ঢাকা, সোমবার,২৬ জুন ২০১৭

রকমারি

আমার বাবা

শফিক ইব্রাহিম

১৭ জুন ২০১৭,শনিবার, ১৫:১৫


প্রিন্ট
শফিক ইব্রাহিম

শফিক ইব্রাহিম

এ লেখাটি বাবাকে নিয়ে লিখেছিলাম কিছু দিন আগে। সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে বাবাকে দেখে ফেরার পথে ট্রেনের সিটে বসে মোবাইল ফোনে। তারপর কয়েকটা দিন কেটে গেল। গত ১ জুন ২০১৭ আমার বাবা আমাদের ছেড়ে, দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। শুধু এটুকু বলি- আজ হাজার বাবাকে দেখি, আমার বাবার মতো এমন সুন্দর বাবা একজনও নেই।

ছোট্টবেলায় বন্ধুর সাইকেলে উঠেছিলাম বলে বাবা ছাতা উল্টিয়ে মেরেছিলেন। সেই থেকে আমি আর সাইকেলে উঠিনি। ভেবেছিলাম গাড়িই কিনব, কিন্তু সেটাও হলো না। তবে বাবা আমার আগের মতো নেই। নেই আমারো সেই ভিজে মাঠের ফুটবল খেলা। বাবা আজো আছেন, তবে তার সেই রাগ নেই। নেই তার সেই অহঙ্কার।
বাবা, ও বাবা!
তুমি কি পারো না আজো আমাকে সেই দিনের মতো শাসন করতে? পারো না হাট থেকে আখের আঁটি হাতে দিতে? বাবা, আমার সোনা বাবা! কী হলো তোমার বাবা? শুনছো আমার কথা? বেত হাতে কেন আর আমাকে পড়াতে বসো না? আমি কি খুবই বড় হলাম? আমি তো এত বড় হতে চাইনি! আমি চেয়েছি শুধু তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে।
বাবা!
কত আশা নিয়ে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলে ইশকুলে। হাতে হাত রেখে পেনসিলটা ঘুরিয়ে লিখে দিতে ‘স্বরে আ’। সে দিন বুঝিনি কী যে মধু ছিল ওই হাতে!! আজ তোমার হাত কাঁপে কেন? কেন উঠতে গিয়ে সাহায্য নিতে হয়? বিশ্বাস হয়নি কোনো দিন কখনো আমার বাবা এমন হবে। বাবা, বলে দাও কী ওষুধ আনবো সেই যুবক বাবাকে পেতে?
বাবা?
মনে আছে কি কৈজুরী বাজারের দোকানি রশীদ চাচার কথা? মনে নেই? একটু মনে করে দেখো... ৯ টাকার চকলেট খেয়েছিলাম বলে কত মারই না মেরেছিলে আমাকে। বাবা আজ আমি অনেক বড়, ধার করে বিস্কুট আর নিতে হয় না। হয় না টাকা না থাকায় লজ্জায় পড়তে। কত মানুষই জানে চেনে বোঝে, এগিয়ে এসে দু’কথা বলে। কিন্তু বাবা তুমি চুপ হয়ে গেলে কেন? কেন তুমি আর গর্জে উঠে বলো না... ভায়ের গলা ধরে ঘুমাও। কেন আজ একসাথে খেতে বসে মাছের মাথাটা তুলে দিয়ে বলো না... মাথা খেয়ে মাথা বানাও বাবা...
বাবা!
অনেক বড় আজ হয়েছি বটে, কিন্তু চাইনি তোমার এই নীরবতা। অঙ্ক পারি না বলে হরেন্দ্রনাথ স্যারকে বাড়ি ডাকলে। আজ জীবনের অঙ্কটা যে কিছুতেই মেলাতে পারছি না বাবা। একটু ডেকে দেবে বাবা নতুন কোনো স্যারকে? আমি আজ ভীষণ পরাজিত অঙ্কবিদ। তুমি শুধু দেখেই চুপ হয়ে যাচ্ছো কেন বাবা?
আমার বাবা!
সেই কবে একটা সোয়েটার কিনে দিয়ে বলেছিলে... কাউকে দিয়ে দিয়ো না, শীত সয় না। আমি তো আজো তুলে রেখেছি, ওটা তো তেমনই আছে। কিন্তু তোমার গায়ের পাঞ্জাবিটা তখনো ছেঁড়া ছিল। আজ নতুনে নতুনে আছো তবু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কেন বাবা? কী করব তোমার জন্য, তোমার দৃষ্টিতে আজো দৃষ্টি মেলাতে ভয়। তোমার নুয়ে পড়া শরীরে অন্যের আশ্রয়। এই হাত তো তোমার নয়? কোথায় গেল বাবা তোমার অক্ষয় প্রত্যয়।
প্রিয় বাবা!
আমার সব হলো, তবু পরাজয় এলো, অশ্রু ছলোছলো। বুক চেপে আসে তোমার চোখের চাহনিতে। কী করবো বাবা? তুমি দশ গ্রামের, দেশেরও নামকরা মানুষ। চেয়ারে হেলে হেলে ঢলে পড়ছে কেন বাবা তোমার অহঙ্কার? তুমি আর দুর্বলকে কাছে টেনো না, কষ্ট পাই বাবা। ফিরিয়ে আনো তোমার মুখের কালো দাড়ি। ফিরিয়ে দাও তোমার রাগের জৌলুশ। ফিরিয়ে দাও তোমার আতরে চনমনে হৃদয়।
বাবা!!
আমি যে এখন ঢলে পড়া নির্ঘুম বীর। তোমার বুকে চেপে চেপে আমাকে ঘুমের দেশে নিয়ে যাও বাবা। তোমার শক্ত হাতটি আমার বড় প্রয়োজন...

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫