ঢাকা, সোমবার,২১ আগস্ট ২০১৭

রকমারি

দুই মেরুর দুই বাবা

উম্মে বুশরা

১৭ জুন ২০১৭,শনিবার, ১৫:২১


প্রিন্ট

বন্ধুর বিয়েতে আজ ও বরিশাল যাবে, জানের দোস্তের বিয়ে বলে কথা, কত আয়োজন। সব বন্ধু একই রকম পাঞ্জাবি কিনেছে, গায়ে হলুদ, বিয়ে, বউভাত মিলে অফিস থেকে সাত দিনের ছুটি মঞ্জুর করে নিয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে মুনিয়াটা তো শ্বাসকষ্টে ভুগছে, তবুও কি ও যাবে?
এর আগেও সে অবশ্য অসুস্থ হয়েছিল। ওর কোনো খেয়ালই নেই। চাকরি,বন্ধু, আড্ডা, খেলা এসব নিয়েই ব্যস্ত, ৯-৫টা অফিস, তারপর হয় বন্ধুদের সাথে আড্ডা, নয় তো খেলা দেখা, এক ছাদের নিচে দুইজনের বসবাস, তবুও যেন অনেক দূরে।
এসবই ভাবছিল সাথী, হঠাৎ ডাক পড়ে,
-শুনছ, আমার ব্যাগটা একটু গুছিয়ে রেখ, আজ রাতেই আমরা যাচ্ছি।
-মুনিয়াটার যে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তবুও তুমি যাবে?
-ও কিছু হবে না, খুব বেশি হলে হাসপাতালে নিয়ে যেও, এটিএম কার্ড রেখে যাচ্ছি, টাকা লাগলে খরচ করো।
হেলালের খুব তাড়াহুড়া, লঞ্চ ধরতে হবে, যাওয়ার সময় মেয়েটার কাছ থেকে বিদায়ও নেয়া হলো না। পূর্ণিমার রাত, অদ্ভুত সুন্দর চাঁদের আলো লঞ্চের ছাদে ছড়িয়ে পড়েছে, লঞ্চে সব বন্ধু মিলে গল্প আর গানের আসর জমিয়ে ফেলেছে। ব্যাপক মজা চলছে, হেলালের ফোনটা অনবরত বেজেই চলছে। মোবাইলটা সাইলেন্ট করে রাখল, ফোন ধরলেই ঘ্যান ঘ্যান একটুও এনজয় করতে দেয় না। বউয়ে বাজারের লিস্ট, ঘ্যান ঘ্যানানি, শিশুর কান্না, চিৎকার এসব আর ভালো লাগে না। বন্ধু, মাস্তি একসাথে ঘোর ফির, মজা কর, লাইফটা কত এনজয়াবল, বয়স তো মাত্র আটাশ, এখন নয় তো, কখন?
মুনিয়ার শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। হায় আল্লাহ! এত রাতে একা কোন হসপিটালে যাবো, ওর বাবা তো ফোনও ধরছে না। একটু পরামর্শ করতেও পারছি না, মুনিয়ার ফরসা মুখটা যেন কালো হয়ে উঠছে, কষ্টে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
-‘এইতো মা, ভোর হলেই আমরা ডাক্তার আঙ্কেলের কাছে যাবো, তুমি ভালো হয়ে যাবে। দেখ, কী সুন্দর চাঁদের আলো, দেখ,বারান্দায় যাবে? ওখানে সুন্দর বাতাস, তুমি চেয়ারে বসে গায়ে আলো মাখবে। আমি গান গাইব আর তুমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবে। ঠিক আছে মা, সোনামণি আমার।’
সকালেই মুনিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। এত বাতাস, তবুও মুনিয়া নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। অক্সিজেন মাস্কেও কাজ করছে না, ছোট্ট বুকটা উঠানামা করছে। হে আল্লাহ, তুমি ওর কষ্ট দূর করে দাও, আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না। বেলা ১১টায় মুনিয়ার সব কষ্ট দূর হলো, ছোট্ট একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুক্তি পেল।
দুপুর ৩টায় বাসাভর্তি মানুষ,হেলালের সব বন্ধু,কলিগ, আত্মীয়, প্রতিবেশী আরো কতজন এসেছে। হেলালের চোখে পানি, বুকটা খাঁ খাঁ করছে,অপরাধ বোধও কাজ করছে। শুধু সাথী নির্বিকার, এক ভাবী ওকে কাঁদানোর চেষ্টা করছে। ওর শূন্য চোখ দু’টি কাকে যেন খুঁজছে। হঠাৎ একজনকে দেখে ও পাগলের মতো ছুটে গেল। একজন ময়লা সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত সাদা শ্মশ্রুমণ্ডিত বয়স্ক মানুষকে জড়িয়ে ধরে ও কাঁদছে।
লোকটা হাতের ব্যাগ ফেলে দিয়ে ছোট্ট মেয়ের মতো সাথীকে আদর করছে, চোখ মুছে দিচ্ছে,কপালে চুমু দিচ্ছে, ফিসফিস করে বলছে, তুই তো ভাগ্যবতী, তুই তো জান্নাতির মা, ধৈর্য ধর মা,আল্লাহ যে তোকে ভালোবেসে পরীক্ষা করেছেন, সহ্য কর,উত্তম প্রতিদান পাবি,আর কাঁদিস না,মা আমার।
পাঁচ দিন পরের কথা, আজ সাথীর বাবা গ্রামে চলে যাবে, বের হওয়ার সময় দেখে তার ব্যাগের পাশে আরেকটা ব্যাগ।
-বাবা, আমিও যাব তোমার সাথে।
হেলাল কি যেন বলতে যাচ্ছিল, সাথীর বাবা থামাল।
‘-বাবা হেলাল, আমি আমার মেয়েকে একাই বড় করেছি, ওর সব কষ্ট-দুঃখ আমি এই বুকটাতে ধারণ করেছি, চাকরি, বন্ধু, আত্মীয় সব কিছুর উপরে আমি ওকে প্রাধান্য দিয়েছি, কারণ ও আমার আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত, কখনো আমি ওকে অবহেলা, অযত্ন করিনি। আমার এই হাতটা ধরলে ও নির্ভরতার শক্তি পাবে, এই হাত ধরেই ও একদিন হাঁটতে শিখেছিল, আজ আবার এই কঠিন সময়ে ও এই হাত ধরেই উঠে দাঁড়াতে পারবে ইনশাআল্লাহ, কারণ আমি যে ওর বাবা।’
লেখক : ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫