ঢাকা, শনিবার,২৪ জুন ২০১৭

গল্প

নিষুপ্ত সম্ভ্রম

জয়া সূত্রধর

১৫ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৯:১৩


প্রিন্ট

বাতাসের একটানা শোঁ শোঁ শব্দ। অন্ধকারের ভাঁজে লুকিয়ে লুকিয়ে যেন প্রচণ্ড দমকা বাতাস বৃষ্টির জলধারাকে একটু পরপর সৌম্যদের আধাপাকা ঘরের টিনের চালে আছড়ে ফেলছে। সৌম্য ঘরের ভেতরে বড় খাটে বাবা মা’র মাঝখানে শুয়ে আছে। তবু তাদেরই টিনের চালে বাতাসের এমন অত্যাচারী দাপটে বারবার কেঁপে উঠছে সে। চোখ বন্ধ করে রেখেছে অথচ ভয় কমছে না এতটুকুও। বাতাসের পাগলা মাতম আর অদূরে কোত্থেকে ভয়ানক কর্কশ কণ্ঠে ভেসে আসা অদ্ভুত ছন্দহীন বিকট সুর আকাশে বাতাসে মিশে যাচ্ছে! অজানা আতঙ্কে মাকে জাপটে ধরে ফেলল সৌম্য। মা ঘুমায়নি। মায়ের বুকটা কেঁপে কেঁপে কেমন ফুঁপিয়ে উঠছে। সৌম্য জানে, মা এখন নীরবে কাঁদছে। তাই এমন হচ্ছে। মা কাঁদবে, সারারাত কাঁদবে। ঝড় থেমে গেলেও কাঁদবে মা। বাইরের ঝড় তো এমনি এমনিই থেমে যায়। মায়ের কেন থামে না? দিনের আলোয় মায়ের হাসিভরা মুখের ছবি ভেসে ওঠে সৌম্যর ভয়মিশ্রিত মানসপটে। মায়ের হাসিভরা মুখে যেন জাদু আছে। মায়ের মুখে যখন হাসি থাকে, কিছুতেই মাকে দূরে যেতে দিতে ইচ্ছে করে না। নির্ঘুম রাতে মাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে সৌম্য। এমন সময় আবার সেই কর্কশ সুর বাতাসের ঝাপটার সাথে মিশে ক্রমশ যেন কাছে আসার চেষ্টা করছে।
ভয় আর সম্বরণ করতে পারল না সৌম্য।
মায়ের আরো নিবিড়ে গিয়ে প্রশ্ন করল, ‘মা, বাইরে কে গান গায়? ওই যে!’
ভারীকণ্ঠে মা উত্তর দিলেন, ‘কেউ গান গায় না, বাবা। বাঁশঝাড়ে বাতাস লাগলে বাঁশগুলোর মধ্যে যে ঘর্ষণ হয়, তারই আওয়াজ এটি। ভয় করো না। ঘুমিয়ে পড়।’
মায়ের বুকে ঘুমানোর চেষ্টা করে সৌম্য। কিন্তু মায়ের বুকের কষ্টগুলো থেকে থেকে ফিকে হয়ে উঠছে। নিজের বুকের ভেতরেও অজানা এক কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে সৌম্যর। খাটের ও পাশে বাবা ঘুমাচ্ছে। নিশ্চিন্ত শান্তির ঘুম। সৌম্য ভাবে, মায়ের জন্য তার যেমন কষ্ট হয়, বাবার কেন হয় না?
বাবা আজ রাতেও তার মাকে মেরেছে। প্রায়ই মারে। কোনো দিন হয়তো মা বাবার সাথে বেশি তর্ক করে ফেলে সেই অপরাধে, নয়তো বাজার থেকে বাবা যা কিনেছে তা মায়ের পছন্দ হয়নি এটা বলাতে অথবা মা টাকা বেশি খরচ করে বলে, কোনো না কোনো একটা কারণেই মাকে মার খেতে হয়।
সৌম্যর মা রোজলিন গোমেজ। প্রাইমারি স্কুল টিচার। বাবা তপন সৌরভ কোরাইয়া হাইস্কুল টিচার। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানা সদরে নিজেদের বাড়িতে থাকে তারা। সৌম্য আটে পা রেখেছে। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। বুদ্ধি হওয়া অবধি সৌম্য দেখে আসছে বাবার হাতে মাকে নিগৃহীত হতে।
আচ্ছা, বাবা মায়ের মধ্যে কিসের অত ঝগড়া?
মিলন, টিটু, অনন্যা, প্রাজ্ঞ, সাথী- কত খেলার সাথি ওর। কই, ওদের সাথে কখনো ঝগড়া বাধে না তো!
ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না সৌম্য।
কখন ঝড় থেমেছে কে জানে। ঘুম থেকে উঠে সে অবাক। রাতের সেই ভয়াল আকাশে এখন সূর্যের ঝলমলে হাসি। এত অন্ধকার, এত গর্জন, ঝড়ের দাপট সব যেন দেখার ভুল ছিল।
রোজলিন গোমেজকে আজকাল প্রায়ই ছুটি কাটাতে হচ্ছে। কারণ, উপজেলা শিক্ষা অফিস হয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে তার বদলির আবেদন দেয়া হয়েছে। দুই বছর ধরে একই আবেদন নিয়ে ছোটাছুটি করছে সে। স্বামীর নির্যাতনে তার জীবনের সমূহ বিপন্নতার কথা উল্লেখ করে মানবিক কারণে বাবার বাড়ির ঠিকানায় বদলির আবেদন করেছে সে। লাভ হয়নি কিছুই। কারণ, আবেদনটি বদলির নীতিমালাবহির্ভূত। স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা, স্বামীর কর্মস্থল, নদীভাঙনে স্বামী ও পরিবারের ঠিকানা পরিবর্তন এসব কারণের বাইরে বদলি অসম্ভব। তবুও একই আবেদন নিয়ে বারবার আসায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাকে ডেকে পাঠালেন। সামনে বসিয়ে বললেন, ‘মিসেস গোমেজ, আপনি একযুগ অতিক্রম করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা আপনার অজানা নয়। আমিও চাকরি করি। নীতিমালায় পড়ে না, এমন আবেদন কি আমি ফরওয়ার্ড করে পাঠাতে পারি? আপনিই বলুন?’
‘ স্যার, আমার জন্য কোনো উপায় কী নেই?’
শুষ্ক আর হতাশাভরা কণ্ঠ মিসেস গোমেজের।
‘এখানে আমার জীবন নাশের আশঙ্কা আছে স্যার। দয়া করে একটা সমাধান বলে দিন,স্যার। ’
শিক্ষকদরদী, পরোপকারী, ডিপিইও কিছুটা ভাবলেন। তারপর মিসেস গোমেজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আপনি মহাপরিচালক বরাবর আবেদন প্রেরণ করে দেখতে পারেন। যদি কোনো উপায় থাকেতো, স্যার নিশ্চয়ই আপনাকে সাহায্য করবেন। ’
স্যারকে ধন্যবাদ জানিয়ে কালীগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন রোজলিন গোমেজ।
আজ ১৯ শে জানুয়ারি। পৌষের শেষার্ধের কড়া শীত। হিম জড়ানো শ্বেতাঙ্গ প্রকৃতির সাথে প্রথম সখ্য গড়তে এই দিনে রোজলিনের কোল আলো করে পৃথিবীর মুখ দেখেছিল ফুটফুটে সৌম্য। মিসেস গোমেজের কাছে এই দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। সবরকম মন খারাপের বিদায়ের দিন এটি। ভোরে উঠে ঘুমন্ত সৌম্যকে ‘শুভ জন্মদিন’ জানিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বারান্দার চেয়ারে বসে তার স্বামী তপন কিছু একটা করছিলেন। গোমেজ খুব উৎফুল্লতার সাথে এগিয়ে গেলেন স্বামীর কাছে।
বললেন, ‘শোন, এইবার সৌম্যর জন্মদিনে কিন্তু ওর সব সঙ্গী-সাথীদের বেশ করে খাওয়াব। ওরা সৌম্যকে কত ভালোবাসে,তাই না?’
কোরাইয়াকে খুব বেশি চঞ্চল দেখাল না। তিনি গোমেজের প্রস্তাবে অর্ধসম্মত আছেন তেমন একটা ভাব দেখিয়ে বললেন, ‘কী কী করতে চাও?’
‘সন্ধ্যায় তিন পাউন্ডের একটি দ্বিতল কেক, মিষ্টি, মিষ্টান্ন, ফল এইসব। এরপর রাতের খাবার। আমি লিখে দিচ্ছি কী কী আনতে হবে। তুমি স্কুলে যাওয়ার আগেই বাজারটা করে দিয়ে যেও, প্লিজ।’
‘আমার কাছে অত টাকা নেই।’ বলে উঠে দাঁড়ালেন কোরাইয়া।
‘দাঁড়াও, আসছি।’ বলেই এক মুহূর্তে গোমেজ ঘরে গিয়ে আবার ফিরে এলেন। হাত বাড়িয়ে কোরাইয়ার হাতের ভাঁজে নিজের হাতের মুঠো পুরে দিয়ে বললেন, ‘এই নাও। তিন হাজার টাকা আছে এখানে। প্লিজ, দেরি করো না।’
অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো মুখের ভঙ্গী করে বাজারে গেলেন কোরাইয়া।
‘মা...’
নিত্যদিনের অভ্যাস। ঘুম থেকে জেগেই মাকে ডাকবে সৌম্য। মা কাছে এলে তবেই চোখ খুলবে,তারপর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে উঠে বসবে।
ডাক শুনে দৌঁড়ে ছুটে এলেন গোমেজ। কপালে স্নেহের আশীর্বাদ এঁকে দিয়ে বললেন, ‘বাবা, শুভ জন্মদিন।’
সারা দিন স্কুলে সহপাঠীদের সাথে কাটিয়ে বিকালে মা-বাবা স্কুল থেকে ফিরলেই জমে উঠবে জন্মদিনের পার্টি। জানে সৌম্য। মনেপ্রাণে স্ফূর্তি অনুভব করে সে। মায়ের হাত ধরে বারান্দায় আসতেই খুশিতে ঝলমল করে ওঠে তার চোখ। অপার আনন্দ আর বিস্ময়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে সৌম্য। ততক্ষণে তার চার পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে খেলার সাথীরা। যে যেমন পেরেছে হাতে ফুল নিয়ে এসেছে। কেউ গাঁদা, কেউ গোলাপ, কেউ বাগানবিলাস, কেউ কেউ নিজজংলা থেকে মাকে লুকিয়ে সৌম্যর প্রিয় ঝিঙে ফুল অথবা লাউফুল দিয়ে জন্মদিনের শুভেছা জানায় সৌম্যকে। তারপর সবাই মিলে একটা ডালায় গুছিয়ে রাখে ফুলগুলো। অনেক ঘাসফুলের মাঝখানে রমন ফুল দিয়ে সুদৃশ্য একটি তোড়া বানিয়েছে সবাই মিলে, বুদ্ধি করে সেটি খেলনা ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখল তারা।
বিকেলে সোম্যর সাথীরা সবাই মিলে ঘর সাজাতে লেগে গেল। আর মা গোমেজ স্কুল থেকে ফিরে বাজারের ব্যাগ হাতে নিলেন। এখন থেকেই রান্না শুরু করতে হবে। নয়তো রাত বেশি হয়ে গেলে শিশুদের সবার ঘুম পেয়ে যাবে।
বাজারের ব্যাগ থেকে একে একে সব বের করে সাজাতে শুরু করলেন। কিন্তু এ কী! বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে যায়। ছুটে যান স্বামী কোরাইয়ার কাছে। কোরাইয়া তখন স্কুল থেকে ফিরে সবে বিছানায় গা এলিয়েছেন। গোমেজ একবারে স্বামীর নিকটবর্তী হয়ে মৃদ্ ুঝাঁকুনি দিয়ে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘এই, শুনছ? কী করেছ এইসব? এই এক পাউন্ডের কেক এনেছ মাত্র? আমাদের সৌম্য এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। ওর মনটা কেমন লাগবে ছোট কেক দেখে, বল? ওহো, ইস দইটাওতো আনোনি। আহা, ফল কোথায়? ওরা বন্ধুরা মিলে খাবে, তুমি বুঝতে পারছ না। আরেকবার কষ্ট করে যাও, প্লিজ। এসব নিয়ে এসো।’
হাত ধরে টেনে তুলতে চেষ্টা করলেন গোমেজ। কোরাইয়া হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে গম্ভীর হয়ে উঠলেন। গলায় আপত্তির সুর টেনে বললেন, ‘এ জন্মদিন করছ নাকি বিয়ের অনুষ্ঠান? জন্মদিনে এত খরচ করার কী আছে?’
আস্তে আস্তে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন কোরাইয়া।
যা আছে তাই নিয়েই আনন্দ উল্লাসের ঘাটতি হলো না। সৌম্য আর তার বন্ধুরা মায়ের সস্নেহ সান্নিধ্যে হৈ হুল্লোড় করে কাটিয়ে দিল কয়েকটি ঘণ্টা। অবশ্য সৌম্যদের আনন্দ উপভোগের জন্য তেমন কিছুই লাগে না। ঘর সাজানোর বেলুন হতে একটা বেলুন কোনো কারণে ফুটে গেলেই হলো। ব্যস! বেলুনের ছিন্নভিন্ন একেকটি টুকরো নিয়ে আঙুলের মাথা দিয়ে ছোট ছোট বেলুন তৈরি করে একটির সাথে আরেকটির অথবা তর্জনীর ছোঁয়ায় কচকচ শব্দের খেলায় মেতে গেল সবাই।
রাতে বন্ধুরা বিদায় নিলে সৌম্য মায়ের কথামতো শুয়ে পড়ে। কিন্তু বাবার জন্য মনটা অস্থির হয়ে আছে। কেক কাটার সময়ও বাবা আসেনি। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা বাজার ডিংডং শব্দ হলো। সৌম্য শুনতে পাচ্ছে। ঘুম আসছে না তার। থেকে থেকে বাবার কথা মনে পড়ছে।
বেশিক্ষণ ভাবতে হয়নি সৌম্যকে। বাবা এসে গেছে। সৌম্যর ইচ্ছে করল লাফ দিয়ে উঠে জন্মদিনের সব মজার কথাগুলো বাবার সাথে ভাগ করে নেয়। কিন্তু তার আর সময় বুঝি হলো না। বাবা ততক্ষণে তীক্ষè কণ্ঠে মাকে জেরা করতে শুরু করেছে।
বাবা বললো, ‘আমাকে ছাড়া নেচে বেড়াতে কেমন লাগল, রোজলিন গোমেজ?’
মা বললো, ‘দেখ, তোমাকে হাজারবার ফোন দিয়েছি। রিসিভ করনি। ছেলের জন্মদিন, কেক কাটার সময় থাকা তোমার উচিত ছিল।’
বাবা, ‘তুই-ই তো সব পারিস, গোমেজ।’
এরপর কঁকিয়ে ওঠার শব্দ হলো একটা।
সৌম্য চোখ বন্ধ রেখেই বুঝতে পারল বাবা মায়ের চুল মুঠিতে চেপে ধরেছে।
বাবার গলার আওয়াজ আরো চড়া শোনাচ্ছে, ‘জন্মদিন? অপব্যয়কারী শয়তান তুই। নইলে ওমন রাজকীয় আয়োজন করিস? তুই নিজে খারাপ, ছেলেটাকেও অপচয় করার হাতেখড়ি দিচ্ছিস।’
মা প্রতিবাদের সুরে বলল, ‘ছেলের জন্য ভালো কিছু করা, বিশেষ দিনে ছেলের পাশে থাকা তোমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তুমি আজ বাড়িতে না থেকে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছ।’
মা আরো কিছু একটা হয়তো বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বাবা আর সুযোগ দিল না। ধুপ করে ফ্লোরে একটা শব্দ হলো। চোখ খুলে দেখল সৌম্য মাকে পাকা মেঝেতে ফেলে দিয়েছে বাবা।
সৌম্যর কান্না পায়। কিন্তু কান্না চাপিয়ে রাখতে চেষ্টা করে সে। যদি তার কান্না দেখে বাবা আরো রেগে যায়!
ধুপধাপ শব্দে মাকে এলোপাতাড়ি মারছে বাবা। ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসে সৌম্যর।
‘আমার বয়স দশ। আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। তবুও আমার সাহস নেই কেন? বাঁধন,কনকদের কত সাহস! ওরা নিজেরা মারামারি করে আবার অন্যদের মধ্যে মারামারি লাগলে তা ছাড়িয়েও দেয়। আমি কেন ওদের মতো নই...?’
নিজের প্রতি এক ধরনের গ্লানি তৈরি হয় তার।
ওই যে আবার! ইস, মায়ের কষ্টে চোখ ফেটে জলের প্লাবন ছোটে সৌম্যর।
মা কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে, বুঝে ওঠার আগেই মায়ের কণ্ঠটা কোথায় যেন বাধা পেয়ে থেমে গেল।
পাঁচ থেকে ছয়বার নিঃশ্বাস ফেলতে সৌম্যর যতটুকু সময় লাগে, ততটুকু সময়ের মধ্যে সে চাপা গোঙানির একটা আওয়াজ শুনতে পেল। অদ্ভুত অজানা সে আওয়াজ। ভয়ে সৌম্যর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। এইবার আর স্থির থাকতে পারে না সৌম্য। ভয়ের কথা ভুলে গিয়ে চোখ খুলে উঠে বসে।
‘হায় ঈশ্বর! কী দেখছি আমি’- একবারমাত্র ভাবতে পারল সৌম্য। তারপর খাট থেকে লাফিয়ে বাবাকে প্রাণপণে পেছন দিকে টেনে আনার চেষ্টা করল। বাবা মায়ের বুকের উপর চেপে বসে শক্ত দু’হাতে গলা টিপে ধরেছে। মায়ের চোখ বড় হয়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না মা। মাকে বাঁচাতে হবে। সে প্রাণপণে বাবাকে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা’।
কোরাইয়া ছেলের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে যান। ছেলেকে পেছনে ঠেলে বলেন, ‘আহ! তুমি বাইরে যাও।’
কোরাইয়ার হাতের ঝটকানিতে ছিটকে পড়ে সৌম্য। পেছনের দেয়ালে লেগে মাথায় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভব করে সৌম্য। খটাস করে শব্দ হয়। মাথা ধরে বসে পড়ে সৌম্য। গোমেজের তখনো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু চেতনা বিলুপ্ত হয়নি। ঊর্ধ্বমুখী শ্বাস নিতে নিতে কনুইয়ে ভর করে করে কাছে এসে ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন।
কোরাইয়া এই দৃশ্যের যবনিকা টানতে চান। তাই আর কোনো ঝামেলা না করে বাইরে যেতে যেতে গোমেজকে উদ্দেশ করে বলতে থাকেন, ‘তোর বাপকে বলিস যেন তোকে বদলি করে এখান থেকে নিয়ে যায়। তোর মতো অলক্ষ্মীর আমার বাড়িতে জায়গা হবে না।’
বাতাসের ভর সইতে না পেরে বাঁশপাতা যেমন তিরতির করে কাঁপতে থাকে, সৌম্য তেমনি করে কাঁপতে লাগল। কাঁপা কাঁপা হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা চলো, আমরা মামা বাড়ি চলে যাই।’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫