ঢাকা, সোমবার,২৬ জুন ২০১৭

আলোচনা

জন্মশতবর্ষে ফররুখ আহমদ

মর্যাদাবোধের প্রতীক ফররুখ

আবু হেনা মোস্তফা কামাল

০৮ জুন ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৭:২৭


প্রিন্ট

আবু হেনা মোস্তফা কামাল। একাধারে কবি, গীতিকার, তার্কিক। ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় অধ্যাপক। অতি তরুণ বয়সেই র্ফরুখ আহমদের স্নেহধন্য। তাঁরই প্রেরণায় মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্র সহযোগে গেল শতকের পঞ্চাশের দশকে বের হলো পূর্ব বাংলার কবিতা। সঙ্কলনটির নামকরণও করেন র্ফরুখ আহমদ। কবি ফররুখ আহমদের জন্মশতবর্ষে ‘মর্যাদাবোধের প্রতীক ফররুখ’ শীর্ষক তাঁর লেখাটি সর্বস্তরের বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকদের আন্দোলিত করবে এই ভাবনা থেকেই পুনর্মুদ্রণ করা হলো। লেখাটি বিশিষ্ট সাহিত্য গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ‘ফররুখ আহমদ ব্যক্তি ও কবি’ (মার্চ, ১৯৮৪) থেকে সঙ্কলিত। - সাহিত্য সম্পাদক

তখন আমাদের কতোই বা বয়স। হঠাৎ একদিন পাঠ্যবইয়ের পাতায় পেয়ে গেলাম এক আশ্চর্য স্বাদের কবিতা : ‘কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা/ নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।’ কবির নাম ফররুখ আহ্মদ। তাঁর কবিতা এর আগে আর কখনো পড়িনি- কিন্তু ঢাকা বোর্ডের কাব্য সঙ্কলনের অন্তর্গত খণ্ডিত ‘সাত সাগরের মাঝি’ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এতবার পড়েছিলাম যে, সেই ক্ষতি বোধহয় পুষিয়ে গিয়েছিল। ‘তবে তুমি জাগো কখন সকালে ঝরেছে হাসনাহেনা/এখনো তোমার ঘুম ভাঙলো না? তবু তুমি জাগলে না?’এসব চরণের অর্থ কিছুই বুঝতাম না। কে এই তুমি? তবু এক অদ্ভুত ভালো-লাগার বোধে আচ্ছন্ন হয়ে যেত মন।
মফস্বল শহরে এসব নিয়ে আলাপ করার মতো কোনো বন্ধু ছিল না। অতএব নিজের ভেতরেই এই মুগ্ধতা ও বিস্ময় দিনের পর দিন বেড়ে উঠেছিল মৌচাকের মতো। ’৫১ সালের মাঝামাঝি কোনো একসময় হবে সেটা। বিনা নোটিশেই নামল বৃষ্টি। হুড়মুড় করে এক ঘিঞ্জি রেস্তোরাঁয় উঠে পড়েছিলাম। বাইরে যেমন বর্ষণ, তেমনি উদ্দাম এলোমেলো হাওয়া। ভেতরে সস্তা সিগারেটের ধোঁয়া আর পেয়ালা-পিরিচের ঝনৎকারের সাথে খদ্দেরদের হাঁকাহাঁকি মিশে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা। হঠাৎ সব কিছু ছাপিয়ে কারো দরাজ গলায় রেডিওতে ভেসে এলো আমার প্রিয় কবিতার চরণ :
তুমি কি ভুলেছো লবঙ্গ ফুল, এলাচের মৌসুমী,
যেখানে ধূলিতে কাঁকরে দিনের জাফরান খোলে কলি,
যেখানে মুগ্ধ ইয়াসমীনের শুভ্র ললাট চুমি,
পরীর দেশের স্বপ্ন সহেলী জাগে গুলে-বকাওলী!
খারাপ আবহাওয়ার জন্য মাঝে মাঝেই আবৃত্তিকারের গলা হারিয়ে যাচ্ছিল, আবার পরমুহূর্তে ভেসে উঠছিল, যেন মধ্যসমুদ্রে বিপন্ন জাহাজ। কিন্তু যতক্ষণ ধরে আবৃত্তি হতে থাকল, আমি অন্তত ততক্ষণের জন্য ভুলে গেলাম পরিপার্শ্বের সেই মলিন রুগ্ন ক্লিন্নতা। এবং আমার ভাগ্যে আরো একটি উপরি পাওনা সেদিন সঞ্চিত ছিল, আবৃত্তি শেষ হলে ঘোষক বললেন, ‘এতক্ষণ স্বরচিত কবিতা পড়ে শোনালেন ফররুখ আহমদ।’
১৯৫২ সালের শেষ দিকে যখন ঢাকায় এলাম কলেজে পড়তে, সেই প্রথম ফররুখ আহমদকে দূর থেকে দেখলাম। নাজিমউদ্দীন রোডের যে দোতলা বাড়িটায় এখন দেখি বোরহানউদ্দীন কলেজ, তখন সেটা ছিল রেডিও স্টেশন। বেতার ভবনের ঠিক উল্টো দিকে ছিল আজিজিয়া রেস্তোরাঁ। র্ফরুখ আহ্মদ রেডিওতে চাকরি করতেন, এ খবর আগেই পেয়েছিলাম। অতএব তাকে দেখার লোভেই আজিজিয়া রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে থাকতাম। তখন তাঁর বয়স তেত্রিশ। দীর্ঘ দেহ মেদহীন, কিন্তু স্বাস্থ্যের আভায় উজ্জ্বল ছিল মুখ। শুক্রবার দিন ছাড়া অন্যান্য দিন আসতেন বিকেলে। এসেই রেস্টুরেন্টের ভেতরে একটা ঘুপচি মতো জায়গায় কাগজ কলম নিয়ে বসতেন। সেখানেই জমে উঠত দর্শনার্থীদের ভিড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, লব্ধপ্রতিষ্ঠ শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-রাজনীতিক সবাই এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন কবি র্ফরুখ আহ্মদের সাথে। অনর্গল চলত গল্প হাসি-চা আর পান। মাঝে মাঝেই শোনা যেত কবির উদার নির্দেশ, ‘আবন মিয়া, আরো দুটো লবঙ্গলতিকা আর দু’পেয়ালি চা।’
র্ফরুখ ভাই কখনো পেয়ালা বলতেন না। যত মেহমান আসতেন, সবাইকে লবঙ্গলতিকা আর চা খেতেই হতো। শুনেছি, ফররুখ ভাই তাঁর বেতনের একটা মোটা অংশই প্রতি মাসের প্রথমেই আজিজিয়া রেস্টুরেন্টে রেখে যেতেন।
যখন আমার দু’চারটি অকিঞ্চিৎকর লেখা এদিক-সেদিক ছাপা হয়ে গেছে, তখন ফররুখ আহমদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন কবি তালিম হোসেন। সেটা ১৯৫৪ সাল। আইএ পাস করে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে র্ফরুখ ভাই প্রথমেই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বাচ্চা, কি খাবি বল?’ এবং বলাই বাহুল্য, আমাকে লবঙ্গলতিকা ও চা না খাইয়ে তিনি উঠতে দেননি। অতঃপর ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত একটানা র্ফরুখ ভাইকে খুব কাছে থেকে দেখেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হলে বেশ কিছু দিন আমাকে ঢাকার বাইরে মফস্বলে থাকতে হল। আবার ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছরের মতো ছিলাম ঢাকায়। তখন আমাদের নতুন কর্মজীবন শুরু হয়েছে। আগের মতো অখণ্ড অবসর ছিল না। তবু সুযোগ পেলেই চলে যেতাম রেডিও স্টেশনে। অবশ্য তত দিনে বেতার ভবনটি উঠে এসেছিল শাহবাগ এভিনিউতে।
সে যাই হোক, আন্তরিকতায়, অভ্যর্থনায়, আতিথেয়তায় র্ফরুখ ভাই ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত। আমাদের দেখলেই এমন হৈ হৈ করে উঠতেন, মনে হতো যেন কত যুগ পরে পরমাত্মীয়ের সাক্ষাৎ পেলেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত প্রধান কবি ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর আচরণে কোনো দিন কোনো প্রিটেনশন বা অহমিকা দেখিনি। অসম্ভব অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। আর ভয়ানক খোলামেলা ভাষায় কথা বলতেন। বৈষয়িক উন্নতির জন্য তাঁর কোনো আকাঙ্খা ছিল না। থাকলে, অসময়ে অকালে তাঁর মৃত্যু হতো না। তিনি যে পাকিস্তানের স্বপ্নে উদ্বেল হয়ে ‘সাত সাগরের মাঝি’ লিখেছিলেন, সেই স্বপ্নের দেশ চিরদিন তাঁর অন্বিষ্টই থেকে গেছে। পাকিস্তানের সংহতির নামে অনেকেই মোটামুটি বিত্ত-সম্পদ অর্জন করেছেন। কোনো সুবিধা কেউ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে শোনা যায়নি।
ফররুখ আহমদকে ইউনেস্কোর একটি বৃত্তি অর্পণ করা হয়েছিল পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে। লেখক হিসেবে দু’মাসের জন্য মার্কিন মুলুক ভ্রমণের সেই আমন্ত্রণ তিনি নির্বিকারভাবে নাকচ করে দিয়েছিলেন।
মধ্যবিত্তের ক্ষুদ্র বাসনা, ক্ষোভ, ঈর্ষা ইত্যাদির অনেক উপরে ছিলেন বলেই সম্ভবত মধ্যবিত্তের সম্ভ্রম তিনি আকর্ষণ করেছিলেন সহজে। তাঁর কিছু কিছু আচরণের ভেতরে একালের পর্যবেক্ষক হয়তো অবাস্তব মনোভঙ্গি আবিষ্কার করতে পারেন, কিন্তু দু’দশক আগের নিগৃহীত পূর্ববাংলার পটভূমিতে র্ফরুখ আহমদ ছিলেন আমাদের মর্যাদাবোধের প্রতীক। পাকিস্তান লেখক সংঘের মহাসচিব কুদরতুল্লাহ শাহাব ঢাকায় এলে প্রায় সবাই তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়েছিলেন, কিন্তু র্ফরুখ ভাইয়ের বেলায় ঘটেছিল ব্যতিক্রম। শাহাব নিজেই কবির বাসভবনে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের একজন সিনিয়র সদস্য তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যসচিব কুদরতুল্লাহ শাহাবকে র্ফরুখ ভাই তাঁর বৈঠকখানার হাতলভাঙা চেয়ারে বসতে দিয়েছিলেন অনায়াসে। এ গল্প তখন ঢাকায় সবার মুখে মুখে। শুধু র্ফরুখ ভাই নিজে এ বিষয়ে একটি কথাও বলেননি।
স্পষ্টভাষণের জন্য তাঁর খ্যাতি ছিল। ১৯৫৬ সালে এক নবীন কবি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের পশ্চাৎ প্রবন্ধ মুদ্রণের জন্য র্ফরুখ ভাইকে আমার মাধ্যমে একটি শুভেচ্ছাবাণী দেয়ার অনুরোধ জানান। তখন ঢাকা শহরের অনেক এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত। র্ফরুখ ভাই সম্ভবত কমলাপুর বা শাহজাহানপুরে থাকতেন। সেখানেও বন্যার পানি। অতএব দিনের পর দিন তিনি অফিসে আসতে পারছেন না, আমিও তাঁকে অনুরোধটি পৌঁছে দিতে পারছি না। কিন্তু সেই নবীণ কবি তত দিনে এত অধৈর্য হয়ে পড়েছেন যে, তিনি আর অপেক্ষা না করে নিজেই নিজের কবিতা সম্পর্কে দু’চার কথা লিখে বইয়ের মলাটে র্ফরুখ আহ্মদের নামে ছাপিয়ে দিলেন। অচিরেই এই খবর র্ফরুখ ভাইয়ের কানে গেল। নবীন কবিও শুনলেন যে, র্ফরুখ ভাই সব জেনেছেন। অগত্যা বন্যার পানি নেমে গেলে, পাপ ক্ষালনের জন্য তিনি শুক্রবার সকালে আমাকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হলেন আজিজিয়া রেস্টুরেন্টে। ফররুখ ভাই তখন সবে চায়ের পেয়ালা আর কাগজ-কলম নিয়ে বসেছেন। প্রতি শুক্রবার তিনি স্কুলের ছেলেমেয়েদের অনুষ্ঠান কিশোরমেলা পরিচালনা করতেন। তারই স্ক্রিপট লেখার উদ্যোগ করেছিলেন তিনি। আমাদের দেখে বসতে বললেন এবং বললেন, ‘বাচ্চা, চা খাবি।’ আমি ভাবলাম, মেঘ কেটে গেছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি তাঁর বিশাল দুই চোখের পূর্ণ দৃষ্টি রাখলেন নবীন কবির ওপর। বললেন, ‘এতদিন জানতাম মেদ শুধু তোর গর্দানে, এখন দেখছি তোর মগজেও মেদ জমেছে।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, আলোচ্য কবি বেশ মোটাসোটা মানুষ ছিলেন।
কর্মস্থলের অনেক কিছুই র্ফরুখ ভাই বরদাশত করতে পারতেন না এবং তার খোলাখুলি সমালোচনা করতেন। রেডিওর জনৈক আঞ্চলিক পরিচালক একবার তাঁকে ডেকে বললেন, ‘আপনার জন্য এই ছোট চাকরি মানায় না। আপনি রাজি থাকলে অন্যত্র একটি বড় পদের ব্যবস্থা করতে পারি। যাবেন?’ ফররুখ ভাই হা-হা করে হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘প্রফেট কি আর, এ্যাঞ্জেলদের ভেতরে আসেন, তিনি স্যাটানদের ভেতরেই আসেন। অন্য চাকরিতে আমার দরকার নেই।’
অত্যন্ত বাকপটু বলে পরিচিত সেই আঞ্চলিক পরিচালকও নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন এই উত্তর পেয়ে।
যদ্দুর মনে পড়ে, র্ফরুখ ভাইকে কোনো দিন তাঁর পারিবারিক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে শুনিনি। ছেলেমেয়ে ক’জন, কে কোথায় পড়াশোনা করছে, এসব বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না। তাঁর সার্বক্ষণিক আলোচনার বিষয় ছিল সাহিত্য।

একদা আপাদমস্তক রোমান্টিক ফররুখ আহমদ পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি এসে ক্রমেই ক্লাসিকতার ভীষণ অনুরাগী হয়ে পড়লেন। তখন তাঁর প্রিয় কবি মিল্টন, মধুসূদন, এলিয়ট। এপিক আয়তনের কাব্য লিখবেন বলে হাতেম তা’য়ীকে বেছে নিলেন নায়ক হিসেবে। কাব্যস্বভাবের এই পরিবর্তন তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়েছিল কি না, সে সিদ্ধান্ত নেবার ভার সমালোচকের। তবে এটা লক্ষ্য করেছিলাম, চল্লিশ দশকে তাঁর কবিতায় যে মাদকতা ছিল, ছিল ‘ডাহুক’ সৃষ্টির যে আশ্চর্য ক্ষমতা- তা যেন ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে অনেক বড়- কিন্তু গদ্যময় কাব্য সংগঠনে।
আঁটো-সাঁটো সনেট অথবা দীর্ঘ গীতি-কবিতায় কবির আসক্তি তখন আর নেই বললেই চলে। এলিয়টের কাব্যনাটকের দিকে সে সময় তিনি গভীরভাবে ঝুঁকে পড়েছেন। নৌফেল ও হাতেম তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
যাই হোক, সাহিত্য সম্পর্কে তার ধ্যান-ধারণাগুলো সঠিক ছিল কিনা, তা নিয়ে মুখোমুখি কথা বলার মতো সাহস আমাদের ছিল না। বস্তুত আজিজিয়া রেস্তোরাঁর ওইসব আসরে আমরা ছিলাম কেবলই শ্রোতা। ফররুখ ভাই প্রায় একাই কথা বলতেন। মাঝে মাঝে আবৃত্তি করতেন মাইকেল মধুসূদনের কবিতা থেকে। অসাধারণ স্মরণশক্তি ছিল তার। ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য এর সম্পূর্ণটাই বোধ করি তিনি মুখস্থ বলতে পারতেন। আমরা অবাক হয়ে তার মন্দ্রিত কণ্ঠের আবৃত্তি শুনতাম আর ভাবতাম, তুমি কেমন করে গান করো, হে গুণী।
এবং মানুষ যে কেবল স্বাধিকার বলেই বিশিষ্ট হয়ে ওঠে না, র্ফরুখ ভাই ছিলেন তার নিঃসঙ্গ দৃষ্টান্ত। তেমন কিছু বড় চাকরি তিনি করতেন না। অথচ গোটা বেতার কেন্দ্রের সর্বস্তরে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। সবাই তাকে সমীহ করত, ভালোবাসত আবার ভয়ও করত। বলা যায়, আবুল মিয়ার চায়ের দোকানের সেই অন্ধকার খুপরিতে বসে তিনি যে নিরঙ্কুশ শ্রদ্ধা ও মর্যাদা উপভোগ করতেন, প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে সুসজ্জিত ও আরামদায়ক কক্ষে উপবিষ্ট কোনো আঞ্চলিক পরিচালক কখনো তা পাননি। অথচ কী সাদাসিধা জীবন ছিল তাঁর! কখনো ইসতিরি করা কাপড় তাকে পরতে দেখিনি। সারা বছর সাবানে-কাচা পরিষ্কার পাঞ্জাবি পাজামা পরে কাটাতেন। শুধু শীতকালে গায়ে উঠত কখনো কালো শেরোয়ানি, কখনো একটি গরম চাদর। তবে শুনেছি, বিশ-বাইশ বছর বয়সে, প্রথম যৌবনে, যখন তিনি ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র, তখন বেশভূষায় শৌখিনতার চূড়ান্ত করে ছেড়েছিলেন। শান্তিপুরী ধুতি, ফিনফিনে আদ্ধির পাঞ্জাবি সোনার বোতাম ইত্যাদি সবই নাকি ব্যবহার করতেন। কখনো কখনো এসব গল্প উঠলে ফররুখ ভাই আজিজিয়া রেস্তোরাঁর ছাদ কাঁপিয়ে হাসতেন। যেন ইঙ্গিতে বলতে চাইতেন, আহ, তখন যে কী ছেলেমানুষই ছিলাম!
এখনো তার উতরোল হাসি কানে বাজে। ১৯৬৫ সাল থেকেই আমাকে ঢাকার বাইরে থাকতে হয়েছে। তবু কাজে অকাজে যখনই ঢাকায় এসেছি, রেডিও স্টেশনে গিয়ে খুঁজেছি, র্ফরুখ ভাই আছেন কিনা। ইতোমধ্যে যে আমাদের বয়স বেড়েছে, ছেলেমেয়ের জনক হয়ে গেছি আমরা এবং অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষক, ফররুখ ভাই এসব হিসেবে মধ্যে আনতেন না। যখই দেখা হতো, সেই চিরাচরিত প্রশ্ন, ‘বাচ্চা, চা খাবি!’ তাঁর চোখে আমাদের বয়স কোনো দিন বাড়েনি। এবং এই স্নেহ যে শুধু মৌখিক ছিল না, সে প্রমাণও পেয়েছি একাধিকবার।
এখানে একটি ঘটনার উল্লেখ করি। পঞ্চাশ দশকে পাবনা থেকে বেরুতো একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা- ‘পাক হিতৈষী’। তাতে পাতার পর পাতা ছাপা হতো নীলাম-ইস্তাহার। তবু আমাদের মতো কয়েকজন ছেলে-ছোকরার আবদারে সম্পাদক এ কে এম আজিজুল হক মাঝে মধ্যে সাড়া দিতেন। একবার জিয়া হায়দার ও আমার পীড়াপীড়িতে ‘পাক-হিতৈষী’র একটি সাহিত্য সংখ্য বের করতে সম্পাদক রাজী হলেন। সেটা সম্ভবত ১৯৫৫ সাল। নিতান্ত ভাগ্যের ওপর ভরসা করে ফররুখ ভাইকে চিঠি লিখেছিলাম আমাদের জন্য একটি কবিতা পাঠাবেন বলে। তখন ঢাকার নামজাদা পত্রিকার সম্পাদকরাও ফররুখ ভাইয়ের লেখা জোগাড় করতেন অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে। অতএব আমার চিঠির পরিণাম কী হবে, তা আমি আগেই ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যি সত্যি যখন একটি নতুন লেখা সনেটসমেত তার উত্তর পেলাম, আনন্দে আমি প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম। ‘পাক-হিতৈষী’র জন্য র্ফরুখ ভাই কবিতা পাঠাবেন এ কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।
১৯৬৫ সালের পর থেকে ঢাকার সাথে আমার দীর্ঘ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। মফস্বল শহর থেকে কাজেকর্মে কখনো কখনো ঢাকায় এসেছি বটে, কিন্তু সে রকম সময় করে যেতে পারতাম না রেডিও স্টেশনে। যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৭০ সালের পরে ফররুখ ভাইয়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। আর দেখা হবেও না কোনো দিন। সেই অসাধারণ প্রাণবন্ত, স্নেহময় মানুষটি চিরতরে বিদায় নিয়েছেন- এ কথা ভাবতে অবাক লাগে। শাহবাগের বেতার ভবনে উঠে এসেছিল আবুল মিয়ার রেস্তোরাঁ। ১৯৭৪ এর পরেও সেখানে বসেছে শিল্পী-কথক লেখকদের জমজমাট আসর। পুরনো স্মৃতির লোভে মাঝে মধ্যে চা খেতে গেছি সেখানে। পঞ্চাশ দশকের নবীন যুবা আবুল মিয়াকে দেখেছি অকাল বার্ধক্যে ধূসর, ম্রিয়মাণ, নিষ্প্রভ। তার মুখের দিকে চেয়ে থেকেছি গভীর প্রতীক্ষায় যেন এই তিনি বলে উঠবেন, একটু বসুন, কবি সাহেব আসবেন। তা, আমাদের জীবনে অলৌকিক কিছু কি ঘটাতে পারে না? না, তেমন কিছু ঘটেনি। সেই দীর্ঘদেহী, সদা প্রসন্ন ফররুখ ভাই আর কোনো দিন এসে বলেননি, ‘বাচ্চা, চা খাবি?’

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫