ঢাকা, বুধবার,২৩ আগস্ট ২০১৭

প্রকৃতি ও পরিবেশ

ঢাকার বাতাসে বিষ : বছরে মৃত্যু ১৫ হাজার

আবুল কালাম

০৩ জানুয়ারি ২০১৭,মঙ্গলবার, ১২:২৩ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৩:২০


প্রিন্ট

ঢাকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষ ছড়ানো দূষিত বাতাসের কারণে অ্যাজমা, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ জটিল সব ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী শুধু বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর অন্তত ১৫ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ। তাদের মতে, ঢাকার বাতাসে সহনশীল উপাদানের চেয়ে ছয় গুণেরও বেশি মাত্রার দূষণকারী পদার্থ আছে। এ বাতাস গ্রহণের ফলেই বাড়ছে এলার্জি, ক্যান্সার, চোখের প্রদাহ এবং ফুসফুসের রোগ। এতে বলা হয়, বাতাসে অতিরিক্ত পরিমাণ সীসার উপস্থিতি অসুস্থ ও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দেয়। শিশুদের ব্রংকিউলাইটিস রোগ বেশি হয়। এছাড়া শিশু মানসিক ভারসাম্যহীনও হতে পারে।
পরিবেশবিদরা জানান, ডিজেলচালিত যানবাহনের পাশাপাশি রাজধানীর উত্তরে ইটের ভাটার কালো ধোঁয়া এবং দক্ষিণে বিভিন্ন কারখানার ধোঁয়াসহ বিভিন্ন বস্তুকণার মাধ্যমে রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত ট্রাক চলাচলের কারণে রাতের ঢাকা সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। ঢাকা শহরে শুধু গাড়ির ধোঁয়া থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টন সূক্ষ্ম বস্তুকণা (এসপিএম) বাতাসে ছড়াচ্ছে। এ কারণে শহরে বসবাসকারীদের মধ্যে অ্যাজমা, হাঁপানি ও ফুসফুসের ক্যান্সারসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বাড়ছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী রাজধানীতে ৭০ হার্টরিজ স্মোক ইউনিট (এইচএসইউ) মাত্রার ধোঁয়ার ঘনত্ববিশিষ্ট গাড়ি চলার অনুমতি রয়েছে। অথচ ঢাকার অধিকাংশ গাড়ির ধোঁয়ার ঘনত্ব ১০০ এইচএসইউ-এরও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) সূত্রে জানা যায়, বস্তুকণার মাধ্যমে বায়ু দূষণ পিএম টেনের ক্ষেত্রে ১শ ৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার এবং পিএম ২ দশমিক ৫ এর ক্ষেত্রে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার হলো স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের বাতাসের মান ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের গবেষণায় দেখা গেছে, পিএম টেনের ক্ষেত্রে ৩৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে পিএম ২ দশমিক ৫ এর ক্ষেত্রে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার পর্যন্ত ওঠানামা করছে। বস্তুকণা দূষণের প্রধান স্থান হলো— নারায়ণগঞ্জ, লালবাগ, রাজারবাগ, টঙ্গী, যাত্রাবাড়ী ও সংসদ ভবন এলাকা। এছাড়া হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে প্রতিদিনের হাজার হাজার টন মানব ও গৃহস্থালী বর্জ্য রাজধানী ঢাকার আশপাশেই খোলা ট্রাকে করে নিয়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি রাজধানীর উন্মুক্ত ডাস্টবিন থেকেও বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়ছে বলে পরিবেশবিদরা মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বায়ু দূষণ দেশের মৃৃৃৃৃৃৃত্যুহার এবং মানুষের কর্মস্পৃহা কমিয়ে দেয়ার একটি বড় কারণ। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বায়ু দূষণে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকার নাম আর প্রথম মেক্সিকো। এতে বলা হয়, গ্রহণযোগ্য মাত্রার অতিরিক্ত সিসা ও বস্তুকণার উপস্থিতিতে ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকার শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ু দূষণের মাত্রা সম্প্র্রতি এতটাই বেড়েছে যে, বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডসহ নানা দূষিত উপাদানের কারণে মানুষ চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে শিশুরা শ্বাসনালী সংক্রান্ত নানা সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। বায়ু দূষণের কারণে ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি রক্তশূন্যতাও দেখা দিচ্ছে। চিকিত্সকরা বলছেন, দূষিত বাতাসের মাধ্যমে ফুসফুসে সিসা ও অদৃশ্য বস্তুকণা ঢুকে নিউমোনিয়া ও রক্তস্বল্পতা দেখা দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাহমিনা বেগম বলেন, বায়ু দূষণের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে অক্সিজেনের সঙ্গে বিষাক্ত সিসা প্রবেশ করছে। ফলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মক হারে কমে যাচ্ছে। তাই সামান্য কারণেই তারা সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে। পরে তা শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা বা নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত বাংলাদেশ সরকারের ‘নির্মল বাতাস ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বায়ু দূষণের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে রাস্তায় ব্যাপক সংখ্যক গাড়ি ও আশপাশের ইটের ভাটা থেকে উত্সারিত ধোঁয়াশা, রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও দালানকোঠা নির্মাণ কাজ থেকে উত্সারিত দৃশ্য ও অদৃশ্য কণা, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক কারখানার বর্জ্য ইত্যাদি। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই বায়ু দূষণ সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারলে সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের চিকিত্সা ব্যয় বছরে ১৭ কোটি থেকে ৫০ কোটি ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।
অপরদিকে পরিবেশ অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে কম করেও ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ধূলিকণা ভেসে বেড়াচ্ছে। সবচেয়ে শঙ্কার ব্যাপার সহনীয় মাত্রার চেয়ে এই পরিমাণ কম করেও পাঁচগুণ বেশি। ঢাকার বাতাসে সাধারণ ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো হচ্ছে সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ওজোন, হাইড্রোজেন সালফাইড, বিভিন্ন ধরনের সালফেট ও নাইট্রেট এবং দ্রবীভূত বিভিন্ন জৈব পদার্থ ইত্যাদি। এর সঙ্গে রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি সংক্রান্ত বিষাক্ত ধাতব যৌগ। এসব ধাতব পদার্থের মধ্যে রয়েছে সিসা, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, আর্সেনিক, নিকেল ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে বেঞ্জিন, ফরমালেডেহাইড, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইল, ডক্সিন ও অন্যান্য অদ্রবীভূত জৈব যৌগ।
পরিবেশ বিভাগের মতে, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাতাসে বিভিন্ন ধরনের কণার পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে কম থাকে। কিন্তু নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এর পরিমাণ ভয়াবহ আকারে বেড়ে যায়। এ সময় এই পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ৪৬৩ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এই দূষণের মাত্রা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বায়ু দূষণের শিকার বলে পরিচিত দুটি শহর মেক্সিকো ও মুম্বাইয়ের বায়ু দূষণের মাত্রা হলো প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ৩৮৩ ও ৩৬০ মাইক্রোগ্রাম।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ডিপার্টমেন্টের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর শুধু স্বাস্থ্য খাতে সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যতে এ অর্থের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
চিকিত্সকদের মতে, বায়ু দূষণের ফলে রাজধানীর ৬০ শতাংশ মানুষ চোখের সমস্যায় ভুগছে। দূষিত বায়ুর প্রভাবে ‘ড্রাই আই’ বা চোখে জলশূন্যতা দেখা দেয়। ফলে চোখ ফুলে ওঠে, চোখে চুলকানি হয়, চোখের পানি শুকিয়ে যায়। এসবের কারণে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ জলশূন্যতা রোগে ভোগে।
পরিবেশ অধিদফতরের সর্বশেষ গবেষণায় বলা হয়, বেশি ঘনত্বের মোটরযান, ১৫৩০ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ১২ মিলিয়ন মানুষের বসবাস এবং বিপুলসংখ্যক রেজিস্টার্ড ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরযান ঢাকার বায়ু দূষণকে বাড়িয়ে তুলেছে। রাস্তায় দুঃসহ ট্রাফিক জ্যাম এবং যানবাহনের শ্লথগতির কারণে-অকারণে পুড়ছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি। এজন্য রাজধানীর সার্বিক বায়ুমান পরিস্থিতি ১০ বছর আগের চেয়েও খারাপ।
পরিবেশ অধিদফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানিয়েছেন সম্প্রতি পরিসংখ্যান ভবনের সামনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মোট ২৫টি গাড়ির মধ্যে ৫টিতে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন মনো অক্সাইড এবং হাইড্রো কার্বন পাওয়া যায়। অপর এক কর্মকর্তা জানান, টু স্ট্রোক থ্রি হুইলার রাস্তা থেকে তুলে দেয়ার পর ১০ বছরে ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে দিন দিন বাড়ছে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫