ঢাকা, সোমবার,২৬ জুন ২০১৭

রকমারি

বাপজানের হাতঘড়ি

নাদিম আহসান তুহিন

১৭ জুন ২০১৭,শনিবার, ১৪:৪৭


প্রিন্ট

টেবিলের ওপর এখনো শোভা পাচ্ছে বাপজানের হাতঘড়িটা। ঘড়িতে এখন ৫টা বেজে ১৫ মিনিট। আজ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঘড়িটা ৫টা ১৫তেই থেমে আছে। এই থামা ঘড়িটাও দিনে দুইবার সঠিক সময় দেখায়। ঘড়ির পেছনে খোদাই করে লেখা আছে-
CITIZEN WATCH CO.
WATER RESIST
STAINLESS
GN-4W -S
JAPAN
এর মানে হলো ঘড়িটা জাপানের তৈরি। মায়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম ঘড়িটা সৌদি আরব থেকে বড়মামা এনেছিলেন বাপজানের জন্য। এই ঘড়িটার সবচেয়ে বড় যে বিশেষত্ব সেটা হলো, এর মধ্যে কোনো ব্যাটারি নেই। নাহ, এটি সৌরবিদ্যুতেও চলে না। এটি চলে কেবল রক্তচলাচলের সাহায্যে। অর্থাৎ হাতে পরার পর এটি ত্বকের স্পর্শ থেকে রক্ত চলাচলের আভাস পেলেই চলতে শুরু করে। আপনার শরীরে রক্ত চলাচল করবে আর তার ওপর ভিত্তি করে ঘড়িটা আপনাকে সময় জানিয়ে দেবে। এটি ওয়াটার রেসিস্ট হওয়ায় এর মধ্যে পানি ঢোকার ভয় নেই। তাই এটি খুলে রাখারও প্রয়োজন হয় না। তবে কোনো কারণে যদি আপনি খুলেও ফেলেন তবু সেটা সাথে সাথে থেমে যাবে না। আরো বেশ কয়েক ঘণ্টা অনায়াসে এটি আপনাকে সঠিক সময় জানাবে। ও হ্যাঁ আরেকটা কথা, এই ঘড়ির মধ্যে ছোট করে বার এবং তারিখ দেখা যায়। তারিখ বলতে শুধু কততম দিন সেটাই রয়েছে। মাস আর বছর নেই। সমস্যা নেই, চলমান মাস আর বছর তো সবারই জানা থাকে। সে হিসেবে ঘড়িতে আছে আজ মঙ্গলবার, ২২ তারিখ। তবে এই ২২ তারিখ চলমান বছরের নয়। যে বছর ঘড়িটি থেমে গিয়েছিল সেই বছরের।
২২ মার্চ,২০০৫ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাপজান ঘড়িটা হাত থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছিল তার। দিশেহারার মতো আচরণ করছিলেন খুব। এই ২২ মার্চে আমার জীবনের একটা অন্যতম অধ্যায় রচিত হয়েছিল।
সে দিনটার কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। অন্যান্য দিনের মতোই সে দিনও স্কুলে গিয়েছিলাম। তখন আমি ক্লাস ফাইভে। আমাদের বাড়ি থেকে স্কুল খুব কাছে হওয়ায় দুপুরবেলার বিরতিতে বাড়িতে খেতে আসতাম। যথারীতি সে দিন দুপুরে বাড়িতে এলাম, কিন্তু মাকে পেলাম না। ছোট আপু জানালো মা বাপজানকে নিয়ে ফেনী গেছে। তখন খেয়েদেয়ে আবার স্কুলে চলে গেলাম। স্কুল ছুটি শেষে বাড়িতে এসে সবার মধ্যে কেমন যেন একটা তাড়াহুড়ো ভাব দেখলাম। মাকে দেখলাম তখন বাড়ি থেকে আবার ফেনী যাচ্ছে। বলল বাপজানকে নিয়ে ঢাকা যাবে। আমারে দুষ্টামি করতে মানা করে গেল।
ঘণ্টাখানেক পরে কে জানি বলল আমার বাপজান নাকি ঢাকা চলে গেছেন। রাজধানী ঢাকায় নয়, আমাদের জীবন থেকেই ঢাকা গেলেন তিনি।
বাপজানের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। কোনো দিন যদি মায়ের বকুনি খেতাম কিংবা পিটুনি খাওয়ার ভয় থাকত, অমনি ছুটে যেতাম বাপজানের কাছে। বাপজান আমায় কোলে করে বাড়ি দিয়ে যেতেন। আমি ভয়ে ভয়ে থাকলেও তখন অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতাম। ভাই-বোন সবার ছোট ছিলাম বলে বাপজান আমায় এত্ত এত্ত আদর করতেন। কখনো আমায় মারতেন না তিনি। পুরো জীবনে একবারই শুধু আমায় মেরেছিলেন। আমার খুব রাগ উঠলে আমি বাপজানের দোকানের সব জিনিস তোলপাড় করে ফেলতাম। অথচ তিনি শুধুই হাসতেন। হাসিখুশিভাবেই আমায় বোঝানোর বা মানানোর চেষ্টা করতেন। যে দিন তিনি খুব রেগে গিয়ে আমায় চড় মেরেছিলেন। রাতেই আমার জ্বর উঠল। মা বাপজানকে খুব বকুনি দিলেন। কোনো দিন যিনি আমায় মারতে দিতেন না সেই তিনিই কিনা আমায় মারলেন! আবার রাতভর ডাক্তার ওষুধ নিয়ে ছুটোছুটিও করলেন।
সবাই বলত আমি নাকি বাপটিরে বেশি জ্বালাতন করতাম। এ জন্যই কি তিনি আমায় ছেড়ে গেলেন?
আমার জিন্দিগির কুড়ি বছরের বেশি চলে গেছে। এই কুড়ি বছরকে যদি আমি দুই ভাগ করি তবে সেখানে প্রথম অর্ধ কুড়িতে মিশে আছে আমার বাপজানের সাথে কত স্মৃতি, কত আদর, স্নেহ। আর পরবর্তী এই একযুগে শুধুই স্নেহকাতর পিতৃশূন্য হৃদয়ের হাহাকার। সে দিন সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি তার হাতঘড়িটা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। ঘড়িটি তখনি থেমে যায়নি। অদ্ভুতভাবে ঘড়িটি থেমেছিল বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে যখন কিনা তার মালিকের রক্ত চলাচল চিরতরে থেমে গিয়েছিল!

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫