ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

মাহে রমজান

লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য

প্রফেসর ড. আ ন ম রফীকুর রহমান

২১ জুন ২০১৭,বুধবার, ১৭:৪২


প্রিন্ট

রাত্রিটির এত বেশি মর্যাদার কারণ হলো, আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রিতে মহাগ্রন্থ আলকুরআন গোটা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য নাজিল করেছেন। মূলত কুরআন কারিমই হলো এর শ্রেষ্ঠত্বের মূল কারণ। রামাদান মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই রামাদান মাস সব মাসের শ্রেষ্ঠ মাস; লাইলাতুলকদরে নাজিল হয়েছে, তাই লাইলাতুলকদর বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত। যেমন, যে হরিণে মৃগনাভি রয়েছে, মৃগনাভির কারণে সে হরিণটি সর্বশ্রেষ্ঠ হরিণ। যে ঝিনুকে মুক্তা রয়েছে, মুক্তার কারণে সে ঝিনুকটি মহামূল্যবান। কুরআনকে বাদ দিয়ে এ রাতের মর্যাদা চিন্তাই করা যায় না

লাইলাতুল কদর শব্দটি আরবি, লাইলাহ ও কদর, এ দু’য়ের সমন্বিত শব্দ। লাইলাহ অর্থ হচ্ছে রাত্রি আর কদর অর্থ হচ্ছে, মর্যাদা, সম্মান, ভাগ্য, সঙ্কীর্ণ। লাইলাতুলকদর অর্থ হচ্ছে মর্যাদার রাত্রি, ভাগ্যরজনী, সঙ্কীর্ণ রাত্রি। রাত্রিটি মর্যাদাসম্পন্ন হওয়ার কারণ হলো আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রিতে সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব কুরআন কারিম গোটা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য নাজিল করেছেন। আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি এটা (কুরআন কারিম) নাজিল করেছি মহিমান্বিত রজনীতে’ (আলকদর-১)। কুরআন লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ হয়েছে, এর দু’টি অর্থ হতে পারে। এক. সমগ্র কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে লাইলাতুল কদরে অবতীর্ণ করা হয়েছে; অতঃপর জিবরাঈল আ: একে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে দীর্ঘ ২৩ বছরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছাতে থাকেন। আর একটি অর্থ, এ রাতে কয়েকটি আয়াত অবতরণের মাধ্যমে কুরআন অবতরণের ধারাবাহিকতার সূচনা করা হয়। অবশিষ্ট কুরআন পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পূর্ণ ২৩ বছরে নাজিল করা হয় (আদ্ওয়াউল বায়ান)। আবার এ রাত্রিতে মানুষের আগামী এক বছরের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। আল্লাহ বলেন: ‘আমি তো এটা (কুরআন কারিম) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে (লাইলাতুলকদরে), আমি তো সতর্ককারী। এ রাতে প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে ফায়সালা করা হয় আমার নির্দেশে (সূরা: দুখান-৩-৫)। এ রাত্রিতে তাকদিরসংক্রান্ত বিষয়াদি নিষ্পন্ন হওয়ার অর্থÑ এ বছর যেসব বিষয় প্রয়োগ করা হবে, সেগুলো লাওহে মাহফুজ থেকে নকল করে দায়িত্বশীল ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা। নতুবা, আসল বিধি-লিপি আদিকালেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে (ইমাম নববী,শারহু সহিহ মুসলিম, ৮/৫৭)। কদরের আর একটি অর্থ সঙ্কীর্ণতা, যেমন আল্লাহ বলেন: (ইন্না রাব্বাকা ইয়াবছুতুর রিজকা লিমান ইয়াশাউ ও ইয়াকদির); অর্থাৎ তোমার প্রতিপালক যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করে দেন আর যার জন্য ইচ্ছা সঙ্কীর্ণ করে দেন (সূরা বনী ইসরাঈল ৩০)। এ রাত্রিতে অসংখ্য ফিরিশতা জিবরাঈল আ:-এর নেতৃত্বে পৃথিবীতে আগমন করেন, যার ফলে পৃথিবীর জমিন সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। এ রাতে পৃথিবীতে ফেরেশতারা এত বেশি অবতরণ করেন যে, তাদের সংখ্যা পাথরকুচির চেয়েও বেশি। মুসনাদে আহমাদ: ২/৫১৯। আল্লাহ বলেন: ওই রাত্রিতে জিবরাঈল আ: এবং ফিরিশতারা তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে প্রত্যেক কাজের জন্য অবতরণ করেন (সূরা: কদর-৪)। লাইলাতুলকদরের ফজিলত : এ রাত্রিটি হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি এটা (কুরআন কারিম) নাজিল করেছি কদরের রাত্রিতে, তুমি কি জান, কদরের রাত্রিটি কী? কদরের রাত্রিটি হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।(সূরা:কদর-১-৩)। এখানে ‘হাজার’ বলতে গুনে গুনে হাজার নয়, বরং অসংখ্য বোঝানো হয়েছে। আরবের লোকেরা অসংখ্য বোঝাতে হাজার শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, যে ব্যক্তি এই রাত্রির কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সেসব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত’ (নাসায়ী: ৪/১২৯, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৩০, ইব্নমাজা)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি লাইলাতুলকদরে বিশুদ্ধ ঈমান নিয়ে আল্লাহর কাছে সাওয়াব প্রাপ্তির আশায় ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হবে (বুখারি: ১০৯১, মুসলিম:৭৬০, আবুদাউদ :১৭৩২, তিরমিজি: ৮০৮)। এ রাত্রির ফজিলত পাওয়ার জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিকাফ করতেন এবং রাতভর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। হজরত আয়শা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদান মাসের শেষ দশ দিনে যত বেশি ইবাদত করতেন, অন্য দিনগুলোতে এত বেশি ইবাদত করতেন না (মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আয়শা রা: বলেন: রামাদানের শেষ দশ দিন আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের জন্য শক্ত প্রস্তুতি নিতেন, রাত জেগে ইবাদত করতেন, নিজের পরিবারবর্গকে জাগিয়ে দিতেন (বুখারি, মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তাদেরকেও ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন, যারা এখনো নামাজের উপযুক্ত হয়নি। হজরত আয়শা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রামাদান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করেছেন, তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীরা ইতিকাফ করেছেন (বুখারি, মুসলিম)। আবুহোরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রতি বছরে (রামাদান মাসে) একবার কুরআন কারিম পড়ে শোনানো হতো। তাঁর মৃত্যুবরণের বছর কুরআন শোনানো হয়েছিল দুইবার। তিনি প্রতি বছর (রামাদান মাসে) দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, সে বছর তিনি ইতিকাফ করেছেন বিশ দিন (বুখারি)। আনাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রামাদান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর তিনি ইতিকাফ করতে পারলেন না, তাই পরবর্তী বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করলেন (আবুদাউদ)। ইবনেমাজা হাদিসটি উবাই বিন কা’ব থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুলকদরের ফজিলত পাওয়ার জন্য রামাদানের শেষ দশকে দুনিয়ার অন্যান্য কাজকর্ম ছেড়ে মসজিদে গিয়ে ইতিকাফে বসতেন, রাতভর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন, অথচ তিনি ছিলেন নিষ্পাপ। এতেই সহজে অনুমান করা যায়, লাইলাতুলকদরের কত ফজিলত ও কত মর্যাদা।
রাত্রিটির এত বেশি মর্যাদার কারণ হলো, আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রিতে মহাগ্রন্থ আলকুরআন গোটা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য নাজিল করেছেন। মূলত কুরআন কারিমই হলো এর শ্রেষ্ঠত্বের মূল কারণ। রামাদান মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, তাই রামাদান মাস সব মাসের শ্রেষ্ঠ মাস; লাইলাতুলকদরে নাজিল হয়েছে, তাই লাইলাতুলকদর বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রাত। যেমন, যে হরিণে মৃগনাভি রয়েছে, মৃগনাভির কারণে সে হরিণটি সর্বশ্রেষ্ঠ হরিণ। যে ঝিনুকে মুক্তা রয়েছে, মুক্তার কারণে সে ঝিনুকটি মহামূল্যবান। কুরআনকে বাদ দিয়ে এ রাতের মর্যাদা চিন্তাই করা যায় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: এ মাসে একটি রাত্রি রয়েছে, যে রাত্রি হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এই রাত্রির কল্যাণ থেকে বঞ্চিত, সেসব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। এ রাত্রির কল্যাণ কুরআন নাজিল হওয়ার কারণেই। অতএব যে ব্যক্তি কুরআন থেকে বঞ্চিত সে সব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন মাজিদ সম্পর্কে বলেছেন: নিশ্চয়ই এটা এমন একখানা কিতাব যার দ্বারা আল্লাহ একটি জাতির উত্থান ঘটান, আর একটি জাতির পতন ঘটান (মুসলিম)। মুসলিম উম্মাহ এক সময় কুরআনকে জীবনে ধারণ করেছিল বলে সারা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছিল, অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছিল; রোম সাম্রাজ্য, পারস্য সাম্রাজ্য ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। একটি সুন্দর শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়েছিল তারা। কুরআনকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেয়ার ফলে আজ মুসলিম উম্মাহর দীনদশা, মুসলিম জাতি আজ অবহেলিত, লাঞ্ছিত। মুসলিম জাতিকে তার ঐতিহ্যে ফিরে যেতে হলে ফিরে আসতে হবে কুরআনের পথে। কুরআনের বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রব্যবস্থায় কার্যকর করার মাধ্যমেই পরিপূর্ণ কল্যাণ লাভ করা সম্ভব দুনিয়ার ও আখিরাতের জীবনে। এটাই করেছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীরা। অতএব মনে রাখতে হবে, কুরআনকে বাদ দিয়ে শুধু রামাদান পালনের মাধ্যমে, লাইলাতুলকদরে জেগে ইবাদত করার মাধ্যমেই পরিপূর্ণ কল্যাণ লাভ সম্ভব নয়। আমরা জীবনে কত রোজা করেছি, কত লাইলাতুলকদর পালন করেছি, কিন্তু বাস্তবে কি আমরা প্রকৃত কল্যাণ লাভে সক্ষম হয়েছি? এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, সারা বছর আল্লাহর হুকুম অমান্য করে শুধু লাইলাতুলকদরে ইবাদত করলেই যথেষ্ট হবে না, যা আমরা অনেকেই করে থাকি। বরং সারা বছরই নিয়মিতভাবে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতে হবে, তাহলেই লাইলাতুলকদরের ফজিলত ও বরকত লাভের আশা করা যেতে পারে। রামাদানের এত বড় সুযোগ, এ বিশাল বোনাস তাদের প্রাপ্য, যারা সারা বছর আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে। তবে আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি অতি মেহেরবান, কেউ যদি নিজের অপরাধ স্বীকার করে আল্লাহর কাছে খাঁটিভাবে তাওবা করতে পারে, আর ভবিষ্যতে তাঁর হুকুম অমান্য করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, তাহলে আশা করা যেতে পারে, আল্লাহ তাকে মাফ করবেন এবং লাইলাতুলকদরের ফজিলত দান করবেন।
লেখক : চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫