ঢাকা, রবিবার,২০ আগস্ট ২০১৭

পাঠক গ্যালারি

জনগণ এখন করের মহাসড়কে!

এম কে দোলন বিশ্বাস

১২ জুন ২০১৭,সোমবার, ১৪:১১


প্রিন্ট

আমাদের আমলেই একমাত্র জনবান্ধব বাজেট জনগণ পেয়ে থাকেন। যার ফলে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশ এখন উন্নয়নের মহসড়কে। এমন রসালো অবদানের স্লোগান দিয়ে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় বাজেট দাবি করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, এ বাজেট বাস্তবায়ন হলে দেশের জনগণ নিতান্তই নিমজ্জিত হবে ভ্যাট কিংবা করের মহাসড়কে।
ব্যবসায়ীদের দাবি পুরোপুরি উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ভ্যাটের অভিন্ন হার ১৫ শতাংশই রাখা হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরে ব্যবসায়ীরা এই হারেই ভোক্তাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করবেন। ফলে শুধু এক বছরে ভ্যাটের মাধ্যমে জনগণের পকেট থেকে নেয়া হবে প্রায় লাখ কোটি টাকা। বর্ধিত এই ভ্যাটের হার নিশ্চিতভাবে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। এতে বেশ চাপে পড়বে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। যারা কি না ইতোমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেসামাল দামের চাপে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন।
খেলাপি ঋণ কেনো বেড়ে চলেছে, তা কমানো যাবে কিভাবে, সরকারি ব্যাংকের অধঃপতনের নেপথ্য কারণ কী? তা বাজেটের কোথাও উল্লেখ নেই। দেশ থেকে প্রতি বছর যে বিপুল অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা কিভাবে ঠেকানো যাবে। দেশ থেকে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিই বা কিভাবে কমানো যাবে। এসব বিষয় এড়িয়ে গেছেন আমাদের বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী। বরাবরই যা তিনি করে থাকেন, এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি!
নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অনুযায়ী আগামী তিন বছর সব পণ্য ও সেবা বিক্রির ওপর অভিন্ন ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য হবে। তবে নিত্যপণ্য, কৃষি ও সেবাখাতের এক হাজার ৪৩টি তালিকাভূক্ত পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনে। এর মধ্যে চাল, ডাল, মুড়ি, চিড়া, চিনি, আখের গুড়, মাছ, গোশত, শাক-সবজি, তরল দুধ, প্রাকৃতিক মধু, বার্লি, ভুট্টা, ভোজ্যতেল, গম ও ভুট্টার তৈরি সুজি, লবণসহ ৫৪৯টি নিত্যপণ্যে ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্য দিকে একই সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়- কৃষি, গবাদিপশু ও মৎস্য চাষ খাত সংশ্লিষ্ট ৪০৪টি ক্ষেত্রে। এ ছাড়াও ৯৩ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ওপর এবং গণপরিবহন, সেবা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিকসেবা প্রভৃতির ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্য এবং এ বিষয়ে অর্থবিল-২০১৭ পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগামী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে কাস্টমস আইন ১৯৬৯-এর অব্যাহতি সংক্রান্ত প্রথম তফসিল সংশোধন করে নতুন মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এই সংশোধনীর ফলে নতুন অর্থবছরে পণ্যের ভোক্তারা প্রস্তাব অনুযায়ী এক সাথে আড়াই কেজি পর্যন্ত পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ভ্যাটমুক্ত সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের ভেতরে সব ধরনের অস্থায়ী হোটেল ও রেস্তোরাঁয় খাদ্যদ্রব্য সরবরাহকে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
এবার নতুন করে ব্যাংক লেনদেনের ওপর কর হার বাড়ানো হলো। ব্যাংকে এক লাখ টাকার বেশি থাকলে এখন আগের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। বছরের যেকোনো সময় ব্যাংক হিসাবে এক লাখ টাকা ডেবিট কিংবা ক্রেডিট হলে এতদিন ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক কাটা হতো।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ৮০০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট প্রস্তাবনায় বলেছেন, ব্যাংক হিসাবে লেনদেন এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যমান ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৮০০ টাকা, ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে দুই হাজার ৫০০ টাকা, এক কোটি টাকা থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সাত হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ১২ হাজার টাকা এবং পাঁচ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে বিদ্যমান ১৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। টার্নওভার করের সীমা বছরে ৮০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠানের মাসিক টার্নওভার গড়ে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচে, তাদের চার শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হবে। এতদিন ৩০ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভারের ক্ষেত্রে তিন শতাংশ কর প্রযোজ্য ছিল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলামের সাথে সহমত পোষণ করে বলতে হয়- ‘অবাস্তব ও পকেট কাটার বাজেট’ এটি। বাজেটের লক্ষ্যমাত্রাগুলো অতি উচ্চাভিলাষী, অবাস্তব এবং বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হবে। ভ্যাট ও ব্যাংকে জমানো অর্থের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ জনগণের পকেট কেটে আদায় করা হবে রাজস্ব। মূলত সরকার আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন সামনে রেখে নিজেকে জনপ্রিয় করতে এ বিশালাকারের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।
dulonbiswas@gmail.com

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫