ঢাকা, সোমবার,২৬ জুন ২০১৭

বিবিধ

ভাষা চর্চায় বিদেশী শব্দের গ্রহণ-বর্জন

মোজাফফর হোসেন

১৫ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:৩২


প্রিন্ট

বাংলা ভাষার শব্দমালাতে তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশী ও বিদেশী এই পাঁচশ্রেণীর শব্দের সংযোজন ঘটেছে। এই পাঁচশ্রেণীর শব্দই এখন বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। শুধু বিদেশী শব্দগুলো ব্যতীত অন্য শব্দগুলো প্রাচীনকাল থেকেই এ ভূখণ্ডে কোনো না কোনোভাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। বাংলা ভাষার শব্দগুলোকে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক অনুপাতে উল্লেখ করেছেন এভাবে- তৎসম শব্দ শতকরা ২৫ ভাগ; অর্ধতৎসম ৫ ভাগ; তদ্ভব ৬০ ভাগ; দেশী দুই ভাগ এবং বিদেশী আট ভাগ। বাংলা ভাষাতে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজারের মতো শব্দ রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার তৎসম; দুই হাজার ৫০০-এর মতো আরবি-ফারসি। তুর্কি চার শ’; ইংরেজি প্রায় দেড় হাজার; পর্তুগিজ-ফরাসি ১৫০ এবং অন্যান্য বিদেশী-দেশী ও তদ্ভব শব্দের প্রচলন দেখা যায়। বাংলা ভাষাতে যে আট ভাগ বিদেশী শব্দ রয়েছে, সেসব শব্দের বাংলা কোনো প্রতিশব্দ নেই বলেই বাংলা ভাষা তা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া বাংলা ভাষার শব্দগুলো এ দেশের মাটিতেই জন্মলাভ করেছে।
এ দেশের মাটিতে জন্ম নেয়া শব্দগুলো দিয়ে যখন মনের অভিব্যক্তি সঠিক এবং পরিস্কারভাবে বুঝানো কষ্টকর হয়ে ওঠে, তখন বাংলা ভাষা তার প্রয়োজনমাফিক সেই শব্দগুলোকে ভেঙে নতুন রূপে তৈরি করে নিয়েছে। যেমন- ‘হস্তগত, হস্তান্তর’ শব্দদু’টি। ‘হস্ত’ এটি তৎসম শব্দ; আধুনিক বাংলা হাত। কোনো বস্তু বা জিনিস হাতে এসেছে এমন অর্থ বুঝাতে বলা হয় হস্তগত হয়েছে। আবার কোনো বস্তুর সত্ত্ব ত্যাগ করা অর্থে হস্তান্তর শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। হাত বলতে মানুষের একটি অঙ্গকে বোঝা যায়, কিন্তু হাত এর সাথে ‘আ’প্রত্যয় যুক্ত করলে তখন আর অঙ্গ না বুঝিয়ে ভিন্ন একটি বস্তু বোঝায়। এভাবেই এ দেশে উৎপন্ন শব্দগুলো তার রূপ বদলিয়ে বাংলা ভাষায় মিশে গেছে। বিদেশী শব্দগুলোও বাংলা ভাষার শব্দের ঘাটতি পূরণে সহায়তা যে করেনি তা নয়।
বিদেশী ভাষার শব্দগুলো বাংলা ভাষার ঘাটতি পূরণে সহায়তা করেছে তার মানে এই নয় যে, বিদেশী সব শব্দকেই অবলীলায় আলিঙ্গন করা যায়। একটি ভাষায় বিদেশী শব্দ প্রাধান্য পেলে সে ভাষার টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেতে পারে। ভাষার আগ্রাসন এখন পৃথিবীসুদ্ধ চলছে। বেশ কয়েকটি ভাষা বিভিন্নভাবে অপেক্ষাকৃত ছোট ভাষার উপর সুকৌশলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার আগ্রাসন প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার উপর হিন্দি ভাষার অগ্রাসনকেও কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে বাংলা ভাষার মানহানি হতে পারে বলে মনে করা যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী যখন তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের জন্য রাজনৈতিক আগ্রাসন চালায়, তখন তাদের ভাষা ও কৃষ্টি কালচারকে সঙ্গে নিয়েই আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। বাংলা ভাষার সুনাম রক্ষার্থে এই দিকটি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়তে পারে এবং বিদেশী শব্দগুলোকে সতর্কতার সাথে গ্রহণ করার দাবি রাখে।
বাংলা ভাষাতে সংস্কৃতশব্দের কোনগুলোকে রাখা হবে আর কোন ধরনের শব্দগুলো বাদ দিতে হবে এবং বাংলা ভাষার সামগ্রীক রূপটি কেমন হতে পারে সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষা’ নামক নিবন্ধে বলার চেষ্টা করেছেন। নিবন্ধটি ১৩৭ বছর পূর্বে ১২৮৫ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বঙ্কিম সাহেব তাঁর নিবন্ধে সংস্কৃত ভাষার বাহুবল থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করে একটি সতন্ত্র রূপ দেয়ার কথা বলেছেন। চলিত ভাষাও যে সাহিত্যের ভাষা বা লেখ্য ভাষা হতে পারে তার প্রমাণ প্রথম মেলে প্যারীচঁাঁদ মিত্র ওরফে টেক চাঁদ ঠাকুর রচিত ‘আলালের ঘরের দুলাল’ গ্রন্থে। এ গ্রন্থটি চলিত বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে। মানুষ যে ঢঙে কথা বলে, সেই চলিত ঢঙের বাংলাতেই গ্রন্থটি প্রস্তুত করা হয়েছে। আলালের ঘরের দুলাল রচিত হওয়ার আগে বাংলা ভাষার লেখ্য ও কথ্য এই দু’টি রূপ আলাদা আলাদাভাবে চলে আসছিল। লেখ্যরূপ হিসেবে সাধু ভাষা (সংস্কৃত ভাষার শব্দবহুল) এবং কথ্যরূপ হিসেবে চলিত ঢঙ (প্রায় সংস্কৃত শব্দলুপ্ত) ব্যবহার হতে থাকে। অর্থাৎ মানুষ যে সাবলীল বাক্যে কথা বলেছে, লেখার সময় সেটিকে বাদ দিয়ে সাধু ভাষায় লেখা হয়েছে। অর্থাৎ বইপুস্তকের ভাষা এক এবং কথা বলার ভাষা আরেক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকে ফুলমণি ও করুণার বিবরণ, আলালের ঘরের দুলাল, হুতুমপেচা, মৃণালিনী ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। তখন ভাবা হয়েছিল বাংলা ভাষা এভাবে চলতে থাকলে ক্রমান্বয়ে ভাষার আয়ু হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সে জন্য বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ুকল্পেই রচিত হয়েছিল চলিত ভাষাসম্বলিত উল্লিখিত গ্রন্থাদি। এখন মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবেই লেখে এবং সে ভাষাতেই বইপুস্তক রচিত হয়। সেদিন সাধু-চলিত এর সঙ্কট থেকে বাংলা ভাষা অবমুক্ত হয়েছে, কিন্তু আজ বাংলা ভাষা আবার নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। বিদেশী ভাষার আগ্রাসন সেই সঙ্কটকে আরো গভির করে তুলতে পারে। এই সঙ্কট নিরসন করতে না পারলে ভাষার অস্তিত্বও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।
সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালু হবে এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভাষা অন্দোলনে রক্ত ঝরলেও বাংলা ভাষা সর্বস্তরে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। এমতাবস্থায় ইংরেজি ও হিন্দি ভাষা বাংলা ভাষার বুকে চেপে বসতে চলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট মিডিয়ার প্রভাবে হু হু করে বিদেশী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করতে দেখা যাচ্ছে। কোনোপ্রকার বিচার-বিবেচনা ছাড়াই সেসব শব্দ এ দেশের মানুষ কথায় কথায় বলছে এবং দলিল-দস্তাবেজ ও বইপুস্তকে ব্যবহার করছে। এ ধারা চলতে বাধা না পেলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যত পথচলা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হতে পারে।
ভাব ও অর্থ ঠিকঠাকভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে যদি দেখা যায় যে (ভাব ও অর্থ প্রকাশে) যথোপযুক্ত কোনো শব্দ বাংলা ভাষায় পাওয়া যাচ্ছে না, বিদেশী কোনো শব্দ হলে সে অর্থ পরিস্কার হয়ে উঠবে সে ক্ষেত্রে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে ভাষার কোনো ক্ষতি না হয়ে ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারে। ভাব ও অর্থের অনুকূল বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও সেসব শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বিদেশী শব্দকে গ্রহণ করা হলে বাংলা ভাষার দীর্ঘায়ু স্বল্পদৈর্ঘ্য হতে পারে। সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে, বহু মানুষ কথায় কথায় ইংরেজি ও হিন্দি শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। যেমনÑ ফল কিনতে যাচ্ছি ; না বলে বলা হচ্ছে ‘ফ্রুট কিনতে যাচ্ছি’। ঠিক আছে না বলে বলা হচ্ছে ‘দ্যাট্স ওকে’। উপায় নেই না বলে বলা হচ্ছে ‘নো ওয়ে’। দুঃখিত না বলে বলা হচ্ছে ‘স্যরি’। জাদুকর না বলে বলা হচ্ছে ‘ম্যাজিশিয়ান’। লেখক না বলে বলা হচ্ছে ‘রাইটার’। শিক্ষক না বলে বলছে ‘টিচার’। চাচা-চাচী, খালা-খালু, মামা-মামী না বলে বলা হচ্ছে আঙ্কেল-আন্টি। খালাত ভাই, খালাত বোন; মামাত ভাই, মামাত বোন; ফুফাত ভাই, ফুফাত বোনকে বুঝাতে ‘কাজিন’ বলা হচ্ছে। ‘কাজিন’ বলতে কী খালাত বোনকে বোঝাবে না মামাত ভাইকে বুঝাবে? স্পষ্ট নয়, অথচ বাংলা ভাষায় এই সম্পর্কগুলোকে পরিস্কার করে বোঝানোর জন্য আলাদা আলাদা শব্দ থাকলেও বিদেশী শব্দকে ‘কাজিন’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ছোট ছোট ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শব্দগুলোই ধীরে ধীরে মহীরুহে পরিণত হয়ে বাংলা ভাষার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এভাবে বাংলা শব্দকে বাদ দিয়ে ইংরেজি শব্দের চর্চাতে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা নাও হতে পারে। কোনো বাক্যের অর্ধেকটা ইংরেজি আর অর্ধেকটা বাংলা বলা হলে সময়ের ব্যবধানে বাকি অর্ধেক বাংলা ব্যাক্যটাও ইংরেজি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এটিই ভাষার আগ্রাসন। এভাবেই একটি ভাষাকে অন্য একটি ভাষা গ্রাস করে ফেলতে পারে। একটি ভাষার উপর আর একটি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে সুপরিকল্পিতভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতে পারে। একজন মনুষ একাধিক ভাষা আয়ত্ব করতে পারে তাতে দোষের কিছু নেই। বহুভাষির জন্য কথা বলার সময় বা লিখার সময় খেয়াল রাখা জরুরি যে, একটি ভাষাতেই বাক্যপূর্ণ করে কথা বলা হচ্ছে কি না। বাক্য পরিপূর্ণ করতে একসাথে একাধিক ভাষার শব্দ ব্যবহার না করাই সমীচীন। যদি লেখার সময় বা বলার সময় ইংরেজি বাক্য ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে সেই বাক্যটি ইংরেজি শব্দে ইংরেজি বর্ণেই পরিপূর্ণ করে তার অনুবাদ বাংলায় করে দিতে না পারলে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বাক্যটি বেমানান হয়ে ওঠে। কোনোভাবেই ছয় শব্দের একটি বাক্যের চারটি বাংলা শব্দ আর দু’টি ইংরেজি শব্দ (যে শব্দের প্রতিশব্দ বাংলায় রয়েছে ) ব্যবহারে একটি বাক্য পূর্ণ করাকে প্রতিরোধ করতে না পারলে বাংলা ভাষার চর্চা রুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিদেশী ভাষার আগ্রসন প্রতিরোধে এবং বাংলা ভাষার চর্চা কল্পে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে ভাষাচর্চায় একটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। ক. প্রত্যেক উপজেলাতে একটি করে দফতর রাখা যেতে পারে, যেখানে এসে জনসাধারণ তাদের ব্যানার, পোস্টার, সাইনবোর্ড ইত্যাদির বানান, বাক্য, শব্দচয়ন ইত্যাদি ঠিক আছে কি না তা অনুমোদন করে নিয়ে সেটি টাঙানোর ব্যবস্থা করতে পারে। যেসব মানুষ তাদের ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার অনুমোদন করাবে না তাদের জরিমানার পর্যায়ে আনা যেতে পারে। খ. কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে চাইলে অবশ্যই সেই নাম বাংলা ভাষার বাংলা শব্দ ও বর্ণে লেখা যেতে পারে। ইংরেজি কোনো শব্দ বাংলা বর্ণে লেখার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে রাখতে চাইলে সে নাম ইংরেজি বর্ণমালায় বাংলা বর্ণের আকারের চেয়ে ছোট আকারের বর্ণে লেখা এবং তা বাংলা নামের নিচে স্থান করে দেয়ার চর্চা করতে হবে। গ. টেলিভিশন ও খবরে কাগজের খবরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপণগুলোর ভাষা শুদ্ধ বাংলায় হতে হবে বিদেশী শব্দ উপেক্ষা করার চেষ্টা থাকতে হবে। বাংলা একাডেমির দফতর থেকে প্রতিনিধির মাধ্যমে সারা দেশে ভাষা চর্চার বিধিনিষেধকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে কি না তা দেখভাল করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। ঘ. বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হলে এবং ভাষার স্থায়ীত্ব দীর্ঘায়িত করতে গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা জরুরি হতে পারে। এসব বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় না আনতে পারলে বাংলা ভাষার ব্যাপারে আশাহত হওয়া ব্যতীত আর অন্য উপায় কী হতে পারে!

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫