ঢাকা, শনিবার,২৪ জুন ২০১৭

বিবিধ

প্রতিবাদী চিত্রকর্ম : সুন্দরের পক্ষে জয়োগান

ড. আব্দুস সাত্তার

১৫ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৩৬


প্রিন্ট

সন্ত্রাস, সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে পৃথিবীব্যাপী যে আলোড়ন, যে আলোচনা সেই সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে রাজনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ অভিধানগুলোতে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ভয়-ভীতি প্রদর্শন দ্বারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লাভের প্রচেষ্টাই হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ। সুতরাং এটা স্পষ্ট, সন্ত্রাসবাদ বা সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড কিংবা সুবিধালাভের উদ্দেশ্যে সন্ত্রাস ছড়ানো নতুন কিছু নয়। প্রাচীনকাল থেকেই এই সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড নানাভাবে সংঘটিত হয়ে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ক্ষমতার লোভে রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বহু দেশে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটিয়েছে। মানবতাবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছে। নির্বিচারে হত্যা করেছে নিরীহ নরনারী ও শিশুদের। জাতিগত এবং ধর্মগত কারণেও এরূপ জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হতে দেখা গেছে রাজনৈতিক অঙ্গনের ক্ষমতাধর মানুষগুলোকে। তারা মানুষের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছে। গুরুত্ব দিয়েছে ক্ষমতা ও লুণ্ঠনকে। ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার সীমাহীন লোভের কারণেও ক্ষমতাধর মানুষ অমানুষে পরিণত হয়েছে। পরিণত হয়েছে হিংস্র দানবে। আমাদের অঞ্চলেও হৃদয়বিদারক এরূপ ঘটনার প্রমাণ রয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী বাঙালিদের গোলাম বানিয়ে শাসন ও শোষণ করতে পশ্চিম পাকিস্তানের বর্বর শাসকরা একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৫ মার্চ এবং একাত্তরে অগণিত মানুষ হত্যা করেছে। সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড বিশ্ববিবেককে হতবাক করেছে। এরূপ রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়ঙ্কর ভীতি ও অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে, যা শান্তিকামী কোনো মানুষই কামনা করে না। কামনা করে না বলেই পৃথিবীতে নানারকম অন্যায় অবিচার সংঘটিত হয়। শান্তিকামী মানুষ নানাভাবে এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। লেখক প্রতিবাদ করেন লেখনীর মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করে মিটিং-মিছিল, সভা কিংবা মানববন্ধনের মাধ্যমে এবং শিল্পীরা প্রতিবাদ করে সঙ্গীত, নাটক ও চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে। তবে এসব প্রতিবাদকারীর মধ্যে একমাত্র চিত্রশিল্পীদের অঙ্কিত চিত্রের প্রতিবাদ হয় চিরস্থায়ী। কারণ শিল্পীদের চিত্রকর্ম সংগৃহীত হয় জাদুঘর বা বিভিন্ন সংগ্রহশালায়। চিত্রকর্ম চিত্রিত হয় বিভিন্ন গ্রন্থ বা অ্যালবামে, যা মানুষকে যুগ যুগ ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন করে। এভাবেই জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। আমরা শিল্পী রিচার্ড ওয়াগনার, অ্যাডগার এলেন পো এবং অস্কার পুরস্কারের কথা জানি। যারা তাদের চিত্রের মাধ্যমে সন্ত্রাস বিষয়ে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
এক সময় প্রচণ্ড ক্ষমতাধর সোভিয়েত রাশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে রাজনৈতিক সন্ত্রাস সৃষ্টির প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা ছিল। এ প্রতিযোগিতা পররাষ্ট্র দখলের এবং দখলে রাখার। কোনো অঞ্চলে আমেরিকা যুদ্ধজাহাজ পাঠালে সোভিয়েত রাশিয়াও পাঠাতো পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে। ফলে শক্তিধর উভয় রাষ্ট্র মুখোমুখি হতো কখনো কখনো। এভাবে দেশ দু’টি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস সৃষ্টি করতো। কোনো কোনো স্থানে উভয় দেশের সমর্থকদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ হতো। প্রাণ হারাতো অগণিত মানুষ। সে সময় সমগ্র বিশ্ব দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। আমেরিকা পন্থী এবং রাশিয়া পন্থী। ফলে দেশে দেশে উভয় পন্থীর অনুসারী সাধারণ মানুষদের মধ্যেও সঙ্ঘাতপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করতো। এমন কি তারা সঙ্ঘাতেও জড়াতো যা ছিল বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ। এই পরিস্থিতি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও (বর্তমান বাংলাদেশ) বিরাজমান ছিল যা শান্তিকামী মানুষদের মতো আমাকেও বিচলিত করতো। এই অশুভ প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ জানানো যায় সে বিষয় নিয়ে ভাবতাম। এক সময় কাঠখোদাই মাধ্যমে একটি প্রতিবাদী চিত্র আঁকলাম। চিত্রের নাম ‘বিশ্বশান্তির জন্য’। চিত্রের মাঝের অংশে রয়েছে গোলাপ ফুল বেষ্টিত গোলাকার পৃথিবী। যার ওপর রয়েছে বিভিন্ন দেশের মানচিত্র। অর্থাৎ গোলাপ বেষ্টিত সুন্দর শান্তিপূর্ণ সকলের কাম্য এমনি একটি পৃথিবী চেয়েছি আমি। আর এরূপ একটি স্বপ্নিল সুন্দর শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর জন্য ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায় রত আমেরিকা এবং রাশিয়ার মারণাস্ত্রের বিলোপ চেয়েছি। গোলাপ বেষ্টিত সুন্দর পৃথিবীর উভয় পাশে দেশ দু’টিকে বোঝাতে তাদের পতাকা এঁকে পতাকার পাশে অঙ্কিত বোমার উপরে ক্রস চিহ্ন দিয়ে বোমার বিলোপ চেয়েছি। চিত্রটি এঁকেছি ১৯৮৯ সালে। আমার সন্ত্রাসবিরোধী এ চিত্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয়েছে। আমার অঙ্কিত এই চিত্র প্রদর্শনীর ২০ বছর পর 'অজঞ অএঅওঘঝঞ ঞঊজজঙজওঝগ' নামক প্রদর্শনীর একটি ক্যাটালগ সংগ্রহ করেছি কলকাতা সরকারি আর্ট কলেজের সম্মুখস্থ ফুটপাথ থেকে। এই ক্যাটালগের তথ্যে জানা যায় যে, ২০০৯ সালে ভারতের আকৃতি, আকার প্রকার, সংস্কৃতি, গান্ধারা, চিত্রকুট, সিগুল, গ্যালারি কে২, ইমামি-চিজেল এবং চিজেল আর্ট অব কলকাতা নামক আর্ট গ্যালারি ও প্রতিষ্ঠান ভারতের খ্যাতিমান ১৬৪ জন শিল্পী অঙ্কিত চিত্র নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ২৩ মার্চ ২০০৯ থেকে দুই মাস দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল এ প্রদর্শনী। প্রদর্শিত শিল্পের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে শিল্পীদের অনুভূতির নানা দিক প্রকাশ পেয়েছে। সন্ত্রাসের কারণে মানুষ যে নির্যাতিত এবং নিহত হয়েছে সে কথাগুলো শিল্পকর্মের মাধ্যমে শিল্পীরা প্রকাশ করেছেন।
২৬/১১’র বোম্বাই আক্রমণের ঘটনা শিল্পী রবিন মণ্ডলকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছে। নিদারুণ যন্ত্রণায় তিনি ‘ভিকটিম’ নামে এক যুবতী মেয়ের ছবি এঁকেছেন। যুবতীর শরীরে নির্যাতনের ছাপ স্পষ্ট। ৩০><৪০ ইঞ্চি আকারের তেলরঙ মাধ্যমে বোর্ডে অঙ্কিত এ চিত্রের নাম দিয়েছেন শিল্পী ঠরপঃরস.
আমাদের অঞ্চলে বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোতে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় এবং এই দাঙ্গার কারণে যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে সেই বিপর্যয়ের ঘটনা নিয়েও শিল্পীরা চিত্র এঁকেছেন। দেশ বিভাগের সময়কালে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে কলকাতায় যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল এবং সেই দাঙ্গায় যে ক্ষয়ক্ষতি ও ভয়াবহতা শিল্পী কার্তিকচন্দ্র পাইন প্রত্যক্ষ করেছিলেন সে বিষয়ে চিত্র এঁকেছেন তিনি। চিত্রে হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে অগ্নিদগ্ধ ঘরবাড়ি দেখছেন। এই দাঙ্গা কি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে কিংবা নিয়েছিল এ চিত্র তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ কতটা অসহায় এবং আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে থাকে শিল্পী সে বিষয়টিই চিত্রে দেখাতে চেয়েছেন। শিল্পী কার্তিকচন্দ্র পাইন তার এ চিত্রের নাম দিয়েছেন 'ঘবাবৎ ধমধরহ'. ১৯৪৭ সালে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে শিল্পীর বয়স তখন ১৬ বছর। তিনি সেই বয়সে ভালোভাবেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের বিষয়গুলো অনুধাবণ করতে সক্ষম ছিলেন।
শিল্পী অভিজিৎ গুপ্ত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে চিত্র এঁকেছেন। তিনি তার চিত্রের ক্ষেত্রকে ৯ ভাগে ভাগ করেছেন। চৌকোনা বা বর্গাকার এই ক্ষেত্রগুলোতে সন্ত্রসাী কর্মকাণ্ডের নানা বিষয়কে তুলে ধরেছেন শিল্পী। উপর থেকে বামের প্রথম অংশে একজন মানুষের মুখ এঁকে প্রশ্ন জুড়ে দিয়েছেন। প্রশ্নটি হচ্ছে- 'ডযড় রং ধ ঃবৎৎড়ৎ'? এর নিচের ক্ষেত্রে একই মুখ এঁকে প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে লিখেছেন- "ডযধঃ রং ঃবৎৎড়ৎরংস"? এর নিচের ক্ষেত্রেও একই মুখ। কিন্তু এখানে কোনো প্রশ্ন নেই। শুধুমাত্র পরপর দুটো প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে। বর্গাকারে বিভক্ত মাঝের সারির উপরে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের নির্যাতন ক্যাম্পে কিভাবে মানুষকে নির্যাতন করা হয় তারই একটি লোমহর্ষক দৃশ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এই দৃশ্যে একজন নির্যাতনকারী সন্ত্রাসী এক বন্দীর গলায় রশি বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যের নিচের অংশে রয়েছে পিতার কোলে মৃত শিশু এবং মৃত্যুর জন্য দায়ী সন্ত্রাসীর মুখ। এই অংশের নিচের ব্লকে নানা আকারে লিখা রয়েছে- 'ঞবৎৎড়ৎরংস যধং হড় জবষরমরড়হ', অর্থাৎ সন্ত্রাসীর কিংবা সন্ত্রাসবাদীদের কোনো ধর্ম নেই। বর্গাকারে বিভক্ত তৃতীয় সারির উপরে অর্থাৎ চিত্রের ডান দিকের উপরের অংশে রয়েছে ছবি এবং লিখনীর সমন্বিত রূপ। এখানে বেশ বড় বড় অক্ষরে লিখা রয়েছে- 'ডধহঃবফ এবড়ৎমব ড. ইঁংয'. লিখিত এই অংশের নিচে রয়েছে বুশের দুটো মুখ। একটি সামনাসামনি এবং অন্যটি পাশ ফেরানো। জর্জ ডব্লিউ বুশের এই দুই মুখের নিচে লিখা রয়েছে- ঋড়ৎ ঈজওগঊঝ অএঅওঘঝঞ ঐটগঅঘওঞণ অঘউ ঞঐঊ চখঅঘঊঞ.' জর্জ ডব্লিউ বুশের চিত্রের নিচের অংশে যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ ও যুদ্ধবাজদের দৃশ্য রয়েছে এবং ছোট করে লিখা রয়েছে- 'ডধরঃ ধ গরহঁঃব.' সর্বশেষ অংশে রয়েছে কয়েকটি গ্রন্থের চিত্র। যার মধ্যে রয়েছে ধর্মগ্রন্থও। এ সকল গ্রন্থে ঞড়ৎঃঁৎব, ঞবৎৎড়ৎ, ঞবৎৎড়ৎরংস এবং ঞবৎৎড়ৎরংঃ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে যে সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটবে, কারা তা ঘটাবে, কিভাবে ঘটাবে সে সম্পর্কে যে গ্রন্থসমূহে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে শিল্পী সে বিষয়ে জানান দিয়েছেন।
অশান্তি, অনাচার, সঙ্ঘাত, হত্যা এবং হুমকির মতো বিষয়গুলো স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য যে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয় সে কথা সকলেই মর্মে উপলব্ধি করেন। শিল্পীরাও বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ জন্যই সমাজে অশান্তির কারণ ঘটলে শিল্পীরা সবার আগে রঙতুলি কাগজ ক্যানভাস নিয়ে প্রতিবাদী চিত্র এঁকে প্রতিবাদ করেন। এ ক্ষেত্রে ছোটবড় বয়স কিংবা ধর্ম-বর্ণের কোনো পার্থক্য থাকে না। সবাই প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন যার যার অবস্থান থেকে। ভারতের বিখ্যাত শিল্পী যিনি নিজেও ভারতে উগ্র হিন্দুদের দ্বারা সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার হয়েছেন এবং শেষ জীবনে ব্যথিত হৃদয়ে নিজ দেশ ভারত ছেড়ে বিদেশে বসবাস করেছেন সেই শিল্পী এম এফ হুসেনও ‘কারবালা’ নামক চিত্র এঁকে সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করেছেন। তিনি হিন্দি দৈনিক পত্রিকার পাতার একটি অংশ কেটে নিয়ে সেই অংশের উপর একটি চিত্র এঁকেছেন। তার এ চিত্রের নাম ‘কারবালা’।
কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার অনুরূপ ঘটনাই যে সন্ত্রাসবাদীরা ঘটিয়ে চলেছে সে কথাই তিনি চিত্রের প্রতীকী ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক শিল্পীই সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চিত্র এঁকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এদের মধ্যে ভারতের বিখ্যাত শিল্পী যোগেন চৌধুরী, ইসমাইল গুলজি, প্রকাশ কর্মকার, লালুপ্রসাদ সাউ, পরেশ মাইতি, দিপ্পমান কর প্রমুখ শিল্পীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সন্ত্রাসবিরোধী চিত্রকর্ম বা অজঞ অএঅওঘঝঞ ঞঊজজঙজওঝগ নামক ক্যাটালগের আঁকা চিত্রসমূহ প্রমাণ করছে বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র সন্ত্রাস আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বা বিস্তার লাভ করেছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের মানুষও আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। মাঠে-ঘাটে, হাট-বাজারে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় উপাসনালয়ে কিংবা সভা সমিতিতে বোমা ফাটিয়ে মানুষ হত্যা কিংবা আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধনের ঘটনা বাংলাদেশে অতি সাম্প্রতিক কালের। পূর্বে এসব ঘটনা বিদেশে ঘটত বলে প্রচারমাধ্যমে জানা যেত। জানা যেত কারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে, কেন ঘটাচ্ছে। এও জানা যেত যে, এসব হামলার পিছনে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্রের সমর্থন কাজ করে। সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যাযজ্ঞের যে ঘটনা ঘটছে সেই ঘটনাও স্পষ্ট করেছে এ সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের সমর্থনেই ঘটে। মিয়ানমার বিষয়ক ঘটনার সংবাদে জানা যায় যে, সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞের যে ঘটনা ঘটছে সেই ঘটনা তদন্তের জন্য একটা তথ্য অনুসন্ধান দল পাঠানোর জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে সেই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগ করেছে চীন এবং রাশিয়ার মতো শক্তিধর দুটো রাষ্ট্র। অর্থাৎ মিয়ানমারে রাখাইন মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর যে নৃশংসতা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড ঘটছে সে বিষয়ে তদন্ত করতে বাধা প্রদান করেছে চীন এবং রাশিয়া।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- চীন এবং রাশিয়া গণমুখী রাজনীতির দেশ। দেশ দু’টি মানুষের জন্যই রাজনীতি করে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলে এবং তাদের উন্নয়নের জন্যই কাজ করে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে দাঁড়ায় দেশ দু’টির শাসকগণ! তাহলে মিয়ানমারের নির্যাতিত মানুষের বিপক্ষে দেশ দু’টির অবস্থান নেয়ার কারণ কি? কারণ আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তদন্ত চেয়েছে বলেই এই বিরোধিতা। আর এরই মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে চীন রাশিয়ার গণমুখী আদর্শ, নির্যাতিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নেয়ার আদর্শ ভুয়া। তাদের নীতি আদর্শ স্বার্থের এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত। এই বিদ্বেষপ্রসূত রাজনীতিই বিশ্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। এর অবসান হওয়া জরুরি। আর এ জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলন জোরালো হওয়া প্রয়োজন। শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীসহ সকল স্তরের মানুষকে এ আন্দোলনে সামিল হতে হবে। হতে হবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। চিত্রশিল্পীর সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা বেগবান করতে হবে। আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে শিল্পীর কর্মকাণ্ডকে। মুখোশ উন্মোচন করতে হবে সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মদদদাতাদের। যেমনটি করেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মাধ্যমে।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫