে। এগুলোর মুনাফাও করমুক্ত নয়, যা আগে করমুক্ত ছিল; এ ক্ষেত্রে মুনাফা হতে উৎস কর কর্তন করা হয়। উল্লিখিত দুটি সঞ্চয়পত্র সামাজিক সুরক্ষায় অপরিহার্য্য। সঞ্চয়পত্র দুটির ক্রেতারা অবসরভোগী সরকারি-আধাসরকারি কর্মচারী এবং মহিলা, প্রতিবন্ধী এবং ৬৫ বছর ও তদোর্দ্ধ পুরুষ বা মহিলা। ক্রেতারা বেশির ভাগ মুনাফা দিয়ে সংসারের খরচ নির্বাহ করে যাদের আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই। সরকার করের টাকা হতে ব্যাংকগুলোর পুঁজি পুনর্ভরণে মূলধন পুনর্গঠন বিনিয়োগ খাতে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। প্রতিবন্ধী, বিধবা ভাতা, বৈশাখী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, পেনশন সংস্কার ইত্যাদি বহুবিধ সামাজিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন কার্যকর করছে যার সুফল পাচ্ছে সংশ্লিষ্ট জনগণ।
আগামী বাজেটে মাথা পিছু ঋণ ৪৬ হাজার ১৭৭ টাকা। করের অর্থপাচার, চুরি, ঋণখেলাপি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণসহ গত বাজেট বাস্তবায়ন ও আগামী বাজেট শতভাগ বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জিত হওয়া কাক্সিক্ষত। সংসদে বিশদ আলোচনার ইতিবাচক সারসংক্ষেপ, অর্থনীতিবীদ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অভিমত পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় জনকল্যাণের স্বার্থে অর্থমন্ত্রী আগামী বাজেটের মৌলিক বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে মানবিক হবেন এবং জনগণের নিত্য ব্যবহার্য্য পণ্যের ওপর আরোপিত কর হার যাতে কম থাকে, সহনীয় পর্যায়ে থাকে, অভিঘাত কম হয় সে ব্যবস্থা নেবেন এতেই স্বস্তি; এ প্রত্যাশা জনগণের।
লেখক : নির্বাহী কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত)
রূপালী ব্যাংক লিমিটেড

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫